kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

ভয়াবহ হামলায় স্তম্ভিত শ্রীলঙ্কা

‘ঈশ্বর কোথায় থাকেন?’

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘ঈশ্বর কোথায় থাকেন?’

ছবি: ইন্টারনেট

কলম্বোর রাস্তা ঝাড়ু দেন মালতি বিক্রমা। এখন তিনি রক্তাক্ত দ্বীপপুঞ্জটির চরম আতঙ্কিত এক বাসিন্দা। ইস্টার সানডের ভয়াবহ হামলার এক দিন পর গতকাল সোমবার কাজ শুরু করতে ভয় পাচ্ছিলেন মালতি, ‘ময়লার সঙ্গে যদি কালো প্লাস্টিকের কোনো প্যাকেট তুলে নিই! কালকের (গত রবিবার) লাগাতার বিস্ফোরণ ১০ বছর আগের সময়কে মনে করিয়ে দিচ্ছে। ওই সময়ও পার্সেল বোমার আতঙ্কে বাসে-ট্রেনে উঠতে ভয় লাগত।’ অর্থাৎ রবিবারের হামলা দেশের গৃহযুদ্ধের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে শ্রীলঙ্কার মানুষকে। তিন দশক ধরে চলা তামিল বিদ্রোহীদের ওই লড়াইয়ে লক্ষাধিক লোক প্রাণ হারায়।

শান্তি প্রসাদের কষ্টটা অবশ্য একটু অন্য রকম। হামলার পর গির্জা থেকে আহত শিশুদের তুলে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। তাঁর তৎপরতায় অন্তত আট শিশুর প্রাণ বেঁচে যায়। এক দিন আগের কথা মনে করে গতকাল তিনি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আট শিশুর মধ্যে দুটি মেয়ের বয়স ছিল ছয় আর আট। আমার মেয়েদের সমান। জামাগুলো ছিঁড়ে গেছে। তাতে রক্তের দাগ। চোখে দেখা যায় না!’ ১০ বছর আগে শেষ  হওয়া গৃহযুদ্ধের সময় এগুলো ছিল সাধারণ দৃশ্য। রোজ কোথাও না কোথাও বোমা পড়ত। পথে-ঘাটে-গাড়িতে মরে পড়ে থাকত মানুষ।

এই মাত্রার সহিংসতার সঙ্গে শ্রীলঙ্কার মানুষের দেখা নেই বহুদিন। রবিবার দেশটিতে কারফিউ জারি করা হয়। গতকাল সকালে তা তুলে নেওয়া হলে রোজগারের সন্ধানে পথে নামেন টুকটুক চালক (ভাড়া খাটানো গাড়ি) ইমতিয়াজ আলী। পথে লোক কম। যাত্রী নেই। পেট চালানোর দায়ে রাস্তায় বের হলেও তাঁর ঘরে চলছে মৃত্যুর মাতম। সিনামন গ্র্যান্ড হোটেলের বিস্ফোরণে তাঁর ভাগ্নে নিহত হয়েছেন। বলছিলেন, ‘ছেলেটার বয়স মাত্র ২৩। সিনামন গ্র্যান্ড হোটেলে বিক্রেতা হিসেবে কাজ করত। সামনের সপ্তাহেই ওর বিয়ে। বিয়েবাড়ি সাজানোর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। এখন ওটা মরার বাড়ি।’

পথে পেট্রল নেওয়ার জন্য একটি পাম্পে থামলেন আলী। বাড়তি মজুদ হিসেবে গ্যালন ভরে রাখার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু তাঁকে জানানো হলো, পুলিশ ক্যান বা জারে পেট্রল বিক্রি করতে নিষেধ করেছে। কারণ এগুলো ব্যবহার করে সহজেই বোমা বানানো সম্ভব।

উত্তর কলম্বোতে গতকাল বহু মানুষ জড়ো হয় সেন্ট সেবাস্টিয়ান গির্জায় নিহতদের স্মরণে প্রার্থনা করতে। এই গির্জায়ও ইস্টারের প্রার্থনায় নিহত হয়েছে বহু মানুষ। এক মা তাঁর ছেলেকে নিয়ে এসেছেন চায়ের ফ্লাস্ক হাতে। নিরাপত্তাকর্মীদের চা খাইয়ে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা। আসলে সহমর্মিতার প্রকাশ। মুখ ঢেকে তখনো গির্জার মেঝের কাচ আর কাঠের টুকরো ঝাড়ু দিয়ে সাপটে নিচ্ছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।

চারচিল করুণারত্নে নামে ৫২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি এসেছেন ফুল নিয়ে। বলছিলেন, ‘সকালে ঘুম ভেঙেই মনে হলো, এই পরিস্থিতিতে আমি কী করে সাহায্য করতে পারি?’ আগের দিনই বিস্ফোরণের পর গির্জায় ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। যতটা পেরেছেন নিরাপত্তা বাহিনী বা চিকিৎসাকর্মীদের সহায়তা করেছেন। তিন সন্তানের বাবা করুণারত্নে বলেন, “বিস্ফোরণের পরও আমি এসেছিলাম। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শুধু লাশ আর লাশ। আমার বাচ্চারা টেলিভিশনে এসব দেখেছে। খুব ভয় পেয়েছে ওরা। গির্জায় আর যেতে চায় না। অনেক প্রশ্ন ওদের। কাল জানতে চাইছিল, ‘ঈশ্বর কোথায় থাকেন?’” সূত্র : এএফপি।

মন্তব্য