kalerkantho


দুর্দান্ত এক ফাইনাল

মারিও কেম্পেস লিখছেন কালের কণ্ঠে

১৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



দুর্দান্ত এক ফাইনাল

২০ বছর পর আবার স্বপ্নপূরণ হলো ফ্রান্সের। আমার দৃষ্টিতে এক ঝাঁক দারুণ খেলোয়াড়কে নিয়ে নতুন ইতিহাস লিখতে চাওয়া ফ্রান্সের এই তরুণ দলটি ফাইনালের আগে নিজেদের সামর্থ্যের পুরোটা মেলে ধরেনি। অনেকের চোখেই ফেভারিট এই দলটি ফাইনালে সেই সামর্থ্যের পুরোটা দেখিয়েছে এবং এর ফলও পেয়েছে হাতেনাতেই। আর ফেভারিট না হয়েও ফাইনালে পৌঁছে যাওয়ার পথে ক্রোয়েশিয়া প্রতিনিয়তই তাদের প্রতি সমীহ বাড়িয়ে নিয়েছে। ফাইনালে ওরা ছিল ডার্ক হর্স। ফাইনালে হেরে গেলেও ওরা যথাসম্ভব চেষ্টা করেছে। সেই সঙ্গে করেছে দুর্দান্ত ফুটবলের প্রদর্শনীও। আমার কাছে ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ চ্যাম্পিয়ন। সে জন্য নৈপুণ্যের আলো ছড়াতে জানা বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় ওদের আছে। তা ছাড়া ওরা খেলেও শ্রেষ্ঠত্বের নিশানা ওড়ানো দলের মতোই।

ফাইনালটা শুরুই হয়েছিল অপ্রত্যাশিতভাবে। ১৯ মিনিটে যা ঘটল, তা সবার জন্যই ছিল কল্পনাতীত ব্যাপার। কে জানত যে মারিও মান্দজুকিচ নিজেদের জালে বল পাঠিয়ে দিদিয়ের দেশমের দলকে অপ্রত্যাশিত আনন্দের উপলক্ষ এনে দেবে। ওই সময় পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তো ক্রোয়েশিয়ার হাতেই ছিল। ওরা আক্রমণে গতি বাড়াচ্ছিল যেমন, তেমনি রক্ষণ সুরক্ষার দিকেও মনোযোগী ছিল। সর্বোপরি ওদের শরীরী ভাষাও ছিল দারুণ। ওই গোলের আগ পর্যন্ত ফ্রান্স কিন্তু খেলায়ই ছিল না। ওই একটা সুযোগই ওদের সামলে এলো এবং সেটি থেকেই গোল হয়ে গেল।

ফ্রি-কিক নেওয়ার সময় আন্তোয়ান গ্রিয়েজমানও নিশ্চয়ই আশা করেছিলেন তাঁরই কোনো সতীর্থ হেড করে লক্ষ্য ভেদের চেষ্টা করবেন। সেখানে রাফায়েল ভারানও ছিল। কিন্তু জুভেন্টাস তারকা (মান্দজুকিচ) উল্টো আত্মঘাতী গোল করে বসল এবং গোলরক্ষক সুবাসিচ কিছুই করতে পারল না। আত্মঘাতী গোলের পর ক্রোয়াটদের মুষড়ে পড়াটাই প্রত্যাশিত ছিল। সৌভাগ্যক্রমে ওরা ভেঙে না পড়ে খেলায় থাকল এবং পেরিসিচের গোলে ১-১ গোলের সমতা নিয়ে আসতেও তাদের বেশি সময় লাগল না। কিন্তু এরপরই আবার বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই বিতর্কিত মুহৃর্ত। রেফারি ভার-এর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) শরণাপন্ন হলেন এবং পেনাল্টি দিলেন। যেটি থেকে গোল করে গ্রিয়েজমান ২-১ এ এগিয়ে নিল দলকে। আর সে তো পেনাল্টি থেকে গোল করার ক্ষেত্রে দারুণ দক্ষও। ওই দক্ষতার প্রমাণ সে আরেকবার দিল।

