kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

অশ্রু ক্ষোভ প্রত্যয়ে পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন

অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ

অশ্রুসজল এই মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট। ছবি : কালের কণ্ঠ

মানুষের মাঝে শুভবোধ জাগরণের প্রত্যয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বরণ করা হয়েছে বঙ্গাব্দ ১৪২৬। গত রবিবার দিনব্যাপী পহেলা বৈশাখের নানা বর্ণিল আয়োজনে বাঙালি জাতি যেমন বিপুল উৎসাহে অংশ নিয়েছে, পাশাপাশি তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে খুন, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, আগুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার প্রত্যয়।

জাতির বৃহত্তম অসাম্প্রদায়িক এ উৎসবে সাংস্কৃতিক নানা আয়োজনে, ঐতিহ্যবাহী নানা ব্রত-আচার পালনের মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে সম্প্রীতি ও মানবতার জয়গান। রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা, শহর-নগর-বন্দর থেকে গ্রাম-মফস্বল নানা স্থানেও আনন্দ-উৎসবে দিনটি পালিত হয়েছে।

রবিবার রাজধানীতে পহেলা বৈশাখ হয়ে উঠেছিল বর্ণিল, উচ্ছ্বাসময়। নতুন বছরের প্রথম সূর্য ওঠার আগেই রমনার ঐতিহাসিক বটমূলকে ঘিরে ছায়ানটের প্রভাতি আয়োজনে ছুটে আসে রাজধানীবাসী। বরাবরের মতো সেখানে প্রভাতি অনুষ্ঠান করে ছায়ানট। এবার এতে ‘অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে শুভবোধ জাগ্রত’ হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে শিল্পীরা মনমাতানো সুরমূর্ছনায় বরণ করেন পহেলা বৈশাখকে।

ভোর সোয়া ৬টা অসিত কুমার দের পরিবেশনায় টানা ১৫ মিনিটের রাগা ললিত দিয়ে পহেলা বৈশাখের প্রথম সূর্যোদয়কে স্বাগত জানানো হয়। এরপর ছায়ানটের শিল্পীরা একে একে পরিবেশন করেন ১৩টি একক, ১৩টি সম্মেলক গান এবং দুটি আবৃত্তি। এতে ছিল জাগরণী গান ও কবিতা।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে বক্তব্য দেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও ছায়ানট সভাপতি সন্জীদা খাতুন। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বৎসরকাল পেরিয়ে আমরা আবার নতুন দিনের মুখোমুখি। কেমন সময় পেরিয়ে এলাম? চোখ মেললে কিংবা কান পাতলে নিত্যই শিশু-নারী, বল-ভরসাহীন মানুষ তথা সমগ্র মানবতার ওপর নির্মম আচরণের সংবাদ পাই। কোথায় যাচ্ছি আমরা? নিষ্কলুষ শিশুসন্তান কোনো সমাজবাসীর অত্যাচারের শিকার হয় কী করে? সমাজ কি পিতা-মাতা, ভাই-বোন, সন্তানসন্ততির গৃহ আর প্রতিবেশী নিয়ে গঠিত শান্তির নিবাস নয়? স্বার্থান্বেষী অমানুষদের আত্মসুখ সন্ধানের ফলে নির্যাতনের হাত থেকে পরিত্রাণ পায় না কচিকাঁচা, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী থেকে শুরু করে সমাজের নানা বয়সের মানুষ।’

বক্তব্যের শেষাংশে সন্জীদা খাতুন সবাইকে আহ্বান জানিয়ে বললেন, “আমাদের অন্তরে ইচ্ছা জাগুক, ‘ওরা অপরাধ করে’ কেবল এই কথা না বলে, প্রত্যেকে নিজেকে বিশুদ্ধ করার চেষ্টা করি। আর, আমরা যেন নীতিবিহীন অন্যায়-অত্যাচারের নীরব দর্শকমাত্র হয়ে না থাকি। প্রতিবাদে, প্রতিকার সন্ধানে হতে পারি অবিচল। নববর্ষ এমন বার্তাই সঞ্চার করুক আমাদের অন্তরে।” পরে সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয়সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানা হয়।

