kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

জমি না কিনেই প্লট বিক্রি ট্রাস্ট সিটির, ক্ষুব্ধ কৃষক ও জমির মালিকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জমি না কিনেই প্লট বিক্রি ট্রাস্ট সিটির, ক্ষুব্ধ কৃষক ও জমির মালিকরা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে পূর্বাচল ৪ নম্বর সেক্টর ঘেঁষে ভুঁইফোড় আবাসন কম্পানি পূর্বাচল ট্রাস্ট সিটির আগ্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়েই চলেছে। কোনো অনুমতি ছাড়াই গড়ে তোলা নামসর্বস্ব এই আবাসন প্রকল্পের ফাঁদে পড়ে হাজারো গ্রাহক এখন প্রতারিত হওয়ার শঙ্কায়। জমি না কিনেই গ্রাহকদের প্লট বরাদ্দ দেওয়ার খবরে ক্ষুব্ধ স্থানীয় কৃষক ও জমির মালিকরা। বিষয়টি নিয়ে তারা প্রশাসনের কাছে অভিযোগও দিয়েছে। এর ভিত্তিতে ওই আবাসন প্রকল্পের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহরের ২১ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের কুলিয়াদী ও রঘুরামপুর মৌজায় ‘পূর্বাচল ট্রাস্ট সিটি’ নামের প্রকল্পটি অনুমোদন না নিয়েই গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পূর্বাচল ট্রাস্ট সিটি প্রকল্পের নামে চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে এখানে প্লট কিনে প্রতারিত হওয়ার শঙ্কায় পড়েছে অসংখ্য গ্রাহক।

জানা গেছে, তিন হাজার কাঠা বিক্রীত প্লটের বিপরীতে ৩০০ বিঘার বেশি জমির প্রয়োজন হলেও বাস্তবে পূর্বাচল ট্রাস্ট সিটির জমি রয়েছে মাত্র ৯ বিঘা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে বছর চুক্তিতে জমি ভাড়া নিয়ে মাস্তানদের সহযোগিতায় তা দখলে রেখে প্রকল্পের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে নামসর্বস্ব ‘ট্রাস্ট সিটি’ গড়ে তুলেছেন। এই প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা ও প্লট বিক্রির ওপর রাউজকের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবু থামছে না এই আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রতারণামূলক আগ্রাসী কার্যক্রম।

জানা যায়, রাউজকের পূর্বাচল নতুন শহরের ২১ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের কুলিয়াদী ও রঘুরামপুর মৌজায় প্রকল্প দেখানো হয়েছে ‘পূর্বাচল ট্রাস্ট সিটি’র। পূর্বাচল উপশহরের তুলনায় কম দামে প্লট দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে ট্রাস্ট সিটি শুরু করে বাহারি প্রচারণা। স্বপ্নের শহরে নিজের বাড়ি নির্মাণের আশায় লোকজন এখানে প্লট কেনে। গত চার বছরে ট্রাস্ট সিটির বিক্রীত প্লটের পরিমাণ হাজারের বেশি। কাঠাপ্রতি ১০ লাখ টাকা করে বিক্রি করা হয়েছে এসব প্লট। সে হিসাবে গ্রাহকদের কয়েক শ কোটি টাকা এরই মধ্যে আটকা পড়েছে প্রকল্পটির কাছে।

