kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

অ্যাসাঞ্জ গ্রেপ্তার

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১২ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অ্যাসাঞ্জ গ্রেপ্তার

লন্ডনে ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে গতকাল উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে সাড়া-জাগানো বিকল্প ধারার সংবাদমাধ্যম উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার করেছে যুক্তরাজ্যের পুলিশ। আদালতে হাজিরা না দেওয়ার অভিযোগে গতকাল বৃহস্পতিবার লন্ডনে অবস্থিত ইকুয়েডরের দূতাবাস থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ব্রিটিশ সরকার ৪৭ বছর বয়সী অ্যাসাঞ্জকে বিচারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেবে। কারণ ব্রিটিশ পুলিশ স্বীকার করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের হয়েই তারা আসলে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার করেছে।

এদিকে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় অনেক ব্যক্তি ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এটি একটি ‘অন্ধকার মুহূর্ত’। কেউ কেউ বলছে, গ্রেপ্তার করলেও অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া ঠিক হবে না।

সুইডেনে দায়ের হওয়া যৌন নির্যাতনের মামলা থেকে রেহাই পেতে ২০১২ সালে ইকুয়েডরের দূতাবাসে আশ্রয় নেন অ্যাসাঞ্জ, যদিও অভিযোগের ভিত্তি না থাকায় মামলাটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আদালতে হাজির না হওয়ার আরেকটি ‘লঘু’ অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন যুক্তরাজ্যের একটি আদালত। অন্যদিকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আগেই অ্যাসাঞ্জের আশ্রয় প্রত্যাহার করে নেয় ইকুয়েডর সরকার। এরপর গতকাল যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে তাঁকে গ্রেপ্তার করে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ।

আশ্রয় বাতিলের কারণ হিসেবে ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট লেনিন মোরেনো বলেন, অ্যাসাঞ্জ বারবার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছেন। তবে উইকিলিকস বলছে, বেআইনিভাবে অ্যাসাঞ্জের আশ্রয় বাতিল করা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ কথাও বলা হয়েছে যে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তারের অনুমতির বিনিময়ে মোরেনো নাকি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ঋণ মওকুফ চেয়েছেন। অন্যদিকে বিবিসির এক খবরে বলা হয়, ইকুয়েডর দূতাবাসে বসে অ্যাসাঞ্জ গোপনে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। আর বিষয়টি ইকুয়েডর দূতাবাস জেনে যায়।

স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড (মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইকুয়েডর সরকার আশ্রয় বাতিল করায় সে দেশের রাষ্ট্রদূত পুলিশকে দূতাবাসে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, অ্যাসাঞ্জকে শিগগিরই ওয়েস্টমিনস্টারের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হবে। এর আগ পর্যন্ত তাঁকে সেন্ট্রাল লন্ডন পুলিশের হেফাজতে রাখা হবে। মেট্রোপলিটন পুলিশ এও জানিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়, অ্যাসাঞ্জকে শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। কারণ তাঁকে নিজেদের কবজায় পেতে দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের ক্ষোভের কারণ হলো, উইকিলিকস যতগুলো গোপন নথি ফাঁস করেছে, সেগুলোর বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্রের।

প্রতিক্রিয়া : জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। তবে বেশির ভাগ সমালোচকই মনে করেন, অ্যাসাঞ্জের গ্রেপ্তার স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য হুমকি। অ্যাসাঞ্জের ‘সহযোদ্ধা’ ও যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার গোপন নথি ফাঁস করে আলোচনায় এসেছিলেন এডওয়ার্ড স্নোডেন। এক টুইটার বার্তায় তিনি বলেন, ‘অ্যাসাঞ্জের বিরোধিতায় হয়তো উল্লাস করছেন; কিন্তু বিষয়টি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অন্ধকার এক মুহূর্ত হয়ে থাকবে।’

