kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

হেসেখেলে ফাইনালে বাংলাদেশ

সাইদুজ্জামান , ডাবলিন থেকে   

১৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হেসেখেলে ফাইনালে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সহজ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান মুশফিকুর রহিমের ৬৩ ও মাহমুদ উল্লাহর ৩০* রানের ইনিংসের। দুজন পঞ্চম উইকেটে গড়েছিলেন ৫০ রানের জুটি। ছবি-এএফপি

ডাবলিনে পা রেখে খোদ আইরিশদেরও কাঁপাকাঁপি করতে দেখেছিলাম। এরপর প্রবাসী বাঙালিদের কাছ থেকে এখানকার সত্যিকারের শীতকালের রোমহর্ষক বর্ণনাও শুনেছি। বরফের স্তর ঠেলে অফিসগামীদের অনেকের নাকি শীতের সূর্য দেখাই হয়ে ওঠে না। স্বভাবতই ঝলমলে গ্রীষ্ম এ দেশের মানুষের কাছে আমাদের ঈদের মতোই উদ্‌যাপনের দাবি নিয়ে আসে। ইউরোপের লোকজন ‘সামার’ এলেই কেন অফিস ফাঁকি দিয়ে ‘সান বাথিংয়ে’ চলে যায়, এ কদিনের ডাবলিন অভিজ্ঞতা সেটি বুঝিয়ে দিয়েছে। ঝলমলে রোদ মানেই পেশাদারি দুনিয়া থেকে বহুদূরে গা ভাসিয়ে দাও।

গতকাল ম্যালাহাইড ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ডজুড়ে তেমনই আবহ। আমাদের দেশে শীতকালে বিয়ের হিড়িক পড়ে, এক বছর আগে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া-টাড়া করার পরে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়। এ দেশের জনসংখ্যা পঞ্চাশ লাখের মতো। তবু হোটেল, রেস্তোরাঁর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়, এ গ্রীষ্মেই বুঝি বিয়ের পিঁড়িতে বসছেন সব আইরিশরা! চোখ জুড়িয়ে দেওয়া ম্যালাহাইড স্পোর্টস কমপ্লেক্সেরও নিজস্ব একটা রেস্তোরাঁ কাম ওয়েডিং হাউস আছে। বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ শুরু হতেই দেখি একদল কিশোরী সাদা গাউন পরে খোলা মাঠে হুটোপুটি করছে। তার মানে, বিয়ের আসর বসছে এখানেও।

ডাবলিনের এমন উজ্জ্বল গ্রীষ্মদিনের আনন্দ মাটি হতে দেয়নি বাংলাদেশ দলও। ক্লনটার্ফে গ্যালারি অতি ছোট। সে তুলনায় দুটি মেকশিফট গ্যালারি আয়তনে খানিকটা বড়। তবে দর্শকসারিতে গুটিকয় আইরিশদের বাদ দিলে পুরোটাই বাংলাদেশের দখলে। লন্ডন-ডাবলিন ফ্লাইট মাত্র এক ঘণ্টা ১০ মিনিটের। তাই সেখান থেকে সকালের ফ্লাইটে এসেছেন অনেকে। প্রথমে বোলিং এবং পরে প্রিয় দলের ব্যাটিং দেখে ভ্রমণক্লান্তি নিশ্চিতভাবেই ভুলেছেন তাঁরা। তবে আমাদের দেশের বিয়ে তো আর এখানকার মতো নিরবচ্ছিন্ন আনুষ্ঠানিকতা নয়। আমাদের দেশে বরের পকেট খসানোর জন্য গেট ধরা হয়, এ নিয়ে মাঝেমধ্যে মনোমালিন্যও হয়। মঞ্চে আসীন বরের জুতা চুরির জন্য দক্ষ টিম গঠন করে কনে পক্ষ। সে নিয়ে বাগিবতণ্ডা অভাবিত নয়। ইদানীং খাওয়ার মেন্যু নিয়েও ঝড়ঝঞ্ঝার ভিডিও ক্লিপ দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

তো, ক্যারিবীয়দের ২৪৮ রানে আটকে দেওয়ার পরও বাংলাদেশের ফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার আনুষ্ঠানিকতার ধাপে ধাপে ছোটখাটো বিপত্তি দেখা গেছে। ওভারপিছু ৫ রানেরও কম লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে নবম ওভারে বিনা উইকেটে রান রেট যখন ৬, তখন ঝুঁকি নেওয়া অকারণ। কিন্তু তামিম ইকবাল সেটিই করেছেন। ক্যারিবীয় অফস্পিনার অ্যাশলে নার্সের এক ওভারে তৃতীয় বাউন্ডারি হাঁকাতে গিয়ে ডাউন দ্য উইকেটে এসে বোল্ড হয়েছেন তিনি।

সৌম্য সরকার অবশ্য ততক্ষণে টানা দ্বিতীয় ফিফটির দ্বারপ্রান্তে এবং সংযত। সাকিব আল হাসানের শুরুটা দেখে মনে হচ্ছিল আরেকটি ‘ম্যান অন আ মিশন’ প্রদর্শনী হতে চলেছে আজ। উইকেটে এসেই পুল কিংবা কাট ছেঁটে ফেলে সিঙ্গেলসের ওপর উইকেট পড়ছেন। পড়া হয়ে গেলে পরে বাউন্ডারির শটও খেলছেন অনায়াসে। সেই সাকিবও আগ বাড়িয়ে নার্সকে তুলে মারতে গিয়ে উইকেট দিয়ে এসেছেন। তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বুঝিয়েও দিয়েছেন যে ভুলটা নিজেরই। আরেকটি পঞ্চাশোর্ধ্ব জুটি ভাঙার পর ভেঙে পড়েছেন সৌম্য নিজেও। নার্সের ওই ওভারে নিজের বিদায়েও ক্যারিবীয় অফস্পিনারের কৃতিত্বে ভাগ বসিয়েছেন সৌম্য!

এর একটু পর উইকেটে পিছলে পড়েও সহজ রান আউট হওয়া থেকে মোহাম্মদ মিঠুন রক্ষা না পেলে বাংলাদেশের ক্রিকেট বাসর কতটা সুখের হতো, কে জানে! শর্ট থার্ডম্যানে নার্সের হাতে যখন বল, তখন ক্রিজে ফিরতে গিয়ে মাঝ পিচে ধরণি নিয়েছেন মিঠুন। কিন্তু নার্সের থ্রো এতটাই উদ্দেশ্যহীন হলো যে উঠে অনায়াসে ক্রিজে ফিরেছেন এ মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। এরপর মুশফিকুর রহিম ও মিঠুনের জুটিতে ‘হ্যাপিলি লিভড আফটার’ জীবনের শুরু বাংলাদেশের। অফস্টাম্প অ্যাটাক করে মিঠুনকে তুলে নিয়েছেন ক্যারিবীয় অধিনায়ক জেসন হোল্ডার। তবে ততক্ষণে মুশফিকের সঙ্গে চতুর্থ উইকেটে ৮৭ রানের জুটি গড়ে জয়ের পথে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন মিঠুন। আক্ষেপ বলতে তাঁর প্রাপ্য ফিফটির সুযোগ হাতছাড়া করা। অবশ্য তাতে একটা লাভ হয়েছে দলের, ফাইনালের আগে ব্যাটিং অনুশীলনের সুযোগ পেলেন যে মাহমুদ উল্লাহ। মুশফিকের সঙ্গে তাঁর ৫০ রানের পঞ্চম উইকেটের জুটিতে এক ম্যাচ হাতে রেখেই ফাইনাল হাত বাড়ানো দূরত্বে চলে আসে বাংলাদেশের। ৩৩তম ফিফটি করে মুশফিকের অপরাজিত থাকতে না পারাটাই যা অপূর্ণতা। ক্যারিবীয়দের স্বল্প পুঁজি সে সুযোগ দেয়নি মাহমুদ উল্লাহকে, অপরাজিত ৩০ রান করেই থামতে হয়েছে তাঁকে। তখনো ১৬ বল অব্যবহৃত রয়ে যায় বাংলাদেশ ইনিংসের।

বাংলাদেশের পিছু নিয়ে গিয়ে আয়ারল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ডুয়েল দেখাই হয়নি। বৃষ্টির কারণে স্বাগতিকদের ক্রিকেটও অদেখা রয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশের বিপক্ষে ক্যারিবীয়দের গোবেচারা টাইপের দুটি ম্যাচ দেখা হয়ে গেছে। গোবেচারা টাইপই তো। শাই হোপ কি শুধু সেঞ্চুরির মালা গাঁথার জন্যই ক্রিকেট খেলছেন নাকি? রানের থমকে থাকা চাকা সচল করার দায়িত্ব সব সময়ই বর্তায় ইনফর্ম ব্যাটসম্যানের ওপর। কিন্তু বাংলাদেশের বিপক্ষে তিন সেঞ্চুরির পর গতকাল ৮৭ রান করা শাই হোপের ব্যাটিংয়ে সেই ঝাঁজ নেই।

অবশ্য তাঁকে একা শূলে চড়িয়ে লাভ কী? ক্যারিবীয় মিডল অর্ডারেই কোনো মসলা নেই। টস হেরে বোলিংয়ে নামা বাংলাদেশের শুরুটা ভালো হয়নি। ওভারপিছু ৬ করে ধেয়ে চলা ইনিংস গতিমন্থরতায় ভুগতে শুরু করে মাশরাফি বিন মর্তুজা স্পিন নিয়ে ঝাঁপাতেই। অষ্টম ওভারে মেহেদী হাসান মিরাজ আক্রমণে আসার পর থেকে শুরু। এরপর সাকিবের ক্লাসিক্যাল বাঁহাতি স্পিন। ১০ ওভারে মাত্র ২৭ রান দিয়ে ১ উইকেট নিয়েছেন তিনি। তাতে হাঁসফাঁস করতে থাকা ক্যারিবীয়রা রানের গতি বাড়াতে গিয়ে এলোপাতাড়ি খেলেছে এবং উইকেট দিয়ে ফিরেছে।

আশার কথা, ক্যারিবীয়দের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পেরেছেন বাংলাদেশি বোলাররা। সে দুর্বলতা বুঝে শিকার তুলে নেওয়াও কৃতিত্বের। গত ম্যাচের মতো গতকালও সাকিব ও মিরাজ রানের চাকা আটকেছেন এবং সময়মতো উইকেট তুলে নিয়েছেন মাশরাফি ও মুস্তাফিজ। ক্লনটার্ফে অনুষ্ঠিত প্রথম ম্যাচে তবু একটা সময় তিন শর সম্ভাবনা জাগিয়েছিল ক্যারিবীয়রা। কিন্তু গ্রীষ্মের এমন উৎসবের দিনে খেলা ১০ ওভার না গড়াতেই বোঝা যাচ্ছিল বড়জোর আড়াই শ। শেষমেশ সেটাও পারেনি, আপাতদৃষ্টিতে যা করতে দেয়নি বাংলাদেশ।

ফুটনোটে থাকছেন গতকালই ওয়ানডেতে অভিষিক্ত আবু জায়েদ রাহি। ইনিংসের প্রথম এবং শেষ ওভারটি করেছেন তিনি। ৯ ওভারে ৫৬ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি। ম্যাচের আবহে এ ফিগারটাও গোবেচারা টাইপ, নির্বিবাদী!

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা