kalerkantho

এবার সড়কে পিষ্ট লাবণ্যর জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এবার সড়কে পিষ্ট লাবণ্যর জীবন

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাহমিদা হক লাবণ্য

আবরারকে বাসচাপায় হত্যার ক্ষত না শুকাতেই আরেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর জীবনচাকা থেমেছে রাজধানীর সড়কে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মিরপুর সড়কের জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সামনে দ্রুতগতির কাভার্ড ভ্যান একটি মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিলে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে। রাজপথে প্রাণ হারানো ফাহমিদা হক লাবণ্য (২১) ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিইসি) বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। আবরারের মতো লাবণ্যও ছিলেন নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য। লাবণ্যর গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুরের হরিপুর গ্রামে।  

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী এবং লাবণ্যর স্বজন ও সহপাঠীরা জানান, শ্যামলীর বাসা থেকে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং কম্পানির মোটরসাইকেলে চেপে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে যাচ্ছিলেন লাবণ্য। লাল রঙের কাভার্ড ভ্যানটি তাঁকে বহনকারী মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। গত রাত পর্যন্ত কাভার্ড ভ্যানটি শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। পাশের ভবনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে পুলিশ সেটি শনাক্তের চেষ্টা করছে।

এদিকে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় মোটরসাইকেলটির চালকও আহত হন। সুমন নামে আহত ওই চালকই পথচারীদের সহায়তায় লাবণ্যকে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা লাবণ্যকে মৃত ঘোষণা করলে রাইড শেয়ারিং কম্পানির মোটরসাইকেলের চালক সুমন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েই সটকে পড়েন। লাবণ্য উবারের মটো রাইড শেয়ারের যাত্রী ছিলেন বলে দাবি করে স্বজনরা। গত রাতে উবারের সহায়তায় মোটরসাইকেলটির চালককে বের করে তাঁর কাছ থেকে তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা করছিল পুলিশ। হাসপাতালে দেওয়া সুমনের মোবাইল ফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। 

অন্যদিকে শিক্ষার্থী লাবণ্যর মৃত্যুর খবর পেয়ে স্বজনরা সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ মর্গে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ে। বিকেল থেকেই সহপাঠীরাও সেখানে ভিড় করেন। এ সময় তাঁরা দোষী কাভার্ড ভ্যানচালকের বিচার দাবি করেন। দ্রুত চালককে আইনের আওতায় না আনা হলে আন্দোলনের হুমকিও দেন তাঁরা।

শেরেবাংলানগর থানার ওসি জানে আলম মুনশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানান, লাবণ্য রাইড শেয়ারিং কম্পানির মোটরসাইকেলে চড়ে ক্লাসে যাচ্ছিলেন। সকাল ১১টার দিকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের কাছে এলে পেছন দিক থেকে একটি কাভার্ড ভ্যান তাঁকে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি ছিটকে পড়ে আহত হন। ওই বাইকের চালক গুরুতর অবস্থায় লাবণ্যকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। দুর্ঘটনার পর কাভার্ড ভ্যান নিয়ে চালক পালিয়ে যায়। হাসপাতালে নিজের প্রেসক্রিপশন রেখেই পালিয়ে যান মোটরসাইকেলের চালক। হাসপাতালে দেওয়া তাঁর মোবাইল ফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

জানা গেছে, সুমনের মোটরসাইকেলের নম্বর ঢাকা মেট্রো হ-৩৬-২৩৫৮। তাঁর মোবাইল ফোনে গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বন্ধ পাওয়া যায়। সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ মর্গে উপস্থিত হওয়া লাবণ্যর সহপাঠী লাবিব সাদ ওয়াহিদ জানান, লাবণ্যর মোবাইল ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে। ওই ফোনের তথ্য অনুযায়ী, লাবণ্য উবারের অ্যাপ ব্যবহার করছিলেন।

শেরেবাংলানগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল ইসলাম বলেন, দুপুরে দুর্ঘটনার পর পথচারীদের সহায়তায় লাবণ্য ও সুমন প্রথমে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে যান। সেখান থেকে দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঠানো হয়। হৃদরোগ হাসপাতাল থেকে ৯৯৯-এ ফোন করে বলা হয়, দুর্ঘটনায় আহত দুজন তাদের হাসপাতালে এসেছে। এরপর নুরুল ইসলাম সেখানে যান। লাবণ্যর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিচয় জানা যায়। দুপুরে স্বজনদের খবর দিলে তারা হাসপাতালে যায়। তিনি আরো বলেন, লাবণ্যর বাবার নাম এমদাদুল হক। পরিবারের সঙ্গে লাবণ্য শ্যামলীর ৩ নম্বর সড়কের ৩৩ নম্বর বাড়িতে থাকতেন।

বিকেলে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গের সামনে গিয়ে দেখা যায়, লাবণ্যর বাবা এমদাদুল হক ও ছোট ভাই ফারহানুল হক মৃদুলসহ ঘনিষ্ঠ স্বজনরা কেঁদে কেঁদে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা এমদাদুল হক বলেন, ‘আমার মেয়েটা এভাবে চলে গেল, কী বলব? আপনারা আমার মেয়েটার জন্য দোয়া করবেন।’ কথা শেষে ফের কেঁদে ওঠেন তিনি।

