kalerkantho

ধান-চাল-গম সংগ্রহ অভিযান

চাষির মনে হাপিত্যেশ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চাষির মনে হাপিত্যেশ

এখন চাষির ঘাম ঝরানো ফসলের দাম বুঝে নেওয়ার সময়। চলছে ধান-চাল-গম সংগ্রহ অভিযান। এই সময়টাতে আনন্দে চাষির মুখে সাতরং খেলা করার কথা থাকলেও উল্টো তাদের মনে হাপিত্যেশ। গত ২৫ এপ্রিল থেকে সংগ্রহ অভিযান শুরুর দিনক্ষণ চূড়ান্ত থাকলেও অনেক এলাকায় চালুই হয়নি সরকারি এ কার্যক্রম। কিছু কিছু এলাকায় সংগ্রহের কাজ শুরু হলেও গতি নেই তেমন। মাঠপর্যায়ে রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগও। কোথাও কোথাও চলছে ছলচাতুরী আর টালবাহানা। অনেক চাষির রয়েছে ধারদেনা পরিশোধের তাড়া। তাই অভাবি চাষি কম দামে ফড়িয়া-দালালদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছে কষ্টে  ফলানো সোনার ধান। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এ সংগ্রহ অভিযান। কালের কণ্ঠ প্রতিনিধিদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ধান-চাল-গম সংগ্রহ অভিযানের এমন ছবি।

বগুড়ায় ধান-চাল-গম সংগ্রহ অভিযান নিয়ে চাষিদের সঙ্গে ছলচাতুরী শুরু করেছে খাদ্য বিভাগ। জেলায় এখনো শুরুই হয়নি অভিযান। তৈরি করা হয়নি চাষিদের তালিকাও। বগুড়ার ১২ উপজেলার ছবি অভিন্ন। সরকারের নির্ধারিত দরকে স্বাগত জানালেও অভিযান কার্যক্রম নিয়ে খুশি নয় নন্দীগ্রামের চাষিরা। তারা বলছে, এখনো খাদ্য বিভাগ চাষিদের তালিকাই তৈরিই করেনি। শেষ সময় এসে যদি চাষিদের বাদ দিয়ে ফড়িয়াদের কাছ থেকে ধান কেনা হয় তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারা। ধান উত্পাদনে উদ্বৃত্ত অঞ্চল বগুড়ার বাজারে ধানের দাম খুবই কম। এরই মধ্যে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহেও চলছে টালবাহানা। এ অবস্থায় এ অঞ্চলের বোরো ধান চাষিরা লোকসানের ভয়ে শঙ্কিত। বগুড়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সাইফুল ইসলাম জানান, আজ বুধবার থেকে বগুড়ায় একযোগে সংগ্রহ অভিযান শুরু হবে। স্থানীয় চাষিরা বলছে, সরকারিভাবে বোরো মৌসুমের ধান সরকারি গুদামে সরবরাহের জন্য তারা মজুদ করেছে। তবে ধান কেনা কবে শুরু হবে তা জানতে না পারায় অনেকে কম দামে ধান-চাল বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সুযোগ নিচ্ছে ফড়িয়া-দালালরা। কম দামে ধান কিনতে তারা গ্রাম চষে বেড়াচ্ছে। উপায় না পেয়ে অসহায় চাষি বাধ্য হয়ে তাদের কাছে ধান বিক্রি করছে।

রংপুরের তারাগঞ্জের ইকরচালী এলাকার চাষি সেকেন্দার আলী বলেন, ‘সরকার প্রতি বছর ধান কেনে। কিন্তু সে সুযোগ প্রকৃত চাষিরা পায় না। এখন চাষিরা ধান ঘরে তুললেও ধারদেনা পরিশোধ করতে গিয়ে কম দামে হলেও বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। কিন্তু সরকার যখন কেনা শুরু করে চাষিদের ঘরে তখন ধান থাকে না। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বাজারে দাম কমিয়ে দেয়। এতে চাষিরা ন্যায্যমূল্য পায় না।’ রংপুরের চাষিরা বলছে, সরকারি ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রার পুরো বরাদ্দই পান অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত মিলাররা। তাঁরা নিজেরা কিংবা ফড়িয়াদের মাধ্যমে চাষির কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করেন। বাড়তি উত্পাদন খরচের পুরোটাই কৃষক বহন করলেও এর সুফল ভোগ করে ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীরা। তাদের দাবি, সরকার ধান ক্রয়ে সুবিবেচনা না করলে এবারও ক্ষতির মুখে পড়বে তারা।

