kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

বিশেষ লেখা

নিশ্চয়তা চাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির

আয়শা খানম

১২ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নিশ্চয়তা চাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির

২০১৮ সালে সারা দেশে এক হাজারের বেশি ধর্ষণ-গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ঘটেছে নারীর প্রতি সাড়ে চার হাজারেরও বেশি সহিংসতার ঘটনা। নারী নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় অপরাধীচক্র, রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশাসনের সহযোগিতা বরাবরই লক্ষ করা গেছে। রাফির ঘটনাটিও এ চক্রের বাইরে নয়। সেখানে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিকচক্র, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

আমরা বরাবরই বলছি, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে শুধু জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলেই চলবে না, রাজনৈতিকভাবে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। রাফির সঙ্গে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, শুরু থেকেই সেখানে স্থানীয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল। একজন অধ্যক্ষ যে নানা ধরনের নাশকতার সঙ্গে জড়িত, জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত, অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত; তাঁকে কী করে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা সহযোগিতা করেন—এ প্রশ্নের উত্তর আমার মাথায় আসে না।

রাফির ওপর এ হামলার সূত্রপাত হলো ২০১৭ সালে। এ ঘটনা স্থানীয় প্রশাসন জানলেও তারা রাফিকে সহযোগিতা না করে উল্টো রাফির পরিবারকেই নানাভাবে জিম্মি করার চেষ্টা করে। ঘটনা ঘটার পর স্থানীয় থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হলো। কিন্তু রাফিকে তো আর বাঁচানো গেল না। রাফির মতো এ রকম হাজারো ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু এ রকম মৃত্যুর মুখে পতিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার বাহাদুরের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। আবার যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তারাও সুযোগ বুঝে পুনর্বহাল হন।

রাফির মৃত্যুর পর শুনলাম স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে দলের পক্ষ থেকে। এ রকম প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতাসীন স্থানীয় নেতারা সরাসরি যুক্ত থাকেন। কিন্তু সারা দেশে তো আর রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এ রকম কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। আমরা নোয়াখালীর আরো দুটি গণধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সরাসরি জড়িত ছিলেন। আমরা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছে প্রত্যাশা করব, তাদের এ রকম অপরাধী টাইপের কর্মী ও নেতাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনা হোক।

এবার বলি বিচারের কথা। দেশে পারিবারিক সহিংসতার শিকার ৩.১ শতাংশ নারী বিচার পেয়ে থাকে। অন্যদিকে ৯৬.৯ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আদালতে শুনানির পর্যায়েই যায় না। আবার গেলেও তা বাতিল হয়ে যায়। দেশে এখনো ৬৬ শতাংশ নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার। নারীর ওপর সহিংসতা সম্পর্কিত মামলাগুলোর প্রতি পাঁচটির মধ্যে চারটি আদালতে উত্থাপিত হতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, তারপর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। আবার ৩২ শতাংশ অপরাধী খালাস পেয়ে যায়। সমাজে মনে করা হয় নির্যাতন একটি স্বাভাবিক ঘটনা। আবার নির্যাতনের শিকার একজন নারী থানায় গিয়েও অভিযোগ দিয়ে সহযোগিতা পান না, হয়রানি করা হয় তাঁকে। আইনি জটিলতায় বিচার পেতে অনেক সময় লাগে। একজন নারী বা একটি পরিবারের পক্ষে টাকা খরচ করে বা সময় দিয়ে পরিশেষে বিচার পাওয়া খুবই কঠিন। সে কারণে বেশির ভাগ মামলার বিচার আলোর মুখ দেখে না। যখনই আমরা কোনো না কোনো নির্যাতনকে মেনে নিচ্ছি, তখন ভাবতে হবে, আমরা সহিংসতাকেই সমর্থন করছি। ফলে নারীদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়।

রাফি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অতি দ্রুত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের কঠোরতম আইনানুগ শাস্তি প্রদান করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করারও জোর দাবি জানাচ্ছি। অপরাধী ও পৃষ্ঠপোষকরা যাতে কোনোভাবেই এমন নৃশংসতার দায় থেকে পার পেয়ে না যায় তা নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হোক। যারা এমন ঘৃণ্য অপরাধের পরও অভিযুক্ত শিক্ষককে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, তাকে রক্ষা করতে মিছিল-মিটিং করেছে, সামাজিক-রাজনৈতিক পরিচয় কোনোভাবেই বিবেচনায় না নিয়ে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে এবং অভিযোগকারীকে নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিত যে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপরাধীদের আড়াল করার অপচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। পাশাপাশি রাফির পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হোক। যে সাহস, মনোবল আর আপসহীনতার দৃষ্টান্ত রাফি জাতির সামনে তুলে ধরেছে, তার জন্য তাকে এবং তার পরিবারকে আমি অভিনন্দন জানাই।

এ প্রতিবাদ যেন কোনোভাবেই বৃথা না যায়। অন্যায় আর নিপীড়নের বিপরীতে ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক ও মৌলিক মানবাধিকার দাবি করতে গিয়ে আর কাউকেই যেন এমন বর্বরতার শিকার না হতে হয়। আমি মনে করি, দায়মুক্তির অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি বসবাসযোগ্য নিরাপদ, ন্যায়পরায়ণ ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশাসনের সব স্তরে দায়িত্বশীল ব্যািক্তদের অঙ্গীকার ও তার বাস্তব প্রতিফলন এখন সময়ের দাবি।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

অনুলিখন : রেজাউল করিম

মন্তব্য