অ্যাসাঞ্জকে যখন আশ্রয় দেওয়া হয় তখন ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাফায়েল কোরেয়া। অ্যাসাঞ্জের গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিজেদের দূতাবাসে ব্রিটিশ পুলিশকে ডেকে নিয়ে ইকুয়েডর ও লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার সবচেয়ে বড় নজির স্থাপন করলেন।’

গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিলে তা হবে খুবই ভুল একটি সিদ্ধান্ত। তবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে উপস্থিত সবাই অ্যাসাঞ্জের গ্রেপ্তারের খবরকে সাধুবাদ জানাবে।’ অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তারের পেছনে যে যুক্তরাষ্ট্রের হাত আছে, তার ইঙ্গিত দেন টেরেসা মে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র অনুরোধ করেছিল অ্যাসাঞ্জকে যেন হাতে হাতে তুলে দেওয়া হয়।’

ঘটনাক্রম : যৌন নির্যাতনের দুটি পৃথক অভিযোগে ২০১০ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন সুইডেনের আদালত। ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনি লন্ডনে গ্রেপ্তার হন। পরে জামিনে মুক্ত হন। ২০১২ সালের মে মাসে বিচারের জন্য অ্যাসাঞ্জকে সুইডেনে হস্তান্তরের বিষয়ে রুল জারি করেন যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট। পরের মাসে তিনি লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে ঢোকেন। এরপর আগস্টে তাঁর আশ্রয়ের আবেদন মঞ্জুর করে ইকুয়েডর।

২০১৫ সালের আগস্টে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নির্যাতনের মামলা বাতিল করে সুইডিশ প্রসিকিউটর অফিস। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের একটি প্যানেল ঘোষণা করে, ২০১০ সাল থেকে অ্যাসাঞ্জকে ‘স্বৈরাচারীপন্থায়’ যুক্তরাজ্য ও সুইডেন আটক রেখেছে। এর মধ্যে গত বছরের জুলাইয়ে অ্যাসাঞ্জের ভাগ্য নির্ধারণে আলোচনায় বসতে রাজি হয় যুক্তরাজ্য ও ইকুয়েডর। এরপর অক্টোবরে অ্যাসাঞ্জের ওপর কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করে ইকুয়েডর দূতাবাস। এ পরিস্থিতিতে ইকুয়েডর সরকারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামেন অ্যাসাঞ্জ। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অ্যাসাঞ্জকে দূতাবাস ত্যাগের পদক্ষেপ নেন ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট। তবে এ চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন অ্যাসাঞ্জের আইনজীবী। গত ফেব্রুয়ারিতে অ্যাসাঞ্জের জন্য পাসপোর্ট ইস্যু করে অস্ট্রেলিয়া। এরপর আদালতে আত্মসমর্পণ করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে গতকাল তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

যে কারণে সাড়া জাগায় উইকিলিকস : ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন সেনা সদস্যদের জন্য বানানো একটি নির্দেশিকার ছবি ছাপে উইকিলিকস, যাতে গুয়ানতানামো বে কারগারে বন্দিদের ওপর বিভিন্ন নির্যাতন চালানোর বিষয় উল্লেখ ছিল। ২০০৯ সালে নভেম্বরে পাঁচ লাখ গোপন বার্তা ফাঁস করে উইকিলিকস, যেখানে টুইন টাওয়ারে হামলার বিষয়ে অনেক তথ্য ছিল। ২০১০ সালের ৫ এপ্রিল একটি ভিডিও ফাঁস করে উইকিলিকস। এতে দেখা যায়, মার্কিন হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলিতে ইরাকে দুই সাংবাদিকের মৃত্যু হয়। নিহত হয় বেসামরিক লোকজনও। উইকিলিকস একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি মার্কিন নথি ফাঁস করে ২০১০ সালের ২৫ জুলাই, প্রায় ৯০ হাজার। নথিগুলোর মাধ্যমে সামনে আসে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের গুলিতে অনেক বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। সূত্র : বিবিসি, আরটি, গার্ডিয়ান।

মন্তব্য