kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

এক দিনেই চার্জশিটভুক্ত সাত আসামির জামিন

বিশেষ প্রতিনিধি   

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এক দিনেই চার্জশিটভুক্ত সাত আসামির জামিন

ঢাকার দোহার উপজেলার পূর্বচর গ্রামের জালাল মাদবর হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত (অভিযোগপত্রভুক্ত) সাত আসামিকে এক দিনেই জামিন দেওয়া হয়েছে। গত ৯ এপ্রিল ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণের পর তাদের জামিন দেওয়া হয়। হত্যা মামলায় এক দিনে সাত আসামিকে জামিন দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন বাদী। ন্যায়বিচার পাবেন কি না তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

২০১৬ সালের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ৩৩ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় পুলিশ। গত ৯ এপ্রিল আইনজীবীর মাধ্যমে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এস এম মনিরুজ্জামানের আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চান পলাতক সাত আসামি। শুনানি শেষে আদালত জামিন দেন।

জামিনপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন মো. আলামিন, আলাউদ্দিন মোল্লা, কুদ্দুস খালাসী, মনির খালাসী, নাজমা আক্তার, মাসুদ মোল্লা ও মহসিন মোল্লা। আদালত আদেশে উল্লেখ করেছেন, আসামিরা চার্জশিটভুক্ত আসামি। আসামি আলাউদ্দিন, কুদ্দুস ও নাজমা বেগম এজাহারনামীয় আসামি নয়। অন্যান্য আসামি এজাহারনামীয়। তবে এই মামলার সাক্ষীরা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে সুনির্দিষ্ট কিছু বলেননি। অভিযোগপত্র পর্যালোচনায় ও সার্বিক বিবেচনায় আসামিদের জামিন মঞ্জুর করা হলো।

ওই সাত আসামির জামিনের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা জেলার আদালত পুলিশ পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান গত সোমবার ফোনে বলেন, ‘নথি না দেখে এভাবে জবাব দেওয়া যাবে না।’ পরে জামিনের বিষয়টি তিনি জানেন কি না জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমি শুনেছি সাতজন জামিন পেয়েছেন।’ তবে শুনানিতে প্রসিকিউশন পক্ষে কোর্ট সাব-ইনস্পেক্টর সাইফুল ইসলাম ছিলেন বলে তিনি জানান।

নিহত জালাল মাদবরের ছেলে ও মামলার বাদী সাকিব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাত আসামি সারেন্ডার করার পর আদালত জামিন দিয়েছেন। কিছু বলার ভাষা নেই। এরা প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ আসামি। কয়েকজনের নাম এজাহারে ছিল। তারা তিন বছর ধরে পলাতক। আমার বাবাকে নির্মমভাবে খুন করেছে সবাই। কিন্তু এক দিনের জন্যও তাদের জেল খাটতে হলো না। আমি বিস্মিত। দুঃখ করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। বেশির ভাগ আসামি জামিন পেয়েছে। আমাকে পরোক্ষভাবে হুমকি দেওয়া শুরু করেছে আসামিরা। মামলার বিচার পাব কি না তা নিয়ে সংশয়ে আছি।’

জালাল মাদবরের আরেক ছেলে মো. দেলোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা শুনেছি যে সাত আসামি সারেন্ডার করে জামিন নিয়েছেন। হত্যা মামলায় সহজে জামিন হয় না, এটাই আমরা জানতাম। এখন দেখছি তা-ও হয়।’ তিনি বলেন, ‘আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। তারা প্রভাব খাটিয়ে জামিন নিয়েছেন।’ তিনি জানান, এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরাও বিভিন্ন আদালত থেকে জামিন পেয়েছে। তবে একসঙ্গে সাত আসামির জামিন পাওয়ার ঘটনা তিনি আগে কখনো শোনেননি।

ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী ঢাকার সিনিয়র আইনজীবী আবুল কালাম বলেন, ‘জামিন দেওয়ার এখতিয়ার যেকোনো আদালতের রয়েছে। আদালত যদি সন্তুষ্ট হন যে আসামিকে মিথ্যাভাবে কোনো মামলায় জড়ানো হয়েছে বা অপরাধের সঙ্গে আসামির সংশ্লিষ্টতা নেই, আসামি ঘটনার শিকার তাহলে জামিন দিতে পারেন। কিন্তু হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামিকে জামিন সাধারণত দেওয়া হয় না।’

জানা যায়, পূর্বচর গ্রামের আলাল মাদবর গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সদস্য পদে প্রার্থী ছিলেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী একই গ্রামের আবুল হোসেন বেপারী নির্বাচনে জয়ী হন। আবুল হোসেনের লোকজনের সঙ্গে পরাজিত প্রার্থী আলাল মাদবরের লোকজনের তর্ক হয় ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ। এরই জের ধরে আবুল হোসেন ও তার লোকজন দেশি অস্ত্রসহ আলাল মাদবরের ভাই জালাল মাদবরের বাড়িতে হামলা করে। তারা টেঁটা দিয়ে জালাল মাদবরের বুকে আঘাত করতে থাকে। টেঁটার আঘাতে জালাল মাদবরের বুকে সাত-আটটি ছিদ্র হয়। এ ছাড়া মাথাসহ শরীরের অন্যান্য স্থানেও আঘাত করায় জালাল মাদবর মারাত্মক জখম হন। পরিবারের লোকজন তাঁকে উদ্ধার করতে এগিয়ে গেলে তাদেরও মারধর করা হয়। এতে জালাল মাদবরের স্ত্রী, ছেলে বিল্লাল, শাহিন, দেলোয়ারসহ অনেকে মারাত্মক আহত হয়। পরে জালাল মাদবরকে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। কয়েকজনকে উচ্চতর চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ওই ঘটনায় জালাল মাদবরের ছেলে সাকিব হোসেন বাদী হয়ে আবুল হোসেন বেপারী ওরফে আবুল মেম্বারসহ ২০ জনের নাম উল্লেখসহ বেনামি আরো ২০-২৫ জনকে আসামি করে দোহার থানায় মামলা করেন।

প্রথমে ওই থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. সিরাজুল ইসলাম খান তদন্ত করেন। পরে সিআইডিকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঢাকা জেলা সিআইডির পরিদর্শক বিষ্ণু ব্রত মল্লিক গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ৩৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। তাদের মধ্যে ২১ জন বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয় এবং আদালতে আত্মসমর্পণ করে। ১২ জন পলাতক ছিল। তাদের মধ্যে সাতজন জামিন পেল।

মন্তব্য