kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

আইনজীবীদের মত

৫ অপরাধে বিচারযোগ্য ওসি মোয়াজ্জেম

আশরাফ-উল-আলম    

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৫ অপরাধে বিচারযোগ্য ওসি মোয়াজ্জেম

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার জন্য ফেনীর তখনকার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনও সমান দায়ী। গত ৬ এপ্রিল মাদরাসা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গেলে দুর্বৃত্তরা তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাফি মারা যায়।

দায়িত্বে অবহলোর কারণে এরই মধ্যে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে সোনাগাজী থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহলোর কারণে একজন ছাত্রীকে পুড়ে মরতে হয়েছে। শুধু প্রত্যাহার যথাযথ শাস্তি কি না, সেই প্রশ্ন এখন অনেকের মনে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ওসি যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় এমন একটি রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। তাই তিনি আইনের চোখে দোষী। কমপক্ষে পাঁচটি অপরাধে তিনি শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।

রাফিকে অগ্নিদগ্ধ করার পরও ওসি মোয়াজ্জেম প্রচার করেন, রাফি আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে। ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে তিনি খুনিদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। দণ্ডবিধির ২১৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী হওয়ায় তাহার আচরণ সম্পর্কে যেরূপ আইনের নির্দেশ আছে, তাহা জ্ঞাতসারে অমান্য করে এবং অমান্য করিবার উদ্দেশ্য হয় কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি হইতে রক্ষা করা বা সেই শাস্তি হইতে যাহাতে রক্ষা পাইতে পারে, জ্ঞাতসারে এইরূপ কার্য করা বা সে যে দণ্ডে দণ্ডনীয় তাহা অপেক্ষা লঘুদণ্ডে তাহাকে দণ্ডিত করা, কিংবা কোনো সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হইতে অথবা আইনানুসারে কোনো দায় হইতে রক্ষা করা বা উহা যাহাতে রক্ষা পাইতে পারে জ্ঞাতসারে এইরূপ কার্য করা।’ ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন একটি হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা হিসেবে প্রচার করে মূলত ওই ধারার অপরাধ করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। ওই ধারায় অপরাধ করলে দুই বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

দণ্ডবিধির ২২১ ধারায় বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হওয়া সত্ত্বেও সরকারি কর্মচারী হয়ে কোনো অপরাধীকে গ্রেপ্তার না করলেও তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে ধরে নিতে হবে। রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে সন্ত্রাসীরা নির্বিঘ্নে পালিয়েছে। ওসি মোয়াজ্জেম তাদের আটক না করে এইরূপ অপরাধ করেছেন। এই ধারার অপরাধের শাস্তি হিসেবে তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে। রাফির গায়ে আগুন দেওয়ার পর ওসি মোয়াজ্জেম আসামিদের গ্রেপ্তার না করে এই ধারায় অপরাধ করেছেন।

আবার প্রথম ঘটনার পর অভিযোগ পেয়েও যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। দায়িত্বে অবহেলার জন্য ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এটা স্পষ্ট যে যৌন হয়রানির মামলা গ্রহণের পর অনেক চাপের মুখে বা জনসাধারণের বিক্ষোভের মুখে ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ। এ ক্ষেত্রে আলিম পরীক্ষার্থী একজন ছাত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশের। কিন্তু ওসির নেতৃত্বে ওই থানার পুলিশ দায়িত্ব পালন না করে অবহেলা করেছে। ওই অবহেলা না করলে হয়তো রাফিকে এভাবে মরতে হতো না। দণ্ডবিধির ৩০৪-এর (ক) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বেপরোয়াভাবে বা অবহেলাজনকভাবে কাজ করে কারো মৃত্যু ঘটালে সে শাস্তির আওতায় আসবে।

প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, রাফি যখন শ্লীলতাহানির অভিযোগ করতে থানায় গিয়েছিল, তখন তাকে বিভিন্ন ধরনের অবাঞ্ছিত প্রশ্ন করে হয়রানি করেন ওসি মোয়াজ্জেম। রাফির সঙ্গে কথোপকথন ভিডিওতে ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়েও দেন। পৌনে ছয় মিনিটের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পুরো সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠেই কথা বলেছিল রাফি।

এ প্রসঙ্গে ফেনীর সোনাগাজী পৌরসভার মেয়র ও বিশিষ্ট আইনজীবী রফিকুল ইসলাম খোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মেয়েটির জবানবন্দি যখন নেওয়া হয়, তখন ওসির রুমে আমি মেয়র হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। ঘটনা শুনে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। আমি নিজে দেখেছি ওসি মোয়াজ্জেম মেয়েটির জবানবন্দি ভিডিও করছেন। তাঁকে মানা করেছিলাম, শোনেননি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়াতে মানা করেছিলাম; কিন্তু তিনি সেটাও শোনেননি।’

আইনজীবী খোকন আরো বলেন, ‘ওসি মোয়াজ্জেম অবশ্যই দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। আমার সন্দেহ হয় তাঁর উদ্দেশ্য নিয়ে। ওই ঘটনায় ওসি অধ্যক্ষের পক্ষ নিয়েছিলেন।’ তিনি বলেন, তদন্তে তাঁর ভূমিকা স্পষ্ট হবে। যদি দোষী প্রমাণিত হন, তবে তাঁকে বিচারের আওতায় আসতে হবে।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট আইনজীবী সাইদুর রহমান মানিক কালের কণ্ঠকে বলেন, আপাতদৃষ্টিতে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন দায়িত্বে অবহেলা, ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন বলে মনে হয়। তদন্তে যদি এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে এই মামলার সঙ্গে তাঁকে সম্পৃক্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, যেমনটি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। ওই মামলায় তাঁরা সাজাও পেয়েছেন।

অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা অশালীন আচরণের বিষয়ে অভিযোগ জানাতে থানায় গিয়ে রাফি নিজেই পুলিশ কর্মকর্তার কঠিন জেরার মুখে পড়েছিল। পুরুষ কণ্ঠে ক্রমাগত প্রশ্নের মাঝে মাঝে শোনা যায়, ‘পিওনের সঙ্গে তুমি একা গেছ?’, ‘পিওনের মাধ্যমে তোমায় ডাকছিল না তুমি নিজে গেছ?’, ‘বুকে হাত দিছে? ইত্যাদি’। একই প্রশ্ন বারবার করা হয়। শেষে অভিযোগটাই প্রায় উড়িয়ে দিয়ে বলা হলো, ‘এটা কিছু না, বাদ দাও। কেউ লিখবেও না তোমার কথা। আমি আইনগত ব্যবস্থা নেব তোমার লিখিত অনুযায়ী।’

রাফি থানায় অভিযোগ জানিয়েও প্রতিহিংসার আগুন থেকে রেহাই পায়নি।

ওই ভিডিওর কথা স্বীকার করে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছেন, ঘটনা জানার জন্য তিনি রাফির জবানবন্দি নিয়েছেন। ওই ভিডিও তিনি অনলাইনে দেননি। কিন্তু সেটি তো অন্য কেউ দিতে পারে না। ওসির ওই ভূমিকায় স্পষ্ট হয়েছে, তিনি মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার পক্ষ নিয়ে কাজ করেছেন শুরু থেকেই। অধ্যক্ষের সঙ্গে ওসির যোগসাজশ স্পষ্ট। ওই যোগসাজশের কারণে যদি হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে, তাহলে পরোক্ষভাবে ওসিও দায়ী হবেন। সে ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের প্ররোচনাকারী হবেন ওসি।

রাফিকে জেরা করতে গিয়ে ওসির অশালীন ভাষা ব্যবহার এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাড়ার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা যায়।

মন্তব্য