kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

৩১ মার্চের মধ্যে আবার ডাকসু নির্বাচন দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

১৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



৩১ মার্চের মধ্যে আবার ডাকসু নির্বাচন দাবি

আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে আবার ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে গতকাল ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে ভোট বর্জনকারী পাঁচ প্যানেল, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সমর্থকরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন দাবি করেছেন ছাত্রলীগ বাদে ভোট বর্জনকারী পাঁচ প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। গতকাল বুধবার দুপুরে ডাকসুর নবনির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরসহ পাঁচ প্যানেলের প্রতিনিধিরা উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দিয়েছেন।

আগামী তিন দিনের মধ্যে পুনঃ তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়ে তাঁরা বলেছেন, শনিবারের মধ্যে দাবি মানা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। এই তিন দিন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন তাঁরা।

তবে পুনর্নির্বাচনের দাবি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান।

এদিকে গত মঙ্গলবার ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর তিনি ও সমাজসেবা সম্পাদক বাদে বাকি ২৩ পদে পুনর্নির্বাচন দাবি করেছিলেন। কিন্তু গতকাল আবার তিনি সব পদেই পুনর্নির্বাচনের দাবি জানান। তবে গতকাল আবার তিনি বলেছেন, শিক্ষার্থীরা চাইলে শপথ নেবেন। এতে করে নুর কয়টি পদে পুনর্নির্বাচন চান তা নিয়ে এক ধরনের ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে।

পুনর্নির্বাচন দাবি : পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী দুপুরে রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে যায় পুনর্নির্বাচন দাবি করা পাঁচ প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক শিক্ষার্থীরা। পরে ডাকসুর নতুন ভিপি নুরুল হক নুরসহ পাঁচ প্যানেলের একটি প্রতিনিধিদল উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দেয়।

উপাচার্যের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র জোটের ভিপি প্রার্থী অরণি সেমন্তি খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘৩১ মার্চের মধ্যে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে পুনঃ তফসিল ঘোষণায় আমরা শনিবার পর্যন্ত আলটিমেটাম দিয়েছি। নির্বাচনে কারচুপির সঙ্গে জড়িতদের পদত্যাগ, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার না হলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যাব।’ 

বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর জোটের ভিপি প্রার্থী ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, ‘উপাচার্যের কাছ থেকে আমরা কোনো ইতিবাচক সাড়া পাইনি। তিনি বলেছেন, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অস্থিতিশীল করবে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

পরে বিকেলে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সব ছাত্রসংগঠন ও প্যানেল পুনরায় নির্বাচন চাচ্ছে এবং সেই লক্ষ্যে আন্দোলন করছে। উপাচার্যকে তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে। আমি তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সব দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেছি। আমি চাই এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বাতিল করে ৩১ মার্চের মধ্যেই পুনরায় নির্বাচন দিতে হবে। একই সঙ্গে যারা নির্বাচনের কারচুপির সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের বহিষ্কার করে অন্যদের দিয়ে সব পদেই পুনরায় নির্বাচন দিতে হবে।’

নুর আরো বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের চাওয়া সব পদেই পুনরায় নির্বাচন হোক, আমি তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করছি। আমি মনে করি, কারচুপির নির্বাচনেও আমি ভিপি নির্বাচিত হয়েছি। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আরো পাঁচ হাজার ভোট বেশি পাব।’

দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে নুর বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। আমি তাদের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেব। তারা যদি আমাকে বলে শপথ নিতে, আমি শপথ নেব। তারা যদি আমাকে শপথ না নিতে বলে, তাহলে নেব না। তবে শপথ নেব কি না সেটা দুই-এক দিন গেলেই বোঝা যাবে।’

যে পাঁচ প্যানেল আবার নির্বাচন করছে সেগুলো হলো বাম সংগঠনগুলোর জোট, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দুই প্যানেল স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ ও স্বতন্ত্র জোট এবং ছাত্র ফেডারেশন। গতকাল ভোট বর্জনকারীরা ক্যাম্পাসে সরব থাকলেও ছাত্রলীগের কোনো কর্মসূচি ছিল না।

পুনর্নির্বাচনের দাবি নাকচ : গতকাল উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে চার শ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যৌথ প্রয়াসে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং এত মানুষের আন্তরিকতা, তাদের স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি, সময়, শ্রম যেটি দিয়ে অর্জিত বড় আকারের একটি কর্মযজ্ঞের ফল, সেগুলোকে নস্যাৎ বা অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করার ক্ষমতা উপাচার্যের নেই।’