এরপর দ্বিতীয়ার্ধও শুরু হলো প্রথমার্ধের মতোই। অর্থাৎ যথারীত ফ্রান্সের ওপর ক্রোয়েশিয়ার চড়াও হয়ে খেলা। দুর্দান্ত ফুটবল খেলছিল ক্রোয়েশিয়া। আর ফ্রান্স ঠিক করে নিয়েছিল কাউন্টার অ্যাটাক নির্ভর খেলাই খেলবে। তাতে কিছু সুযোগ এলেও ক্রোয়াট ডিফেন্ডার ভিদা সেসব রুখে দিচ্ছিল। ক্রোয়েশিয়া যখন একের পর এক আক্রমণ করার চেষ্টায়, তখনো ফ্রান্স নিজেদের কৌশল বদলায়নি। কাউন্টার অ্যাটাকের কৌশলেই থেকে গেছে এবং পগবার গোলে ব্যবধানও বাড়িয়ে নেয়। যা ওই সময়ের খেলার ধারার একদম বিপরীতে। এরপরই যেন ক্রোয়েশিয়ার খেলায় কিছুক্ষণের জন্য শ্রান্তি ধরা পড়তে শুরু করে। তাতে ফ্রান্সের আক্রমণের ধারাও কিছুটা বেগবান হয়। যখন যেকোনো মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়া ২-২ করে ফেলে ফেলে অবস্থা, তখনই ফ্রান্স এগিয়ে যায় ৪-১ গোলে। এ রকম হওয়ার ব্যাখ্যাও খুব সাদাসিধে, এমবাপ্পে। ও-ই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।

যখন ক্রোয়েশিয়ার জন্য ম্যাচ প্রায় শেষ, তখনই একটা গুরুতর ভুল করে বসে ফরাসি গোলরক্ষক হুগো লরি। যা আবার ক্রোয়েশিয়ার ফিরে আসার সম্ভাবনায় প্রাণের সঞ্চার করে। আমার মতে গোলরক্ষকের অবশ্যই কখনো ওই এলাকায় এভাবে পায়ে খেলা উচিত নয়। তার কাজ হলো বল ক্লিয়ার করা। সেটি না করায় ক্রোয়েশিয়ার জন্য সুযোগ তৈরি হলো। ওরা আবার চড়াও হয়ে খেলা শুরু করল। ওরা দারুণ ফুটবল খেলে যেতে থাকল এবং ফ্রান্স অপেক্ষায় থাকল সুযোগের। বলের দখল ফ্রান্সের তেমন একটা ছিল না। তবু বল ছাড়াই ওরা নিজেদের দুর্গ সামলে যেতে থাকল, যা ফ্রান্সের মতো অভিজ্ঞ একটি দলের পক্ষে বিরলই।

সব মিলিয়ে আমরা দুর্দান্ত একটি ফাইনাল দেখলাম। যা আমরা বহুদিন ধরে দেখি না। গোল হলো অনেক, দারুণ ফুটবলের সঙ্গে অনেক কৌশলও আমরা দেখলাম। সর্বোপরি দুর্দান্ত খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপ ফাইনালের উচ্চতার সমানুপাতিকে নিজেদের মেলেও ধরতে পেরেছে। ক্রোয়েশিয়া আরো গোল দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে। নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে ওরা শেষ মিনিট পর্যন্ত ফ্রান্সের ওপর চাপ বজায় রেখেছে। যদিও আরো গোল ওদের প্রাপ্য ছিল কিন্তু তা পেল না। সবশেষে এটাও বলতে চাই, এই টুর্নামেন্টের সেরা দুটো দল কারা ছিল, তা নিয়ে আলোচনার আর কোনো অবকাশই নেই। এই বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া যা করেছে, তা এক কথায় অসাধারণ। আর ফ্রান্স যোগ্য চ্যাম্পিয়ন। দুই সেরা দলই ফাইনাল খেলেছে এবং সেই ফাইনালটি তারা খেলেছে ফাইনালের মতোই। এখানে আরেকটি কথাও বলে রাখা দরকার। আমি ভেবেছিলাম ক্রোয়েশিয়াই চ্যাম্পিয়ন হবে। কিন্তু ফ্রান্সও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যোগ্য দল হিসেবেই। দুর্দান্ত বিশ্বকাপটি ফ্রান্সের আধিপত্য দিয়েই শেষ হলো না শুধু, প্রভাববিস্তারী ফুটবলে এই বিশ্বকাপ ইউরোপকেও বসিয়ে দিল লাতিন আমেরিকার ওপরে।



মন্তব্য