এদিকে এই ভুয়া প্রকল্পের উদ্যোক্তারা গত আট বছরে এলাকায় জমি কিনেছে মাত্র ৯ বিঘা। যদিও তাদের দাবি, কেনা জমির পরিমাণ ৫০ বিঘা। পূর্বাচল ট্রাস্ট সিটির বিরুদ্ধে স্থানীয় কৃষকদের জমি জোরপূর্বক দখল করার অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে সাইনবোর্ড টাঙানোর শর্তে বছর চুক্তিতে জমি ভাড়া নিয়ে প্লট বিক্রি করেছে ট্রাস্ট সিটি। এ ছাড়া সন্ত্রাসীদের সহায়তায় অনেক জমি দখলে রেখে প্লট বিক্রি করছে তারা। স্থানীয় শিমুলিয়া এলাকার মুরাদ হাসান সিপনের ১৩ শতাংশ, রিপন মিয়ার ৩৯, লুত্ফর রহমানের ১৩, সাজিদুর রহমানের ১৩, মাজাহারুল ইসলাম রতনের ২৩, হ্যাপি আক্তারের ১৫, লিলি আক্তারের ১৫, মমতাজ বেগমের ১৫, শফিকুর রহমানের ১৭, বোরহানের ২১ ও কাউসারের ১৪ শতাংশ কৃষিজমিতে বালু ভরাট করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া কম্পানিটি স্থানীয় সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে কুলিয়াদী মৌজায় নাসির মিয়ার ২৭, হাশেম মিয়ার ২৩, আমজাদ হোসেনের ১০০, আনোয়ার হোসেনের ১০০, নান্নু মিয়ার ১০০, ওহাব ভূইয়ার ১০০, মোজাম্মেল ভূইয়ার ২৬, আজিজুল হকের ১৩, মোস্তফা মিয়ার ২৯, ছালাম মিয়ার ৪৪ ও হাসমত আলীর ৪৫ শতাংশ; শিমুলিয়ার হামিদ মিয়ার ১১; রঘুরামপুর মৌজায় ঈমান খানের ২২, ফজলুল হক খানের ১২, মোফাজ্জল হোসেনের ২৬, হারুনুর রশিদের ২৬ শতাংশসহ ১৩৬ জনের মোট ১০০ বিঘা জমি না কিনেই জোরপূর্বক ও ভাড়ায় কম্পানির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে।

জানা গেছে, ট্রাস্ট সিটির প্রকল্পে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য মাসিক চুক্তিতে মাস্তানদের লালন-পালন করে কর্তৃপক্ষ। হিরনাল এলাকার সন্ত্রাসী হুমায়ুন কবীর মিঠু ও তার সহযোগী কামরুল হাসান নয়ন, মোতাহার ফকির, হালিম মোল্লা, জামান, রেজু, শিবজন, ছলুসহ আরো ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল এলাকায় ট্রাস্ট সিটির অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করে। কেউ প্রকল্প দেখতে এলে সারাক্ষণ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে এই বাহিনীর সদস্যরা। এলাকার কৃষকদের জমিতে জবরদস্তি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয় এই মাস্তান বাহিনী। ট্রাস্ট সিটির নির্দেশে এই বাহিনীর অত্যাচারের শিকার হয়েছে এলাকার বহু কৃষক।

ট্রাস্ট সিটির প্রতারণা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় শতাধিক গ্রাহক টাকা ফেরত চেয়ে মামলা করেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। ২০১৭ সালের ১৫ মে স্থানীয় ১৩৬ জন জমির মালিক প্রতারক এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজউকে অভিযোগ দেয়। রাজউক ট্রাস্ট পূর্বাচল নামের এই আবাসন কম্পানি ন্যূনতম জমি না কিনে এবং অনুমোদন না নিয়ে প্রকল্পের বিজ্ঞাপন প্রচার, জমি দখল, বালু ভরাটসহ প্লট বিক্রয় কার্যক্রমের ওপর ২০১৭ সালের ১২ জুলাই নিষেধাজ্ঞা জারি করে। রাজউকের সচিব সুশান্ত চাকমা স্বাক্ষরিত সেই নিষেধাজ্ঞার অনুলিপি দুর্নীতি দমন কমিশনেও পাঠানো হয়। এর পরও কম্পানিটি রাউজকের নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এলাকার মাস্তানদের সহায়তায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে।

এ ব্যাপারে ট্রাস্ট সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘একটি বড় প্রকল্প তৈরি করতে গেলে কিছু ভুলত্রুটি থাকবেই। সঠিক হিসাব দেখাতে না পারলেও আমরা এলাকায় বহু জমি কিনেছি। এখন পর্যন্ত সাত শর বেশি প্লট বিক্রি হয়েছে আমাদের। সম্পূর্ণভাবে কিস্তি পরিশোধ ও এককালীন টাকা প্রদান করায় ২৫ জনকে এরই মধ্যে প্লট রেজিস্ট্রি করে দিয়েছি।’

 

মন্তব্য