kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

রাফির ‘আগুন’ ছড়িয়ে গেল সবখানে

নীরব শুধু সোনাগাজী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাফির ‘আগুন’ ছড়িয়ে গেল সবখানে

কী রাজপথ, কী মেঠোপথ। নগর থেকে বন্দর। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে গণমাধ্যম। ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ‘আগুন’ ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। ক্ষোভে ফুঁসছে দেশ। রাফি হত্যার বিচার চাইছে ছাত্র-জনতা। গতকাল বৃহস্পতিবার এ ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। কোথাও হয়েছে বিক্ষোভ, কোথাও প্রতিবাদী মিছিল, কেউ কেউ হাতে হাত রেখে করেছে মানববন্ধন। সবারই মুখে ছিল এক সুর, এক দাবি—বিচার চাই, বিচার চাই। এ ঘটনায় সারা দেশ যখন প্রতিবাদমুখর তখন রাফির জন্মভূমি ও ঘটনাস্থল ফেনীর সোনাগাজীতে গতকাল কোনো কর্মসূচি চোখে পড়েনি।

সোনাগাজীতে প্রথম দিকে বিচারের দাবিতে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কয়েকজন দাবি করেন, পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নিষেধাজ্ঞা থাকায় দলীয় কর্মীসহ কেউ কর্মসূচি পালনে সাহস পায়নি।

গতকাল ফেনীর সোনাগাজীতে অনেক সহপাঠী রাফির জন্য কেঁদে বুক ভাসিয়েছে। তারা অধ্যক্ষ (বরখাস্ত) এস এম সিরাজ উদ দৌলা ও তাঁর সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে।

গতকাল ছিল রাফিদের ফিকহ দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। সকালে পরীক্ষার হলে এসেই রাফির জন্য কান্নায় ভেঙে পড়ে অনেক সহপাঠী। পরীক্ষার পর রাফির পরীক্ষার কক্ষসহ অন্য কক্ষগুলোতে কান্নার রোল পড়ে। সংবাদকর্মী ও তদন্ত কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তারা কান্নায় ভেঙে পড়ে। রাফির সহপাঠী তানজিলা আক্তার স্মৃতি বলেন, ‘রাফি অত্যন্ত হাসিখুশি ও মেধাবী ছাত্রী ছিল। বান্ধবীদের মাঝে সে ছিল সবার মধ্যমণি। সে সব সময় সবার মন জয় করে চলতে চেষ্টা করত। আমরা তার হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’ ওই মাদরাসারই পরীক্ষার্থী ওমর ফারুক বলেন, ‘আমরা পরে ঘটনাটি শুনেছি। খুব খারাপ লেগেছে। এর জন্য যারা দায়ী সবার বিচার চাই।’ রাফির বান্ধবী নাসরিন সুলতানার বাবা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমার মেয়েটা রাতে খবর পেয়ে রাফির একটা ওড়না নিয়ে সারা রাত কেঁদেছে। কী পরীক্ষা দিয়েছে জানি না।’

এদিকে গতকাল সারা দেশে রাফির খুনির বিচার দাবিতে ক্ষোভের বিস্ফোরণ হলেও সোনাগাজী ছিল শান্ত। দুপুরে উপজেলা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা শহরের জিরো পয়েন্টে মানববন্ধন করতে জড়ো হলেও পরে তারা তা করেনি। জানতে চাইলে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল মোতালেব চৌধুরী রবিন বলেন, আমরা আমাদের কর্মসূচি বাতিল করিনি। আগামীকাল (শুক্রবার) থেকে আমাদের তিন দিনের কর্মসূচি চলবে। ২৮ মার্চ বিচার দাবিতে মানববন্ধনের অন্যতম সংগঠক উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পৌরসভার কাউন্সিলর শেখ আব্দুল হালিম মামুন বলেন, ‘ভাই, প্রথমে কর্মসূচি করার কারণে তোপের মুখে পড়েছি। বিভিন্ন কারণে আর সাহস পাইনি!’

‘ধর্ষকের কোনো পরিচয় নেই, ধর্ষক সিরাজ উদ দৌলার ফাঁসি চাই’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘নুসরাত হেরে গেলে হেরে যাবে বাংলাদেশ’, ‘প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে ধর্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোল’, ‘নুসরাত হত্যার বিচার চাই’ এসব প্রতিবাদী লেখাসংবলিত প্ল্যাকার্ড চোখে পড়েছে রাজধানীর শাহবাগের বিক্ষোভে। দেশে প্রতিনিয়ত ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কোনো ঘটনারই বিচার হচ্ছে না। গতকাল বিকেলে নুসরাত জাহান রাফির হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশের বক্তারা। ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ’ ব্যানারে আয়োজিত সমাবেশে উদীচীর সহসভাপতি জীবনানন্দ জয়ন্ত, উন্নয়নকর্মী জাকিয়া শিশির, প্রকাশক রবিন আহসান, গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক সঙ্গীতা ইমাম, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক লাকী আকতার, জনরাষ্ট্র আন্দোলনের আহ্বায়ক ইফতেখার আহমেদ বাবু, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি জি এম জিলানী শুভ প্রমুখ বক্তব্য দেন।

এদিকে গতকাল সকালে রাফি হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেনীর শিক্ষার্থীদের সংগঠন ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব ফেনী (ডুসাফ)। এ ছাড়া সন্ধ্যায় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে মশাল মিছিল করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা।

এদিকে রাফি হত্যার দ্রুত বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এ কর্মসূচি পালন করে তারা। মানববন্ধনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ঢাকা মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেহানা ইউনুস বলেন, ‘রাফি হত্যাকারীদের দ্রুত শাস্তি দিতে হবে। তাদেরকে কোনোভাবেই আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।’

রাফি হত্যার প্রতিবাদে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটি গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। মধুর ক্যান্টিন থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি টিএসসি, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, বাণিজ্য অনুষদ ভবন ঘুরে কলাভবনের সামনে সমাবেশ করে। রাফি হত্যার প্রতিবাদে এবং হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে কালের কণ্ঠ পাঠক সংগঠন শুভসংঘ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা আয়োজিত মানববন্ধনে জবি শুভসংঘ শাখার প্রচার সম্পাদক মাসুদ রানার সঞ্চালনায় সভাপতি ইমা আক্তার, সহসাংগঠনিক সম্পাদক ইকবাল কবির সম্রাট প্রমুখ বক্তব্য দেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এই নির্মম হত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে মানববন্ধন করেছে। রাফি হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি জানিয়ে খুলনার শিববাড়ীর মোড়ে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদ। একই দাবিতে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনের সামনে মানববন্ধন করেছে বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষার্থীরা। রাফিকে পুড়িয়ে হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছে জামালপুরের ৯টি মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। একই দাবিতে কুড়িগ্রামের উলিপুরে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকরা।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কালের কণ্ঠ’র জেলা, উপজেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি)

মন্তব্য