kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

দুধ দই পশুখাদ্যে ভেজাল নিয়ে হাইকোর্ট

মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না

দুধ, দই ও পশুখাদ্যে ভেজাল মেশানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা দাখিল করতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে সময় দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে গরুর দুধ এবং বিভিন্ন প্যাকেটজাত দুধ, দই ও গোখাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করে তাতে কী পরিমাণ কীটনাশক, ব্যাকটেরিয়া, অ্যান্টিবায়োটিক, রাসায়নিক, সিসাসহ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে তা নিরূপণ করে বিএসটিআইকে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে বিএসটিআই প্রশ্ন তোলায় তাদেরই (বিএসটিআই) এই পরীক্ষা করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া জড়িতদের বিরুদ্ধে কী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তাও আদালতকে জানাতে বলা হয়েছে। আগামী ২৩ জুনের মধ্যে এই প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

এদিকে দুধ, দই ও গোখাদ্যে কীটনাশক, ব্যাকটেরিয়া, অ্যান্টিবায়োটিক, সিসাসহ মানবদেহের জন্য বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের (এনএফএসএল) প্রধান অধ্যাপক ড. শাহনীলা ফেরদৌসীকে তলব করেছেন হাইকোর্ট। আগামী ২১ মে তাঁকে আদালতে হাজির হয়ে কোন প্রক্রিয়ায় নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করেছেন এবং কেন আদালতে তার প্রতিবেদন দাখিল করেননি সে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বুধবার নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সময়ের আবেদনে এ আদেশ দেন। আদালতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার ফরিদুল ইসলাম। বিএসটিআইয়ের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার সরকার এম আর হাসান মামুন, দুদকের পক্ষে ছিলেন সৈয়দ মামুন মাহবুব। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিনউদ্দিন মানিক।

আদালত বলেছেন, ‘কোন কোন কম্পানির দুধ ক্ষতিকর এবং কারা ভেজাল মেশায় তাদের চিহ্নিত করতে চাই। ওই সব কম্পানির নাম সাধারণ মানুষও জানতে চায়। দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যে ভেজালকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের শাস্তি পেতেই হবে। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না। মানুষের স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে জীবন থেকে লাভ কী?’

দুধ, দই ও গোখাদ্যে কীটনাশক, ব্যাকটেরিয়া, অ্যান্টিবায়োটিক, সিসাসহ মানবদেহের জন্য বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি নিয়ে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ‘গরুর দুধেও বিশেষ ভয়’ শিরোনামে কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া আরো কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আদালত এসব প্রতিবেদন দেখে গত ১১ ফেব্রুয়ারি স্বপ্রণোদিত হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা দেন ও রুল জারি করেন। আদেশে দুধ, দই ও গোখাদ্যে ভেজাল মেশানোর ঘটনা তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে দুদককে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গরুর দুধ ও বিভিন্ন প্যাকেটজাত দুধ, দই ও গোখাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করে তাতে কী পরিমাণ কীটনাশক, ব্যাকটেরিয়া, অ্যান্টিবায়োটিক, রাসায়নিক, সিসাসহ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে তা নিরূপণ করতে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই নির্দেশের পর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ১৬ সদস্যের কমিটি গঠন করে। গত ৮ মে এই কমিটি করার কথা আদালতকে জানানো হয়। এদিন আদালত এক আদেশে ১৫ মের মধ্যে জড়িত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নামের তালিকা দাখিল করতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তালিকা করতে না পেরে গতকাল সময় আবেদন করে তারা।

গতকাল শুনানির শুরুতেই দুদকের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, কোন কোন প্রতিষ্ঠান জড়িত তাদের নামের তালিকা এখনো পাইনি। এ কারণে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা যায়নি। তালিকা পেলেই অভিযানে নামা হবে। এ সময় আদালত বলেন, কোন কোন কম্পানির পণ্যে ভেজাল রয়েছে তা চিহ্নিত করতে চাই। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম এ সময় বলেন, নিম্নমানের পণ্য হলেই যে তা ক্ষতিকর, তা নয়। তাই নিম্নমানের বিষয়টি নিয়ে ঢালাওভাবে বলা হলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।

আদালত এই পর্যায়ে শাহনীলা ফেরদৌসীর প্রতিবেদন দেখিয়ে বলেন, ‘রিপোর্টগুলো দেখুন। এটা দেখার পরও কি আপনাদের বিবেক জাগ্রত হয় না? আপনারা নিজেরাও তো এটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।’ জবাবে ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ জন্য কমিটি হয়েছে। পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি এক মাসের মধ্যে সব পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া যাবে।’

বিএসটিআইয়ের আইনজীবী এ সময় বলেন, ‘অধ্যাপক শাহনীলা ফেরদৌসী যে রিপোর্ট করেছেন তার প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ আছে। বিএসটিআই একটি নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে পরীক্ষা করে থাকে। এখানে সেটা হয়েছে কি না তা আমাদের জানা নেই। উনি ঢাকাসহ তিন জেলার ছয়টি উপজেলাসহ ১৮টি স্থান থেকে দুধের পাশাপাশি অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করে রিপোর্টটি করেছেন। সারা দেশের সামগ্রিক চিত্র এতে নাও উঠে আসতে পারে। আর এসব রিপোর্ট গণমাধ্যমে প্রকাশের পর আতঙ্ক তৈরি হয়।’

এ সময় আদালত বলেন, ‘এটা বলতেই হবে যে গণমাধ্যমে এই সব ভেজাল বিষয় উঠে আসার কারণেই আমরা বিষয়গুলো জানতে পারি। তাই গণমাধ্যমকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। তারা বিষয়গুলো জাতির সামনে না নিয়ে আসলে আমরা তো জানতেই পারতাম না।’ এরপর আদালত প্রতিবেদন দিতে বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে ২৩ জুন পর্যন্ত সময় দেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা