kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

শিক্ষালয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির কী দরকার?

শরীফুল আলম সুমন   

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শিক্ষালয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির কী দরকার?

দেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের শতভাগ বেতন সরকার দিলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্বে আছে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি)। একইভাবে কলেজ পরিচালনার দায়িত্বে গভর্নিং বডি (জিবি) বা পরিচালনা পর্ষদ। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে ওই ম্যানেজিং (ব্যবস্থাপনা) কমিটি ও জিবির বিধান করা হয়েছিল, তা সফল হচ্ছে না। এসএমসি ও জিবির সদস্যরা আর্থিক বিষয় ছাড়া অন্য কাজে মন দেয় না। শিক্ষার মান কিংবা শিক্ষার্থীদের সমস্যার প্রতিও তাদের নজর দিতে দেখা যায় না। ফলে ওই সব কমিটি বা বডির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় জিবির ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে ব্যাপকভাবে। কারণ ওই ঘটনার মূল হোতা মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, যিনি আগে থেকেই নুসরাতকে যৌন নিপীড়ন করে আসছিলেন। অথচ এই মাদরাসার জিবির সহসভাপতি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন যৌন নিপীড়ক সিরাজের পক্ষে সরাসরি কাজ করেছেন। এমনকি অন্য মাদরাসা থেকে নানা অনিয়ম করে আসা অধ্যক্ষ সিরাজকে ২০০১ সালে জেনেশুনেই নিয়োগ দিয়েছিল তখনকার জিবি।

শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নুসরাতকে যৌন নিপীড়ন করার অভিযোগ ওঠার পর সবার আগে এগিয়ে আসার কথা ছিল জিবির। তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এটি। কিন্তু জিবির বেশির ভাগ সদস্যের অধ্যক্ষের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন থাকায় তারা নিপীড়কের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।

জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে ব্যক্তি উদ্যোগেই চলত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০০৪ সাল থেকে শতভাগ বেতন দিচ্ছে সরকার। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্যই ১৯৭৭ সালে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল, যা সর্বশেষ সংশোধন করা হয় ২০০৯ সালে।

কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ১৯৭৭ সালের বাস্তবতায় ওই প্রবিধানমালা ঠিক থাকলেও বর্তমানে তা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ তখন ব্যবস্থাপনা কমিটিকেই শিক্ষকদের বেতন দেওয়াসহ সব কিছু দেখভাল করতে হতো। কিন্তু এখন তাদের সেই ভূমিকা নেই।

প্রবিধানমালায় ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির দায়িত্ব উল্লেখ আছে—তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক নিয়োগ, সাময়িক বরখাস্ত ও অপসারণ, বার্ষিক বাজেট অনুমোদন, ছাত্র-ছাত্রীদের বিনা বেতনে অধ্যয়ন মঞ্জুরি, ছুটির তালিকা অনুমোদন, স্টাফদের বাসস্থান ও শিক্ষার্থীদের হোস্টেলের ব্যবস্থা করা; জমি, ভবন, খেলার মাঠ, বই, ল্যাবরেটরি, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন ধরনের আর্থিক তহবিল গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ, স্কুলের সম্পত্তি কাস্টডিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রদান নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের নিয়ে প্রি-সেশন সম্মেলনের ব্যবস্থা করা, যাতে বিগত বছরের মূল্যায়ন ও আগামী বছরের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা থাকবে। প্রবিধানমালায় এসএমসি ও জিবির ১৬টি দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বর্তমানে বেশির ভাগ দায়িত্বই সারে সরকার।

২০১৭ সালের জুন মাসে হাইকোর্ট এক রায়ে এসএমসি ও জিবিতে সংসদ সদস্যদের ইচ্ছামতো সভাপতি হওয়ার বিধান বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করেন। এখনো রাজনীতিকরাই মূলত এসএমসি ও জিবির সভাপতির দায়িত্বে থাকছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ আছে। রাজধানীর বিভিন্ন নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অবৈধ ভর্তি ও তহবিল তসরুপের হোতা তারা, যা শিক্ষা প্রশাসনের তদন্তে প্রমাণিতও হয়েছে বিভিন্ন সময়। অভিযোগ আছে, ঢাকার নামি প্রতিষ্ঠানে জিবির সদস্য হতে একেকজন প্রার্থীকে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়।

জানা যায়, বর্তমানে সহকারী শিক্ষক ও প্রভাষক নিয়োগের ক্ষমতা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষকে (এনটিআরসিএ) দেওয়া হলেও প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও কর্মচারী পদে আগের মতোই বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দিচ্ছে এসএমসি ও জিবি। বেশির ভাগ স্কুল-কলেজ ঘিরে বাজারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তাদের পৃষ্ঠপোষকতায়। ওই সব প্রতিষ্ঠানের আয়ের বেশির ভাগই যায় এমএমসি বা জিবি সদস্যদের পকেটে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের সব লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের সঙ্গে সভাপতির সই থাকতে হয় ব্যাংক চেকে। ফলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সঙ্গে যোগসাজশে ইচ্ছামতো লেনদেন করে সভাপতিরা। এসএমসি ও জিবি অনুমোদনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের। সেই অনুমোদনের ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ আছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয় ম্যানেজিং কমিটির দরকার নেই, তাহলে আমরা সেভাবেই দেখভাল করব। প্রতিটি উপজেলায়ই শিক্ষা অফিস আছে। সরকারি স্কুলে ডিসির নেতৃত্বে ভর্তি ও মনিটরিং কমিটি আছে। বেসরকারি স্কুলের জন্যও সেভাবে থাকতে পারে পরামর্শক বা তদারকি কমিটি। আর সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতোই উপজেলা পর্যায়ের স্কুল বা কলেজের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা গণ্যমান্য ব্যক্তিদের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।’   

রাজধানীর একটি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এত দিন এসএমসি ও জিবির সদস্যরা টাকা খেয়ে অযোগ্য ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ফলে আজ দেশে যোগ্য শিক্ষকের বড় অভাব। সরকার যেহেতু সব কিছু দেয়, তাহলে তারাই পারে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দিক দেখভাল করতে।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিয়মতান্ত্রিক পরিচালনার জন্য একটি বডির প্রয়োজন। সেটা হতে পারে শিক্ষক ও অভিভাবক মিলে অথবা নির্বাচনের মাধ্যমে, যাতে ওই প্রতিষ্ঠানের কারো কোনো সমস্যা হলে পরিচালনা কমিটির কাছে তা বলতে পারে। কিন্তু পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, ভর্তি বাণিজ্য ও নিয়োগ বাণিজ্য। ফলে অভিভাবকরা জিম্মি হচ্ছেন। যেখানে সুশাসন ব্যাহত হয়, সেখানে শিক্ষার মানও ব্যাহত হয়। তবে আমরা সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম, যদি সব মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত হতো।’

আন্ত শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাবকমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ম্যানেজিং কমিটি যে সব জায়গায় দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়, তা কিন্তু নয়। দু-এক জায়গায় তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে। তবে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ এলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিই। আগে ম্যানেজিং কমিটি সব কিছু করত; কিন্তু এখন সরকার শতভাগ বেতনসহ অন্যান্য সুবিধা দেয়। ফলে যুগের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রবিধানমালা প্রয়োজন, যা আমরা এরই মধ্যে ভাবতে শুরু করেছি।’

 

মন্তব্য