লাবণ্যর খালাতো ভাই ফেরদৌস রাকিব জানান, এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে লাবণ্য ছিলেন বড়। তাঁর ছোট ভাই মৃদুল এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তাদের বাবা এমদাদুল হক সাভারের এশিয়ান পাওয়ার ইলেকট্রনিকসের মালিক। লাবণ্য প্রতিদিন নিজেদের গাড়িতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন। মাঝেমধ্যে তিনি রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করতেন। গতকাল তাঁর ছোট ভাই গাড়ি নেওয়ায় লাবণ্য মোটরসাইকেলে করেই ক্লাসের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

সাভারের হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝরা গ্রামে লাবণ্যর নানার বাড়ি। গত রাতে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে শ্যামলী জামে মসজিদের সামনে লাবণ্যর প্রথম জানাজা হয়। এরপর লাশ দাফনের জন্য নানার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

ফুটেজে ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় লাল কাভার্ড ভ্যান : সরেজমিনে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের ফটকের কাছে ফুটপাতের ফল বিক্রেতা সম্রাট চৌকিদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তখন সকাল ১১টার মতো হবে। হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমার সামনে ১ নম্বর গেটে ঘটনা। শ্যামলীর পাশ থেকে আসাদ গেটের দিকে একটা ট্রাক (কাভার্ড ভ্যান) দ্রুত চইলা গেল, আর রাস্তার মধ্যে একটা মাইয়া পইড়া আছে। মোটরসাইকেলের পাশে একটা ছেলেও আছে। পরে বোঝলাম এইডা অ্যাকসিডেন্ট। লোকজন ধরাধরি কইরা ওদের নিয়া গেছে। রাস্তায় রক্ত পইড়া ছিল। দুপুরে শুনি মাইয়াটা মইরা গেছে।’  

প্রত্যক্ষদর্শী হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের লিফটম্যান মফিজউদ্দিন বলেন, ‘আমি একটা ওষুধ নিতে বাইরে আসি। দেখি রাস্তায় বাইক নিয়ে একটি ছেলে আর একটা মেয়ে পড়ে আছে। আমিও সেখানে যাই। পরে ওদের রিকশায় তুলে দেওয়া হয়। মেয়েটার মাথা দিয়ে রক্ত পড়ছিল।’

ঘটনাস্থলের উল্টোদিকে (রাস্তার পশ্চিম পাশে) বেশ কয়েকটি ফার্মেসি ও দোকান আছে। এর মধ্যে অনুরাগ নামে একটি রেস্টুরেন্টে সিসি ক্যামেরা আছে। ওই প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরায় ঘটনাটি দূর থেকে অস্পষ্ট ধরা পড়েছে। এতে দেখা যায়, সকাল ১০টা ৪৬ মিনিটে লাবণ্যকে বহন করা মোটরসাইকেলটি হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সামনের রাস্তা দিয়ে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে। মোটরসাইকেলটি রাস্তার ডান দিকে ছিল। এ সময় পেছন থেকে রাস্তার মাঝামাঝি এসে একটি লাল রঙের কাভার্ড ভ্যান মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। এতে মোটরসাইকেলটি ছিটকে পড়ে যায়। লাবণ্য ও চালকও পড়ে যান। কাভার্ড ভ্যানটি না দাঁড়িয়ে দ্রুত চলে যায় সেখান থেকে।

এসআই নুরুল ইসলাম বলেন, ‘কাভার্ড ভ্যানটির নম্বর শনাক্ত করা যাচ্ছে না। অন্য একটি ভবনের ক্যামেরা থেকে আরো কাছের ফুটেজ পাওয়া যায় কি না তা আমরা দেখছি।’

লাবণ্যর স্বপ্ন্ন ছিল পরিবারের জন্য কিছু করার : স্বজনরা জানায়, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন লাবণ্য। মেধাবী এই শিক্ষার্থী লেখাপড়া শেষ করে কম্পিউটার প্রকৌশল খাতে পেশাজীবী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর বন্ধু ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী শফিউল আলম রুপম বলেন, ‘ও বলত, সর্বোচ্চ জিপিএ নিয়ে সে বের হতে চায়। এরপর পরিবারের জন্য কিছু করতে চায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘লাবণ্যও নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে ছিল। এমন একটা সম্ভাবনাময় জীবন শেষ হয়ে গেল।’

প্রসঙ্গত, গত ১৯ মার্চ রাজধানীর প্রগতি সরণির বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ফটকের কাছে জেব্রাক্রসিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে বিইউপি ছাত্র আবরারকে চাপা দিয়ে হত্যা করে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস। এ ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। এর আগে গত বছর বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীকে বাসচাপায় হত্যার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে অবরোধের মাধ্যমে বড় আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা। ওই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন আবরার ও লাবণ্য। আবরারের মৃত্যুর পর আট দফা দাবি উঠলে পুলিশ নগর প্রশাসন চালক, সহকারী, মালিককে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সর্বশেষ গতকাল পুলিশ আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে।

মন্তব্য