kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

সিপিডির মূল্যায়ন

সরকারের ১০০ দিনের কর্মকাণ্ড উদ্যোগ উচ্ছ্বাসহীন

বিশেষ প্রতিনিধি   

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সরকারের ১০০ দিনের কর্মকাণ্ড উদ্যোগ উচ্ছ্বাসহীন

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারের ১০০ দিনের পরিকল্পনা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে আরো সময় দিতে হবে। তবে বিবেচ্য বিষয় হলো—একটি সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, পেছনের অভিজ্ঞতার আলোকে নতুনভাবে কিছু উদ্যোগ নেয়। আর সে উদ্যোগের প্রাথমিক বিন্দু হলো তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। দেশে এ পর্যন্ত যত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এসেছে, তার মধ্যে আওয়ামী লীগের এবারের প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে বেশি সুচিন্তিত। সে কারণে সরকার ও শাসকদলের এটির ব্যাপারে সমানভাবে নিষ্ঠাবান হওয়া উচিত। আশা করা হয়েছিল শুরুটা বড় ধরনের একটি উত্থানের মধ্য দিয়ে হবে। কিন্তু গত ১০০ দিনে সরকারের ব্যাপারে সার্বিক মূল্যায়ন হলো, ‘আমরা উৎসাহহীন, উদ্যোগহীন, উচ্ছ্বাসহীন এবং একটি উদ্যমহীন সরকার দেখেছি।’

সরকারের ১০০ দিনের কর্মকাণ্ডের ওপর মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশকালে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এ কথা বলেন প্রতিষ্ঠানটির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল দিনবদলের, কিন্তু বদল আটকিয়ে রাখছে এমন একটি গোষ্ঠী, যারা এই মুহূর্তে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনা থেকে সুবিধাভোগী। রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে থাকা এই সুবিধাভোগী সম্প্রদায় রাজনৈতিক শক্তিকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে দিচ্ছে না। অর্থাৎ রাষ্ট্র যারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের কার্যক্রমের সঙ্গে শাসকদলের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে এই ভিন্নতা দূর করতে না পারলে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারকে কাল্পনিক দলিল হিসেবে ইতিহাস বিচার করবে।’

বক্তারা বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হিসাবে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৮ শতাংশের বেশি। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য চলকগুলোতে এর প্রতিফলন নেই। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ, পুঁজির আমদানি, কর আদায়, ব্যাংকের ঋণপ্রবাহ, মূল্যস্ফীতি এবং শ্রমের উৎপাদনশীলতার তথ্যের সঙ্গে উচ্চ প্রবৃদ্ধির মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। এ অবস্থায় কী কী তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধির এই হিসাব করা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হোক।

তাঁরা বলেন, একটি প্রথিত গোষ্ঠী সরকারকে প্রভাবিত করে নীতিনির্ধারণ করছে। এর ফলে ঋণখেলাপিসহ অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আর চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয়ে ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে প্রবৃদ্ধিনির্ভর অর্থনৈতিক পর্যালোচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী যে আলোচনা হচ্ছে, তার মূল কথা প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ, তবে যথেষ্ট নয়। এ কারণে মানব উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সূচকের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ যে বৈশ্বিক ঐকমত্য হয়েছে, তা হলো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি। এটি প্রবৃদ্ধির বাইরে গিয়ে পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নের ধারণাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এ কারণে প্রবৃদ্ধি নিয়ে যখন আলোচনা হবে, তখন পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নের বিষয়টি যাতে আমাদের ধারণার বাইরে চলে না যায়, তা বিবেচনায় রাখতে হবে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে দেশে জিডিপির যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উচ্চতর, প্রশংসনীয় এবং অনেকের কাছে ঈর্ষণীয়। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে উন্নয়নের যে তথ্য এসেছে, এর মধ্যে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের বাড়তি কোনো ভূমিকা নেই। অন্যদিকে উন্নয়ন হলে যে ধরনের কর আহরণ হয়, সেই কর আহরণ দেখিনি। বাড়েনি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ। ব্যাংকিং খাতে ঋণ পরিশোধেও চাঞ্চল্য নেই। বড় ধরনের পুঁজি পণ্যের আমদানিতে গত বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি কমেছে। ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে ধরনের চলক থাকে, সেই চলকগুলোতে যে প্রতিফলন হওয়ার কথা, সেগুলো আমাদের কাছে ধরা পড়ছে না। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, প্রবৃদ্ধি কী উপকারে আসছে?’

