kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

দুর্বিষহ যাত্রার পরও আশ্রয় হয় না ইউরোপে

বাংলাদেশিদের আবেদন মঞ্জুরির হার ৫-৭%

মেহেদী হাসান   

১৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দুর্বিষহ যাত্রার পরও আশ্রয় হয় না ইউরোপে

উন্নত জীবনের প্রলোভনে অবৈধভাবে ইউরোপে পৌঁছতে পারলেও স্থায়ী আশ্রয় মিলছে না বাংলাদেশিদের। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপ অভিমুখে যাত্রা করে নিখোঁজ বা নিহত এবং ইউরোপে পৌঁছানো অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তবে ইউরোপে আশ্রয় মঞ্জুর হওয়া অভিবাসীর তালিকায় তলানিতে আছে বাংলাদেশিরা।

ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম সাপোর্ট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য ২৮টি রাষ্ট্র এবং নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডে (ইইউ+) পাঁচ লাখ ৯০ হাজার ৫০০টিরও বেশি আশ্রয়ের (শরণার্থী বা অন্য কোনো সুরক্ষায় থাকার অনুমতি) আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। উৎস দেশওয়ারি আবেদনকারীদের তালিকায় শীর্ষে আছে সিরিয়া ও ইরিত্রিয়া। গত বছর সিরিয়ার আবেদনকারীদের ৮৭ শতাংশ এবং ইরিত্রিয়ার ৮২ শতাংশ ইইউ অঞ্চলে তাদের আশ্রয় পাওয়ার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পেরেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশিদের আবেদন মঞ্জুর হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। গত বছর মার্চ মাসের এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশিদের এক হাজার ৫১৬টি আবেদনের ব্যাপারে প্রথম দফায় সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আশ্রয় মঞ্জুর হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশের। মার্চ মাস শেষে বাংলাদেশিদের ১১ হাজার ৮৭৪টি আবেদন ঝুলে ছিল।

২০১৬ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, ইতালিতে আশ্রয়প্রার্থীদের ৯ শতাংশই ছিল বাংলাদেশি। গত বছর সাইপ্রাস, মাল্টা, এস্তোনিয়া, রুমানিয়া ও ইতালিতে শীর্ষ আশ্রয়প্রার্থীদের পাঁচটি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম ছিল। অন্যদিকে আশ্রয়ের জন্য স্থলপথ ও সমুদ্রপথে ইউরোপে প্রবেশকারী বাংলাদেশির হার ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে বেড়েছে ৬৬৪ শতাংশ।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভয়ংকর বিপজ্জনক এই পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছার অর্থ স্থায়ী আশ্রয় পাওয়া নয়। ইউরোপে যারা থাকার যোগ্যতা পূরণ করতে পারবে না, তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য ইইউ বাংলাদেশ সরকারকে একটি চুক্তি সই করতে বাধ্য করেছে। এর আওতায় এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি ফিরেও এসেছে। বাকিদের ব্যাপারে প্রক্রিয়া চলমান। ইইউয়ের অবস্থান এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট, যারা সেখানে থাকার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবে না, তাদের অবশ্যই ফিরে আসতে হবে।

অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়া এবং সেখানে আশ্রয়প্রার্থীদের উৎস শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও আছে সিরিয়া, ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তিউনিসিয়া, গিনি, তুরস্ক ও আলজেরিয়া। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতার বিচারে ওই দেশগুলোর বেশির ভাগের চেয়ে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে আছে। তা ছাড়া ভৌগোলিক দিক দিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান ইউরোপ থেকে বেশ দূরে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশিদের অবৈধভাবে ইউরোপে গিয়ে আশ্রয় চাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কেউ কেউ এর জন্য বিদেশে বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠার কারণ বলে উল্লেখ করলেও এর সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন কূটনীতিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, জীবিকার খোঁজে এ উপমহাদেশের লোকজনের বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বেশ আগে থেকেই আছে। প্রতিবেশী ভারত অর্থনৈতিকভাবে দিন দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে। আবার ওই দেশটির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক লোকের বিদেশে গিয়ে স্থায়ীভাবে থাকার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

ইইউয়ের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ইইউ অঞ্চলে অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশির সংখ্যা ছিল ৭৪ লাখ ৫৬ হাজার ৫৪০। ওই তালিকায় শীর্ষে আছে সিরিয়া (১২ লাখ ৯৯ হাজার ৩৩০ জন)। এরপর আছে আফগানিস্তান, ইরাক, আলবেনিয়া, মরক্কো ও পাকিস্তান। শীর্ষ ৩০ দেশের তালিকায় ভারত (এক লাখ ৬৬ হাজার ৭৮৫ জন) ১১তম স্থানে আর বাংলাদেশ আছে ১৭তম স্থানে। ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ইইউ অঞ্চলে এক লাখ ১৩ হাজার ২৫৫ জন বাংলাদেশি অবৈধভাবে অবস্থানের তথ্য রয়েছে ইউরোস্ট্যাটের কাছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশিরা অবৈধভাবে শুধু সাগরপথেই ইউরোপে ঢুকছে এমনটি নয়, তারা যাচ্ছে স্থলসীমান্ত দিয়েও। ইইউয়ের সীমান্তবর্তী ইউক্রেনের সরকার গত বছর আগস্ট মাসে বাংলাদেশকে জানিয়েছে, তাদের বন্দিশিবিরে দুই শতাধিক বাংলাদেশি রয়েছে। গত বছর রাশিয়ায় ফুটবল বিশ্বকাপের সময় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি দর্শক খেলা দেখতে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে পাচারকারী চক্র ইইউয়ে ঢোকানোর নামে ইউক্রেনে পাচার করে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের ফিরিয়ে আনার জন্যও ইউক্রেন বাংলাদেশকে অনুরোধ জানিয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা