kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

শেয়ার দামে অতিমূল্যায়ন

নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই আটকা বেড়াজালে

রফিকুল ইসলাম   

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই আটকা বেড়াজালে

এস্কোয়ার নিট কম্পোজিট লিমিটেড। পুঁজিবাজারে মূলধন উত্তোলনের পর শেয়ার লেনদেন শুরু হয় ৯ এপ্রিল। যোগ্য বিনিয়োগকারীর (এলিজিবল ইনভেস্টর) দাম প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে কাট অব প্রাইস নির্ধারিত হয় ৪৫ টাকা। যাত্রা শুরুর দিন থেকেই ইস্যু মূল্যের নিচে এর শেয়ারের দাম, এখন ৪১.৭০ টাকা। বিডিংয়ের তথ্যানুযায়ী, ৪৫ টাকায় কম্পানিটির শেয়ার কিনতে ৮৮৫ শতাংশ চাহিদা আসে অর্থাৎ ৪৭৯ জন যোগ্য বিনিয়োগকারী শেয়ার কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে।

আমান কটন ফাইবারস লিমিটেডের কাট অব প্রাইস ৪০ টাকা। তবে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কম্পানিটির শেয়ার দাম ছিল ৩৩.২০ টাকা। ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট লেনদেন চালু হওয়ার পর এর শেয়ার দাম দ্বিগুণ হয়; কিন্তু এখন ইস্যু মূল্যের নিচে নেমেছে।

বিনিয়োগকারী ও পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ার ছেড়ে মূলধন উত্তোলনে গত কয়েক বছর দুর্বল কম্পানিতেও যোগ্য বিনিয়োগকারীর যোগসাজশে উচ্চ দাম নির্ধারিত হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তালিকাভুক্ত কম্পানির শেয়ার দাম ইস্যু মূল্যের নিচেও নেমেছে।

ইলেকট্রনিক সাবস্ক্রিপশনের তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ১২টি কম্পানি পুঁজিবাজার থেকে মূলধন উত্তোলন করেছে। এর মধ্যে ১০টি কম্পানির শেয়ার দাম ইস্যু মূল্যের নিচে নেমেছে।

সূত্র বলছে, মূলধন উত্তোলনে কম্পানির শেয়ার দাম নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও আইন প্রণেতা বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আটকা পড়েছে আইনের বেড়াজালে। কিছু যোগ্য বিনিয়োগকারী তথা এলিজিবল ইনভেস্টরের (ইআই) যোগসাজশে শেয়ার দামে উচ্চমূল্য হাঁকা হলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় উচ্চমূল্যের মাসুল দিতে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী।

পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, যোগ্য বিনিয়োগকারীর যোগসাজশে দুর্বল কম্পানির শেয়ারের উচ্চমূল্য হাঁকা হলেও কমিশন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বুক বিল্ডিং সিস্টেমে উচ্চ প্রিমিয়ারে মন্দ কম্পানি আসায় পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতাও নষ্ট হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে তালিকাভুক্ত এক ডজনের বেশি কম্পানি এখন ইস্যু মূল্যের নিচে নেমে গেছে। তালিকাভুক্তির আগে এক রকম আর তালিকাভুক্তির পর কম্পানির অন্য রকম চিত্রে আস্থা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারী।

কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ইস্যু ম্যানেজার বা মার্চেন্ট ব্যাংকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আইপিও বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে মূলধন উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়। যোগ্য বিনিয়োগকারীর দাম প্রস্তাবের ভিত্তিতে কাট অব প্রাইস নির্ধারিত হয় আর সেখান থেকে ১০ শতাংশ কমে সাধারণ বিনিয়োগকারী শেয়ার বরাদ্দ পায়। কম্পানির প্রসপেক্টাসে দেওয়া তথ্য ও যোগ্য বিনিয়োগকারীর দাম প্রস্তাবের বিষয়ে কমিশনের কিছুই করার থাকে না। তবে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির অপব্যবহার রোধে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন।

পাবলিক ইস্যু রুলস অনুযায়ী, কোনো কম্পানি ইস্যু ম্যানেজারের মাধ্যমে ফিক্সড প্রাইস ও বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে পুঁজিবাজারে শেয়ার ছেড়ে মূলধন উত্তোলনের আগ্রহ প্রকাশ করে। কম্পানি প্রতিটি শেয়ারের দাম অভিহিত মূল্য ১০ টাকার বেশি প্রত্যাশা করলে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আসতে হয়। ফিক্সড প্রাইসে মূলধন উত্তোলন করতে চাইলে কমিশন কম্পানির প্রয়োজনীয় তথ্য পর্যালোচনা করে আইপিও অনুমোদন দেয়।

পাবলিক ইস্যু রুলসের ৪-এর ২ ধারার ‘বি’-তে বলা হয়েছে, কম্পানির প্রসপেক্টাস ও সংশ্লিষ্ট প্রদত্ত তথ্যাদিতে সন্তুষ্ট হয়ে ইলেকট্রনিক সাবক্রিপশনে যোগ্য বিনিয়োগকারীর (ইআই) মাধ্যমে বিডিংয়ে কাট অব প্রাইস নির্ধারণের বিষয়ে বলা হয়েছে। ৭২ ঘণ্টার একটানা দাম প্রস্তাবে সর্বাধিক ও সর্বোচ্চ দাম প্রস্তাব থেকে নিচের দিকে ক্রমগণনা করতে করতে কম্পানির শেয়ারের সাবক্রিপশন পূর্ণ হলে কাট অব প্রাইস সম্পন্ন হয়।

এদিকে ২০১৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি যোগ্য বিনিয়োগকারীর আচরণবিধি প্রণয়ন করে বিএসইসি। এতে কোনো কম্পানির শেয়ার দাম প্রস্তাবে দুই সদস্যের কমিটি গঠন এবং দাম প্রস্তাবে যৌক্তিকতা বিষয়ক আটটি আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়। দাম প্রস্তাবের বিষয়ে যোগ্য বিনিয়োগকারীর গঠিত কমিটির পর্যালোচনা এবং কোন পদ্ধতিতে ভ্যালুয়েশন সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রও কমিশনে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।

এ বিষয়ে কমিশন সূত্র জানায়, আচরণবিধিও বেশির ভাগই মানছে না তারা। বিডিং সম্পন্ন হওয়ার দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার বিধান করা হলেও কার্যত দিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা কোনো ভ্যালুয়েশন ছাড়াই নিজেদের ইচ্ছামতো দাম প্রস্তাব করে।

পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, মূলধন উত্তোলনে ইচ্ছুক কম্পানি যোগ্য বিনিয়োগকারীর সঙ্গে যোগসাজশ করে বাড়তি প্রিমিয়ার আদায় করছে; যার প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগকারীর ওপর। যোগ্যতার চেয়ে উচ্চমূল্য নির্ধারিত হওয়ায় পুঁজিবাজারে আসার পর ওই সব কম্পানির শেয়ার দাম ইস্যু মূল্যের নিচে নেমে আসছে।

সূত্র বলছে, কম্পানির মূলধন উত্তোলনে পাবলিক ইস্যু রুলস আইনে যোগ্য বিনিয়োগকারীর মাধ্যমে কাট অব প্রাইস নির্ধারণের বিধান রয়েছে। বিডিংয়ে কম্পানির শেয়ারে বাড়তি মূল্য প্রস্তাবে কাট অব প্রাইস বেশি হলেও কমিশন কিছুই করছে না।

কমিশন সূত্র বলছে, যোগ্য বিনিয়োগকারী অসৎ হওয়ায় কম্পানির সঙ্গে যোগসাজশ করে উচ্চমূল্যে শেয়ার দাম প্রস্তাব করছে। এতে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কম্পানির প্রিমিয়ারে কাট অব প্রাইস নির্ধারণে কমিশন অসহায়। তবে কম্পানির শেয়ারের অতিমূল্যায়ন যেন না হয় সে জন্য বুক বিল্ডিং পদ্ধতি সংস্কারে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই কম্পানির আইপিও অনুমোদন হবে।

পাবলিক ইস্যু রুলস ২০১৫ অনুযায়ী, একজন যোগ্য বিনিয়োগকারী কোনো কম্পানির বিডিংয়ে কাট অব প্রাইস নির্ধারণে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শেয়ার ধারণে প্রস্তাব করতে পারত। যোগসাজশ করে দাম প্রভাবিত হওয়ায় সেটি কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়। অর্থাৎ একজন যোগ্য বিনিয়োগকারী কম্পানির ২ শতাংশ শেয়ার ধারণের দাম প্রস্তাব করতে পারবে। এতে কারসাজির মাধ্যমে কাট অব প্রাইস নির্ধারণ বন্ধ হবে—এমন ধারণা ছিল কমিশনের। কিন্তু সেটিও কাজে দেয়নি। কারসাজির মাধ্যমে শেয়ার দাম প্রভাবিত হওয়ায় বুক বিল্ডিং পদ্ধতি সংস্কারে চলতি বছরের ১৯ মার্চ কমিটি গঠন করেছে কমিশন।

কমিটির এক সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই পদ্ধতির অপব্যবহার করে উচ্চমূল্যে দাম প্রস্তাবের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিভাবে কম্পানি তার যোগ্য মূল্যায়ন পায় আর বিনিয়োগকারীও উপকৃত হয় সেসব বিষয় পর্যালোচনা করেই যুগোপযোগী সুপারিশ দেওয়া হবে। এ নিয়ে কাজ চলছে। শিগগিরই এ বিষয়ে জানানো হবে।’

এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা কেউ সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

 

মন্তব্য