রমনার বটমূলের অনুষ্ঠান শেষে অসংখ্য মানুষ যোগ দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রায়।  ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’ প্রতিপাদ্যে চারুকলা থেকে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। সকাল ৯টার দিকে শোভাযাত্রা বেরোনোর আগে আগে শাহবাগ মোড় পেরিয়ে চারুকলার পথটি লোকারণ্য হয়ে পড়ে। তবে এর অনেক আগে থেকেই রং-বেরঙের শোলার পাখি, পেঁচা, টেপাপুতুল, ঢাকঢোল-বাঁশি নিয়ে চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনের সড়কে অপেক্ষায় ছিল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা।

শোভাযাত্রায় আসা তরুণ-তরুণীদের পরনে ছিল বৈশাখী সাজ। মেয়েদের অধিকাংশের পরনে ছিল লাল-সাদা রঙের শাড়ি অথবা সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া; আর খোঁপায় ফুল। ছেলেদের পরনে ছিল লাল-সাদা পাঞ্জাবি, ফতুয়া ও টি-শার্ট। শিশুরাও কম যায়নি। কপালে টিপ, পায়ে আলতা, শাড়ি, ফ্রক, সালোয়ার-কামিজ পরে সবাই মেতে উঠেছিল বৈশাখী আনন্দে।

মঙ্গল শোভাযাত্রায় নিরাপত্তার কড়াকড়ি থাকলেও তারুণ্যের উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। ঢাকঢোলের বাদ্যি আর তালে তালে তরুণ-তরুণীদের ছন্দোবদ্ধ নৃত্যে আনন্দ-উৎসবমুখর হয়ে ওঠে শোভাযাত্রা। এবার শোভাযাত্রা চারুকলা থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ মোড় এরপর ঢাকা ক্লাব ও শিশু পার্কের সামনে দিয়ে ঘুরে টিএসসিতে যায় এবং শেষে পুনরায় চারুকলায় এসে শেষ হয়।

বৈশাখের সকালে উৎসবে অংশ নেন বাংলাদেশ সফররত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের সাবেক ছাত্র ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং। সকাল প্রায় সোয়া ৬টায় সস্ত্রীক লোটে শেরিং এবং তাঁর সফরসঙ্গী ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তানভি দর্জিসহ অন্যদের সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হন চ্যানেল আই সুরের ধারা আয়োজিত ‘৮ম বাংলা নববর্ষ উৎসব হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ ১৪২৬’-এর অনুষ্ঠানে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে এ আয়োজনে আরো উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন প্রমুখ। এ সময় লোটে শেরিংকে উৎসবের উত্তরীয় পরিয়ে দেন চ্যানেল আই পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজ। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বর্ষবরণ উৎসব উপভোগ করেন ভুটানি প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সম্মানে সংতীত পরিবেশন করেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এবং সারা দেশ থেকে আগত হাজারও শিল্পী।

চমৎকার আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করে লোটে শেরিং বাংলায় দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে আমার মন থেকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’ এ সময় তিনি দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা পান্তা ভাত খাইয়েছেন? আমি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর ঢাকায় এফসিপিএস করেছি। আসলে আমার মন উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত অনুভব করছে কখন ময়মনসিংহ যাব।’ বাংলায় তাঁর মুগ্ধকর কথা শুনে উপস্থিত সবাই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।

এ ছাড়া রাজধানীর শিশু পার্কের সামনের নারিকেলবীথি চত্বরে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী বর্ষবরণ উদ্‌যাপন করে। গোটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দেখা যায় নানা উৎসব আয়োজন। বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও উৎসবের আয়োজন করে। রাজধানীজুড়ে ছিল নানামাত্রিক আয়োজন। এর মধ্যে মিরপুরে মঙ্গল শোভাযাত্রা করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সম্ভাবনা। গীতাঞ্জলি ললিতকলা একাডেমি উত্তরায় অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা