kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

বিশ্ব নদী দিবস আজ

নদী দখলবাজদের তালিকা হচ্ছে

আরিফুর রহমান   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নদী দখলবাজদের তালিকা হচ্ছে

ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গাসহ চারপাশের নদীগুলো অবৈধভাবে দখল করে যারা শিল্প-কারখানা কিংবা অন্য স্থাপনা গড়ে তুলেছে, শেষ সময়ে এসে তাদের তালিকা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রাজধানীর বাইরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর দখলদারদের তালিকা তৈরিরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নদীর জায়গায় গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। দখলদারদের তালিকাসংক্রান্ত প্রতিবেদন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত মাসে সরকারের এক  উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেখানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, নৌপরিবহনমন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী এবং বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসকরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পর এরই মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক অবৈধভাবে নদী দখলদারদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। একাধিক জেলা প্রশাসক অবৈধভাবে গড়ে তোলা শিল্প-কারখানার মালিকদের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বৈঠকের পরামর্শ দিয়েছেন। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক এরই মধ্যে ২০টি অবৈধ শিল্প-কারখানার সন্ধান পেয়েছেন।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যারা অবৈধভাবে নদী দখল করে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলেছে, আমরা তাদের তালিকা তৈরি করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো তাদেরকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া, পরিবেশকে অক্ষুণ্ন রেখে কারখানা চালাতে হবে। কোনোভাবেই নদীদূষণ করা যাবে না।’ মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক এস এম ফেরদৌস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে আমরা নদী দখলদারদের তালিকা তৈরি করছি। যারা নদী দখল করে শিল্প-কারখানা কিংবা অন্য কোনো স্থাপনা গড়ে তুলেছে, আমরা সেগুলো উচ্ছেদে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছি।’ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, চট্টগ্রামের চারপাশে কর্ণফুলী নদীতে এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। ৯০ দিনের মধ্যে এসব স্থাপনা সরাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিশও দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে মালিকরা তাদের অবৈধ স্থাপনা না সরালে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

সভ্যতা গড়ে উঠেছিল যে নদীকে ঘিরে, যে বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ, সেই বাংলাদেশে নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। স্বাধীনতার পর দেশে নদীপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। দখলে দখলে নদীপথের দৈর্ঘ্য কমে বর্তমানে তিন হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। দেড় হাজার থেকে কমে দেশে এখন নদীর সংখ্যা ৪০০-তে ঠেকেছে। এমন বাস্তবতায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ রবিবার পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব নদী দিবস’। এবারের বিশ্ব নদী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নদী থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলন বন্ধ কর’। আশির দশক থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রবিবার দিনটিকে বিশ্ব নদী দিবস হিসেবে পালন করে আসা হচ্ছে। কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মার্ক এঞ্জেলো দিবসটি চালু করেন। যদিও জাতিসংঘ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশ সরকারও দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপাসহ পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রতিবারের মতো আজ বিভিন্ন সভা-সেমিনারের মাধ্যমে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর যৌথ নদী কমিশন বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বিশ্বের ৭০ থেকে ৭৫টি দেশ বিশ্ব নদী দিবসটি পালন করে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের চারটি নদীকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়েছিল ২০০৯ সালে। বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদীকে ইসিএ ঘোষণা করা হলেও দখল-দূষণ থেমে নেই। নদী থেকে অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে বালু। ২০১০ সালে প্রণীত বালুমহাল আইনে সেতু, সড়ক, মহাসড়ক ও রেললাইনের পাশ থেকে বালু তোলা নিষিদ্ধ হলেও আইনের তোয়াক্কা না করে বালু তোলা হচ্ছে। ইজারা ছাড়াও অনেক স্থানে নদী থেকে বালু তোলা হচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলাসহ নানা কারণে দেশের ৫১ জেলার ২৭২টি স্থানে বর্তমানে নদী ভাঙছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, নদীগুলোতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করতে পারলে নদীর ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে। ক্যাপিটাল ড্রেজিং ছাড়া নদীর ভাঙন রোধ সম্ভব নয় বলে মনে করে কমিশন।

এদিকে বালুমহাল থেকে দীর্ঘদিন ধরে বালু তোলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হুমকিতে পড়ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক জেলার জেলা প্রশাসক। তাঁরা বলছেন, একই স্থান থেকে দীর্ঘদিন বালু তোলার কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা বলেন, ‘মেঘনা নদীতে দীর্ঘদিন ধরে বালু তোলার কারণে মেঘনা সেতু হুমকিতে পড়েছে। আমি মেঘনা নদীতে দুটি বালুমহাল এরই মধ্যে বন্ধ করে দিয়েছি। নতুন বালুমহাল খোঁজার কাজ চলছে। তিন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে যেসব বালুমহাল চলছে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সেগুলোর ইজারা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে নতুন বালু মহাল খোঁজা উচিত’। যমুনা নদী থেকে অতিরিক্ত বালু তোলার কারণে বঙ্গবন্ধু সেতুও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে জেলা প্রশাসক সূত্র জানিয়েছে।

লেখক ও বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘নারী নির্যাতন ও যুদ্ধাপরাধীদের মতো নদীখেকো এবং দখলকারীদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার করতে হবে। তাহলেই নদী রক্ষা করা সম্ভব। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সদস্যসচিব শেখ রোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বালুর প্রয়োজন আছে। কিন্তু নির্বিচারে বালু উত্তোলন করে নয়। অনেক স্থানে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ইজারা ছাড়াই নদী থেকে বালু তোলা হচ্ছে। আমরা চাই, নির্বিচারে বালু উত্তোলন বন্ধ করা হোক। এ ছাড়া বালু উত্তোলনের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে যারা নদী ভাঙনের শিকার, তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। একই সঙ্গে বালুর বিকল্প এখন থেকে ভাবতে হবে।’

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নদী থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের পাশাপাশি পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদী ভাঙছে। ভাঙনের কারণে পদ্মা নদী এরই মধ্যে ১০ কিলোমিটার প্রশস্ত হয়েছে। যমুনা নদী ১২ কিলোমিটার এবং মেঘনা নদীর গড় প্রশস্ততা বেড়ে চার কিলোমিটার পর্যন্ত হয়েছে। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বিস্তৃত এলাকা পদ্মার তীব্র ভাঙনের মুখে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা গেলে নদীর ভাঙন কমে যাবে। ড্রেজিং থেকে পাওয়া মাটি দিয়ে নদীর পাড় সংরক্ষণ করা যাবে। এতে নদীর তীরও সংরক্ষণ হবে। একই সঙ্গে নদীর নাব্যতাও বাড়বে। এ জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে নদীর ভাঙন রোধে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প না নিয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের প্রকল্প নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।

মন্তব্য