সুনামগঞ্জের চাষিদের কাছ থেকে ধানের বদলে চাল সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ছে। এতে চাষিরা বঞ্চিত হলেও লাভবান হচ্ছেন মিল মালিকরা। সুনামগঞ্জের নোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সুন্দর আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি কখনো সরকারকে ধান দিতে পারিনি। এবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু প্রথমে কৃষি অফিস, পরে ইউএনও অফিস আরো পরে খাদ্য অফিসে দৌড়াদৌড়ি করে আমার আগ্রহ মরে গেছে।’

শেরপুরের শ্রীবরদীতে সরকারিভাবে চাল সংগ্রহের তালিকা ও বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কয়েক বছর ধরে পরিত্যক্ত থাকা কিছু রাইস মিলের নামেও দেওয়া হয়েছে চালের বরাদ্দ।

প্রচার প্রচারণা ছাড়াই পাবনার চাটমোহরের রেলবাজার খাদ্যগুদাম চত্বরে গত রবিবার সকালে শুরু হয়েছে ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম। অভিযানের ব্যাপারে উপজেলার জগতলা গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেন ক্ষোভের সুরে বলেন, ‘আমরা তো কৃষক না, বাজারের বড় বড় ব্যবসায়ীরা প্রকৃত কৃষক। প্রতি বছর শুনতে পাই খাদ্যগুদামে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। যদি আমরা সেখানে আমাদের ফসল দিতে যাই তাহলে কোনো দিনও দেওয়া সম্ভব হবে না। আমাদের ফসল না নিয়ে ট্রাকবোঝাই বড় বড় ব্যবসায়ীর ধান-চাল নেওয়া হবে।’

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের গুণধর ইউনিয়নের চাষি রেনু মিয়া কিছু ধান সরকারের কাছে বেচতে চান। তবে খাদ্যগুদামগুলো এখনো ধান-চাল-গম সংগ্রহ শুরুই করেনি। শুধু রেণু মিয়া নন, তাঁর মতো বহু চাষি সরকারের কাছে ধান বেচতে চাইলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে হতাশ কৃষক প্রয়োজন মেটাতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অর্ধেক দামেই বেপারি ও পাইকারদের কাছে ধান বিক্রি করে দিচ্ছে। কিশোরগঞ্জ খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, জেলার খাদ্যগুদামগুলোতে নতুন ধান-চাল রাখার জায়গা নেই। তাই এখনই সব উপজেলায় ধান কেনা সম্ভব হচ্ছে না। চাষিরা বলছে, যখন টাকা প্রয়োজন তখন সরকারের কাছে ধান বেচতে না পারলে পরে তো আর তাদের কাছে ধান থাকবে না। ধারদেনা পরিশোধ ও পরিবারের প্রয়োজনে এখনই তাদের ধান বেচা প্রয়োজন।

গাইবান্ধার ফুলছড়ির মদনের পাড়ার চাষি জহুরুল হক বলেন, সরকারের নির্ধারিত দামে হাটে বসে চাষি পর্যায়ে ধান কেনা হলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটত। কিন্তু সেটা সময়মতো না হলে সংসার খরচ, ধারদেনা পরিশোধের চাপে কৃষক ধান ধরে রাখতে পারবে না।

 (প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন বগুড়া ও রংপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, গাইবান্ধা, শেরপুরের শ্রীবরদী, পাবনার চাটমোহর এবং বগুড়ার ধুনট ও নন্দীগ্রাম প্রতিনিধি)

 

মন্তব্য