উপাচার্য আরো বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থিতিশীল, শৃঙ্খলাপূর্ণ, সুষ্ঠু একাডেমিক পরিবেশ বিরাজ করছে। এখানে কেউ কোনোভাবে অশান্ত করার চেষ্টা করলে সেগুলো কোনোক্রমেই বিশ্ববিদ্যালয় সহ্য করবে না।’

নির্বাচিতদের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘প্রতিটি প্রক্রিয়ায় যথাযথ রীতিনীতি অনুসরণ করেই সব কাজ সম্পন্ন করা হবে।’ 

রোকেয়া হলে বিক্ষোভ : গত মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত রোকেয়া হলে বিক্ষোভ চলে। ভোটের ফল বাতিল করে আবার নির্বাচন দাবি করার পাশাপাশি বিক্ষোভকারীরা হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জিনাত হুদার পদত্যাগ চেয়েছে। তারা ‘এক দাবি, পদত্যাগ’ বলে স্লোগান দেয়। একই সঙ্গে ডাকসুর ভিপি নুরসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানায় তারা। শিক্ষার্থীরা প্রাধ্যক্ষকে হলে আসার জন্য একাধিকবার ফোন দিয়েও সাড়া পায়নি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ প্রাধ্যক্ষের বাংলোয় গিয়ে প্রধান ফটক ভাঙচুর করে।

হল সংসদের স্বতন্ত্র প্রার্থী মৌসুমী সাংবাদিকদের বলেন, ‘সারা রাত ধরে মেয়েরা বিক্ষোভ করেছে। প্রাধ্যক্ষের কোনো খোঁজ নেই। ফোন দিলেও ধরেন না।’

রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন অন্য তিন ছাত্রী হলে নির্বাচিত স্বতন্ত্র প্রতিনিধিরা। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন কবি সুফিয়া কামাল হল, শামসুন্নাহার হল ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নির্বাচিত তিন ভিপি। এ সময় দুটি হল সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকরাও (জিএস) উপস্থিত ছিলেন।

শামসুন্নাহার হলের নতুন জিএস আফসানা ছপা বলেন, ‘রোকেয়া হল সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সারা রাত ধরে চলা বিক্ষোভ ও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আমরা খুবই শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন। আমরা তাদের (বিক্ষোভকারীদের) দাবিগুলোর সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করছি।’ 

অনশনে অসুস্থ এক শিক্ষার্থী  : পুনর্নির্বাচনের দাবিতে ক্যাম্পাসের রাজু ভাস্কর্যের সামনে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে অনশনে বসা শিক্ষার্থীদের একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অনিন্দ্য মণ্ডল নামের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বামপন্থী ছাত্র জোটের প্যানেল থেকে জগন্নাথ হল সংসদে প্রার্থী ছিলেন।

অনিন্দ্য ছাড়াও অনশন করছেন ভূতত্ত্ব বিভাগের আল মাহমুদ ত্বাহা, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শোয়েব মাহমুদ, পপুলেশন সায়েন্সের মাঈন উদ্দীন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তাওহীদ তানজিম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের রাফিয়া তামান্না প্রমুখ।

ত্বাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুনরায় নির্বাচনের আশ্বাস না দেওয়া পর্যন্ত তাঁদের অনশন চলবে।

তবে অনশনকারীদের পাশেই গতকাল দুপুর থেকে তিনটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসে স্যার এ এফ রহমান হলের ১০-১২ জন শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার দাবিতে অবস্থান নিয়েছে বলে তারা জানায়।

অনশনে রোকেয়া হলের পাঁচ শিক্ষার্থী : রোকেয়া হল ছাত্র সংসদে পুনরায় নির্বাচন ও হল প্রভোস্ট জিনাত হুদার পদত্যাগসহ চার দফা দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেছেন রোকেয়া হলের পাঁচ শিক্ষার্থী। তাঁরা হলেন রাফিয়া সুলতানা, শ্রবণা শফিক দিপ্তী, প্রমী খিসা, শেখ সায়িদা আফরিন শাফি ও জয়ন্তী রায়না।

গতকাল রাত ৯টা থেকে হলের মূল ফটকে তাঁরা অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের চার দফা দাবির মধ্যে আরো রয়েছে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সায়িদা আফরিন শাফি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দাবি না মানা পর্যন্ত আমরা এখানে অবস্থান করব।’ এ সময় পাশেই প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী তাঁদের দাবির পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিল।

মন্তব্য