kalerkantho

খুনের আসামি মাদক কারবারি ছাত্রলীগের কমিটিতে!

হায়দার আলী ও রফিকুল ইসলাম   

১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



খুনের আসামি মাদক কারবারি ছাত্রলীগের কমিটিতে!

তানজিল ভূঁইয়া তানভীর। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদে সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। গত বছরের ১১ ও ১২ মে ২৯তম সম্মেলনের সময় তাঁর বয়স ছিল ২৯ বছর ছয় মাস। বয়সের কারণে যোগ্য প্রার্থীর তালিকা থেকে বাদ পড়েন তিনি। তবে সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর আস্থাভাজন হওয়ায় গত সোমবার ঘোষিত কমিটিতে সহসভাপতি পদ পেয়ে গেছেন তিনি।

গাজীপুর সদরের কাউলতিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রুহুল আমিন এখন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সহসভাপতি। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া প্রদীপ চৌধুরী ২০১৪-১৫ সেশনে পরীক্ষায় নকলের দায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন।

এমন ঘটনা দু-একটি নয়; মাদক ইয়াবার কারবার, হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িতরাও ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান করে নিয়েছেন। সহসভাপতি, যুগ্ম সম্পাদক, সহসম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে বসে গেছেন বিবাহিত, চাকরিজীবী, মাদকের মামলায় জড়িত ও বিতর্কিতরা। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ৫-এর গ ধারা অনুযায়ী বিবাহিত ব্যক্তি সংগঠনের কমিটিতে স্থান পাবেন না। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ২৯ বছরের বেশি বয়সী কারও ছাত্রলীগের পদে আসারও সুযোগ নেই।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধান ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রায় অর্ধশত পদে জায়গা করে নিয়েছেন নানা অপরাধে অভিযুক্ত ও বিতর্কিতরা। ছাত্রদল নেতা এমনকি রাজাকার-পুত্ররাও বাগিয়ে নিয়েছেন পদ-পদবি। বাদ পড়েছেন ত্যাগী ও সক্রিয়রা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে গাজীপুর জেলা থেকেই ছয়জন পদ পেয়েছেন। তাঁরা হলেন সহসভাপতি শহিদুল ইসলাম ও রুহুল আমিন, গণযোগাযোগ ও উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক শেখ শামীম তুর্য, উপদপ্তর সম্পাদক মেহেদী হাসান বাপ্পি এবং সহসম্পাদক রেজাউল করিম ও সামিয়া সরকার। এঁদের মধ্যে রুহুল আমিন, রেজাউল করিম ও সামিয়া সরকার বিতর্কিত। তাঁদের বিরুদ্ধে মাদকের কারবারসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

রুহুল আমিন দাপুটে ছাত্রদল নেতা থেকে খোলস পাল্টে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহসভাপতির পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতার আশীর্বাদ নিয়ে এবং লবিং করে তিনি এখন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে আবার চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে। বিয়ে করেছেন তানিয়া নামে এমআইএসটির এক শিক্ষার্থীকে।

টঙ্গী সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে গাজীপুরে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় মাদক কারবারি হিসেবে তাঁর নাম রয়েছে। ইয়াবা কারবারের অভিযোগে ডিবি পুলিশ তাঁকে আটকও করেছিল।

আর কালিয়াকৈর পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুস সবুর সরকারের মেয়ে সামিয়া সরকার সুইটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যোগ দেন। ময়মনসিংহের নালিতাবাড়ির লুত্ফর রহমানের ছেলে রাজিবুল ইসলামের সঙ্গে ২০১২ সালের ৭ জুলাই তাঁর বিয়ে হয়। তার পরও তিনি ছাত্রলীগের কমিটিতে সহসম্পাদকের পদ পেয়েছেন।

পদবঞ্চিত নেতাদের অভিযোগ, ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির অর্ধশত নেতার বিরুদ্ধেই মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকায় সেই অভিযুক্তরাই কেন্দ্রীয় কমিটিতে ভালো ভালো পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘স্কুলজীবন থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতি করে আসছি, আওয়ামী লীগের প্রতিটি মিছিল-মিটিংসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে মাঠে থেকেছি। কিন্তু এমন ত্যাগী নেতারা দলের পদ-পদবি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আর মাদক, সন্ত্রাস, খুনসহ  ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা পদ পেয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, এমনকি রাজাকারের সন্তানও গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছে। অনেকেই মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েও পদবি বাগিয়েছেন।’

অভিযোগ রয়েছে, কমিটিতে সহসভাপতি পদ পাওয়া আমিনুল ইসলাম বুলবুল হত্যা মামলার আসামি। সহসভাপতি বিদ্যুৎ শাহরিয়ার কবির ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পাওয়া মুজাহিদুল ইসলাম সোহাগ মাদকের কারবারে জড়িত। এর মধ্যে সোহাগের নাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদক কারবারিদের তালিকায় রয়েছে বলে গণমাধ্যমে এসেছে। সহসভাপতি পদ পাওয়া বরকত হাওলাদারকে শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার অপরাধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়।

সহসভাপতি আতিকুল রহমান খানের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদক সেবনকারী ও মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ। পহেলা বৈশাখের কনসার্টে আগুন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সহসভাপতি মাহমুদুল হাসান তুষার একসময় শিবিরের সাথী ছিলেন। পহেলা বৈশাখের কনসার্টে আগুন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধেও। আরেক সহসভাপতি মাহমুদুল হাসানের পরিবার জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দপ্তর সম্পাদক আহসান হাবীব সাবেক চাকরিজীবী এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে বৈশাখী কনসার্টে আগুন দেওয়ার অভিযোগ আছে। সহসভাপতি সুরঞ্জন ঘোষের বয়স ৩০ বছর ছাড়িয়ে গেছে।

সহসভাপতি পদ পাওয়া আরেফিন সিদ্দিকী সুজনকে একসময় ইয়াবা সেবন ও মাদক রাখার দায়ে হল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সহসভাপতি সোহেল রানার বয়স ত্রিশোর্ধ্ব। আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রাকিনুল হক চৌধুরী ছোটন বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরীর আপন ছোট ভাই বলে জানা যায়। তিনি ছাত্রলীগে নিষ্ক্রিয়।

সহসভাপতি সাদিক খান বিবাহিত হওয়ার পরও পদ পেয়েছেন। একইভাবে বিবাহিত হয়ে পদ পেয়েছেন উপসম্পাদক রুশি চৌধুরী, আঞ্জুমান আরা আনু, আফরিন লাবনীসহ অনেকে।

সহসম্পাদক পদ পাওয়া রনি চৌধুরী সিরাজদিখানের কোলা ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি আসিফ হাসান হাওলাদার হত্যা মামলার আসামি। এস এম তৌফিকুল হাসান সাগরের বাবা মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিবাহিতদের খুঁজতে কমিটি করবে ছাত্রলীগ : কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পর ব্যাপক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিবাহিতদের খুঁজতে একটি কমিটি করার কথা জানিয়েছেন ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। কমিটিতে ১০ জনের বেশি বিবাহিত নেতা স্থান পেয়েছেন—এমন অভিযোগের ব্যাপারে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি এ কথা বলেন।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে সরকার সমর্থক সংগঠনটির শীর্ষ দুই নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এলে সাংবাদিকরা এই অভিযোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চান। জবাবে ছাত্রলীগ সভাপতি অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে ফেক আইডি খুলে ছবি বানিয়ে অনেক কিছু করা যায়, সম্ভব।’ অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেহেতু বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এসেছে, আমরা এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি কমিটি গঠন করে দেব। সত্যতা প্রমাণ হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

মন্তব্য