kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

রুহুল আমিন আটক দায় স্বীকার পপির

► আর্থিক লেনদেন অনুসন্ধানে সিআইডি ►রিমান্ডে থাকা মণিকে নিয়ে ঘটনাস্থলে পিবিআই ► মাদরাসার পরিচালনা কমিটি বাতিল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধি   

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রুহুল আমিন আটক দায় স্বীকার পপির

মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গতকাল শুক্রবার বিকেলে পৌর সদরের তাকিয়া রোডের বাসা থেকে তাঁকে আটক করা হয়।

এ হত্যাকাণ্ডে আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি।

গতকাল নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনার পরিকল্পনাকারীদের অন্যতম উম্মে সুলতানা পপি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এ ছাড়া সরাসরি জড়িত হিসেবে অভিযুক্ত কামরুন নাহার মণিকে নিয়ে একই দিন দুপুরে ঘটনাস্থলে গেছে পিবিআই।

এদিকে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার পরিচালনা কমিটি বাতিল করা হয়েছে। এ কমিটির সহসভাপতি ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন।

আ. লীগ নেতা রুহুল আমিন আটক : গতকাল বিকেল ৫টার দিকে আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনকে আটক করার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন ফেনী পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার

মো. মনিরুজ্জামান। তিনি সাংবাদিকদের জানান, নুসরাত হত্যা মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসামি শাহাদাত হোসেন শামীমের ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে রুহুল আমিনের নাম এসেছে। শামীমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে তাঁর ছয় সেকেন্ডের কথোপকথনের সত্যতা পেয়েছে পিবিআই। তবে নুসরাত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে রুহুল আমিনকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান এই পিবিআই কর্মকর্তা।

উল্লেখ্য, শামীম জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে, নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার পর বিষয়টি সে রুহুল আমিনকে মোবাইল ফোনে জানিয়েছিল। তখন রুহুল আমিন তাকে এলাকা থেকে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

রুহুল আমিনের ভাগিনা মো. রানা ও প্রতিবেশী ব্যবসায়ী মো. সোহাগ কালের কণ্ঠকে জানান, বিকেল ৫টার দিকে পিবিআইয়ের একটি দল মাইক্রোবাসে করে রুহুল আমিনকে নিয়ে গেছে।

নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় মাদরাসা পরিচালনা কমিটির অনেকেই জড়িত এবং স্থানীয় রাজনীতিরও প্রভাব রয়েছে বলে এ ঘটনায় পুলিশের গাফিলতি তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান ডিআইজি এস এম রুহুল আমিন অভিমত দেওয়ার পরদিন স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতিকে আটক করা হলো।

একই অভিযোগে এর আগে সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গতকাল রুহুল আমিনকে আটকের আগে কয়েক দিন ধরে তাঁকে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল বলে জানা গেছে। গত দুই দিন তিনি বাড়ি থেকে তেমন একটা বের হননি। সোনাগাজী জিরো পয়েন্টে দলীয় কার্যালয়েও তাঁকে দেখা যায়নি। বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্তদল মাদরাসার একটি কক্ষে তাঁকে প্রায় তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায়ও যোগ দেননি রুহুল আমিন।

আর্থিক লেনদেন অনুসন্ধানে সিআইডি : নুসরাত হত্যাকাণ্ডে আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, সেটা খতিয়ে দেখার জন্য আগামী সপ্তাহে ফেনীর সোনাগাজী যাচ্ছে সিআইডির তদন্তকারী দল। পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, মাদরাসার অধ্যক্ষ (বরখাস্ত), শিক্ষক, সোনাগাজী থানার পুলিশ কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যরা অর্থিকভাবে কতটুকু লাভবান হয়েছে তদন্তে সে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানায় সিআইডি সূত্র।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানির পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় অর্থ লেনদেনের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পেরেছি। সেই অর্থ দিয়ে কেউ কেরোসিন ও বোরকা কিনেছে, কেউ পালানো বা আত্মগোপনের চেষ্টা করেছে। আবার কেউ ঘটনা ধামাচাপা দিতেও অর্থ সরবরাহ করেছে বলে তথ্য রয়েছে।’ তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে কারা ও কী পরিমাণ অর্থ সরবরাহ করেছে এবং কারা সেই অর্থ গ্রহণ করেছে, এর সবই খুঁজে বের করা হবে। তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে মুদ্রাপাচার আইনে মামলা করা হবে।