দেবপ্রিয় বলেন, ‘দ্বিতীয় বিষয় হলো, ধরে নিলাম যে প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে সেটি সঠিক। এদিকে বিনিয়োগ যে হয়নি সেটি পরিষ্কার। এ পর্যায়ে প্রবৃদ্ধির ব্যাখ্যায় দেখতে হবে দেশে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে কি না। অর্থাৎ পুঁজি বিনিয়োগ কম হওয়ায় শ্রমের উৎপাদন বড় করে সামনে আসবে। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশে এমন কী প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনীযুক্ত রূপান্তর ঘটেছে যে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৈপ্লবিকভাবে বেড়ে গেল?’ তিনি বলেন, ‘শ্রমের যে উৎপাদনশীলতার কথা বলছি এটি শুধু গার্মেন্ট নয়; এর মধ্যে কৃষি, পরিবহন, ব্যবসাসহ সব কিছু আছে।’

দেবপ্রিয় বলেন, ‘ধরে নিলাম শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। এতে শ্রমিকের আয় বাড়ার কথা। কিন্তু খানা জরিপসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার জরিপে দেখা গেছে বৈষম্য বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে এই প্রবৃদ্ধির ব্যাখ্যা হলো, যাদের হাতে কাজ আছে, তাদের আয় বাড়ছে। আর যাদের নেই, তাদের কাজ হচ্ছে না। তাদের আয়ও নেই। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। সে কারণে আমরা বলছি, প্রবৃদ্ধির হিসাব যদি সঠিকভাবে করা হয়েও থাকে, সে ক্ষেত্রে এর যে ফলাফল দেখা যাচ্ছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন করে।’

দেবপ্রিয় বলেন, বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য পাওয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি দুষ্কর। এটি সিপিডি থেকেও বলা হচ্ছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকেও এ তথ্য আসছে। এ ছাড়া যেসব পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে, তার ওপর আগের চেয়ে নির্ভরশীলতা কমেছে। সে কারণে সরকারি এই পরিসংখ্যানগুলো আরেকটু ভেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

তাঁর মতে, ‘প্রবৃদ্ধির হিসাবের ক্ষেত্রে যে ডিফ্লেটেড (মূল্য সমন্বয়ক) ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে মূল প্রবৃদ্ধি থেকে মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের কিছু বেশি বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারি হিসাবেই মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের ওপরে। সে ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ১ থেকে দেড় শতাংশ কমিয়ে দেখানো হয়েছে। এই বাড়তি মূল্যস্ফীতিটুকু বাদ দিলেই প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ কমত। ফলে কী কারণে এই ১ থেকে দেড় শতাংশ সমন্বয়ে সমস্যা হচ্ছে সেটি আমাদের বোঝার ব্যাপার।’ তিনি বলেন, ‘এই সন্দেহ নিরসনের জন্য আমরা বলছি, যে সমস্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধির হিসাব অনুমিত হয়েছে তা সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা হোক।’ তিনি বলেন, ‘প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হয়েছে বলে কোনো হিংসা, পরিতাপ বা গ্লানি এখানে নেই। আমরা এখানে হিসাবের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি চাই। যার মাধ্যমে পরবর্তী নীতিনির্ধারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।’

দেবপ্রিয় বলেন, ‘বর্তমানে শুধু ব্যাংকিং খাত, কর আহরণ, শেয়ারবাজারে সমস্যা নয়। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বৈদেশিক লেনদেন ও দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এগুলো যেকোনো সময় আমাদের সোনার সংসারে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। এসব ব্যাপারে সচেতন কোনো পদক্ষেপ দেখি না। কিন্তু গত কয়েক বছরে এখানে স্থিতিশীলতা ছিল।’

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘ব্যাংকিং নীতিমালার ক্ষেত্রে আমরা উল্টো দিকে হাঁটছি। কারণ এই মুহূর্তে দেশে বড় সমস্যা সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ। সরকার খেলাপি কমানোর কথা বলছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও খেলাপি আদায়ে উদ্যোগ না নিয়ে আইন-কানুন পরিবর্তনের মাধ্যমে খেলাপিদের বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে ঋণ কম দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমরা নাগরিকদের নিয়ে ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথা ভাবছি।’

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, গত অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা ঘাটতি ছিল। কর রাজস্ব ৮৭ শতাংশ এবং করবহির্ভূত ১৩ শতাংশ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে।

 

মন্তব্য