দায় স্বীকার করে পপির জবানবন্দি : গতকাল রাতে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে উম্মে সুলতানা পপি। সে শম্পা ছদ্মনামে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। অধ্যক্ষ সিরাজের ভায়রার মেয়ে সে।

পপি ওই দিন বোরখা, কালো নেকাব ও কালো চশমা পরিহিত ছিল। সে পরীক্ষার হলে গিয়ে নুসরাতকে বলেছিল, ‘আমি শম্পা—ছাদে তোমার বান্ধবী নিশাতকে কারা যেন মারধর করছে। তুমি দ্রুত চলো।’ এ কথা শুনে নুসরাত দ্রুত দৌড়ে শেল্টার হাউসের ছাদে যায়। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিল শাহাদাত হোসেন শামীম, জোবায়ের হোসেন শাখাওয়াত, জাবেদ হোসেন ও মণি। এখানে মণি ও পপি নুসরাতের হাত-পা তার ওড়না দিয়ে বেঁধে ফেলে। এতে বাকিরা সহযোগিতা করে। পরে তার গায়ে কেরাসিন দেয় শামীম আর আগুন দেয় জাবেদ। ঘটনার পর হট্টগোলের মধ্যে পপি ও মণি আবার নিচে নেমে পরীক্ষায় অংশ নেয়।

সন্ধ্যা ৬টার দিকে পপিকে আদালতে নেওয়া হয়। তার জবানবন্দি গ্রহণ করেন বিচারক শরাফ উদ্দিন আহমেদ। রাত ৯টায় জবানবন্দি গ্রহণ শেষ হয়। এর আগে পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে পপি জানায়, অধ্যক্ষ সিরাজের নির্দেশে সে নুসরাত হত্যা পরিকল্পনায় অংশ নেয়।

মামলার আরেক আসামি ও কিলিং মিশনে সরাসরি জড়িত জাবেদ হোসেনকেও সাত দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল বিকেলে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আদালতে আনা হয়। কিন্তু আদালতে আসার পর সে বয়ান দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম আরো ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে বিচারক শরাফ উদ্দিন তিন দিন মঞ্জুর করেন।

রিমান্ডে থাকা মণিকে নিয়ে ঘটনাস্থলে পিবিআই : নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনায় সরাসরি জড়িত তার সহপাঠী কামরুন নাহার মণিকে নিয়ে গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল ও বোরকার দোকান পরিদর্শন করেছে পিবিআই।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. শাহ আলম সাংবাদিকদের জানান, মণিকে বুধবার থেকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবালের নেতৃত্বে একটি দল মণিকে নিয়ে সোনাগাজী পৌর শহরের মানিক মিয়া প্লাজায় একটি বোরকার দোকানে গিয়ে দোকান মালিকের সঙ্গে কথা বলে। পরে পিবিআই দলটি সোনাগাজী মাদরাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে যেখানে নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া হয়, সেখানে যায়। কিভাবে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে নুসরাতকে হত্যা করা হয়েছে, তার বিবরণ দিয়েছে মণি।

তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া মণির কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া পুরুষদের গায়ে থাকা বোরকাগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

প্রসঙ্গত, সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে গত ৬ এপ্রিল পরীক্ষার হল থেকে মাদরাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয়। রাজি না হওয়ায় বোরকা ও নেকাব পরা চারজন তাকে বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। গত ১০ এপ্রিল নুসরাত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। হামলায় সরাসরি জড়িত চারজনসহ এ পর্যন্ত মোট ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে জবানবন্দি দিয়েছে পাঁচজন। আসামিদের মধ্যে কয়েকজনের রিমান্ড চলছে।

মাদরাসা পরিচালনা কমিটি বাতিল : নুসরাত হত্যার ঘটনায় সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ১৩ সদস্যের পরিচালনা কমিটি বাতিল (বিলুপ্ত) ঘোষণা করেছে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়।

মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. হোসাইন আহমদ কালের কণ্ঠকে জানান, গতকাল বিকেলে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মুহাম্মদ আহসান উল্লাহ মাদরাসা পরিচালনা কমিটি বাতিলের (বিলুপ্তির) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি আরো জানান, আগামী দু-একদিনের মধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটি করা হবে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ কমিটি মাদরাসার কার্যক্রম চালাবে।

মন্তব্য