kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

‘ঘাসফড়িং’-এর সাহসী ওড়া

আলম ফরাজী, ময়মনসিংহ   

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘ঘাসফড়িং’-এর সাহসী ওড়া

‘সময় কেবলই নিজ নিয়মের মতো—তবু কেউ সময়স্রোতের ’পরে সাঁকো বেঁধে দিতে চায়; ভেঙে যায়; যত ভাঙে তত ভালো।’ জীবনানন্দ দাশের এই কবিতার (কবিতা ‘দীপ্তি’, গ্রন্থ ‘সাতটি তারার তিমির’। মতই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে, আলোর সাঁকো গড়ছে ময়মনসিংহের সাত স্কুলছাত্রী। অবৈধ বাল্যবিয়ে রোধে তারা হয়ে উঠেছে ‘সাতটি তারার আলো’। এই আন্দোলন নিয়ে ২০১৭ সালে কালের কণ্ঠ একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সাফল্যের পাখায় ভর করে আজও উড়ে চলছে সাত সাহসী মেয়ের সংগঠন ‘ঘাসফড়িং’। কখনো এককভাবে, কখনো প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা ভেঙে দিচ্ছে বাল্যবিয়ে। অল্প বয়সে একটি মেয়ের বিয়ে বসা মানেই সারা জীবনের জন্য তার ডানা ভেঙে যাওয়া। এ থেকে নিরাপদ করার ধারণা থেকেই নামকরণ হয়েছে ‘ঘাসফড়িং’।

ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়ক ধরে এগোলে উত্তর পাশে নান্দাইল উপজেলা পরিষদ। ঠিক তার উল্টো দিকে নান্দাইল পাইলট বালিকা বিদ্যালয়। সাত ঘাসফড়িং ওই বিদ্যালয়ের ছাত্রী। সানজিদা ইসলাম ছোঁয়া, তুলি দেবনাথ ও স্নেহা বর্মণ এবার দশম শ্রেণিতে এবং লিজুয়ানা তাবাসসুম, জান্নাতুল ইসলাম, জীবননিসা খানম ও জান্নাতুল আক্তার আছে নবমে। এক বছরেই তারা এলাকার ২৭টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করেছে। সর্বশেষ সাফল্যটি গত ২৯ ডিসেম্বরের। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন মুদি দোকানির সঙ্গে নাতনির গোপনে বিয়ের আয়োজন করেছিলেন নান্দাইল পৌর সদরের আবাসিক পল্লীর আবু চান মিয়া। স্থানীয় বালিকা বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া সাহানা বেগমের মা-বাবা ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। খবর পেয়ে উড়ে গিয়ে ঘাসফড়িং পুলিশ ছাড়াই সাহানার বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে দেয়। বিয়েতে রাজিও ছিল না সাহানা।

ডিসেম্বরেরই আরেকটি ঘটনা। উপজেলার বাতুয়াদি গ্রামের রমজান আলীর মেয়ে আলেয়া আক্তার (১৪) মাদরাসায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তার অমতে পরিবার বিয়ে ঠিক করে অটোরিকশাচালক স্বপন মিয়ার (২৮) সঙ্গে। শুনে একাই ছুটে যায় ‘ঘাসফড়িং’ সদস্য সানজিদা আক্তার ছোঁয়া। ছোঁয়া কালের কণ্ঠকে বলে, ‘১৫ ডিসেম্বর দুপুরে শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ছিলাম। এই সময়ই খবরটি পাই। দেরি না করে স্যারের ফোন দিয়ে বান্ধবী তুলি, তাবাসসুম ও স্নেহাকে খবরটি পৌঁছাই; বলি, বিদ্যালয়ে এক হওয়ার জন্য। স্কুল থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে ঘটনাস্থলে পৌঁছাই এবং বন্ধ করি আলেয়ার বিয়ে।’ আলেয়ার মা-বাবা ছাড়াও বরের বাবার কাছ থেকে পূর্ণ বয়স না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দেবেন না মর্মে অঙ্গীরকারনামা নেয় ঘাসফড়িং।

অনেক সময় এভাবে একাই লড়াই শুরু করতে হয় এবং এ নিয়ে সাত সদস্যের মধ্যে প্রতিযোগিতাও চলে। গত অক্টোবরের কথা। ঘাসফড়িং সদস্য লিজুয়ানা তাবাসসুম খবর পায়, তাদের গ্রাম রসুলপুরের খোরশেদুল ইসলামের মেয়ে রুমা আক্তারের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে এক সোয়েটার কারখানা শ্রমিকের সঙ্গে। যদিও মেয়েটির বয়স মাত্র ১৪, আঠারবাড়ী খালবালা বালিকা বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। স্কুলে যাওয়ার পথে একাই রুমার বাড়িতে যায় লিজুয়ানা। বাল্যবিয়ে বন্ধের অনুরোধ করলে মানতে রাজি হয়নি মেয়েটির মা-বাবা। উল্টো তাকে ‘খবরদারি’ না করার জন্য শাসিয়ে দেয়। লিজুয়ানা ঘাসফড়িং সদস্যদের একত্র করে যায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে।  ইউএনও হাফিজুর রহমান তখন ময়মনসিংহে একটি সভায় ব্যস্ত। মোবাইল ফোনে ঘটনা শুনে তিনি উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা রুমানা আক্তারকে নির্দেশনা দেন। ঘাসফড়িং টিম পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ রসুলপুর গ্রামে যায় এবং রুমা ও তার মা-বাবাকে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে বোঝায়। ১৮ বছর পূর্ণ না হলে রুমার বিয়ে দেবেন না বলে অভিভাবকরা মুচলেকা দেন।

গতকাল তাবাসসুমের মাধ্যমেই মোবাইল ফোনে কথা হয় রুমার সঙ্গে। কালের কণ্ঠকে রুমা জানায়, স্কুলের সহপাঠীদের নিয়ে সেও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধকারী সংগঠন গড়তে চায়। রুমা জানায়, বিয়ে বন্ধের পর সে নতুন উদ্যমে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে থাকে। এবার সে সব বিষয়ে ভালো ফল করে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। ‘আমি লেখাপড়া করতে চাই। পরে ভালো একটা চাকরি করে দিনমজুর বাবার কষ্ট লাঘব করতে চাই।’ এ প্রতিবেদককে বলে রুমা।

‘ঘাসফড়িং’ সানজিদা আক্তার ছোঁয়া কালের কণ্ঠকে বলে, ‘আমরা ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ উপজেলার দশালিয়া গ্রামের পান্না নামের এক কিশোরীর বাল্যবিয়ে বন্ধ করি। এরপর থেকে এ পর্যন্ত ২৭টির মতো বিয়ে বন্ধ করেছি।’ গম্ভীর স্বভাবের স্নেহা বর্মণের কথা—‘বাল্যবিয়ে ঠেকানো ছাড়াও সমাজের ভালো কাজে নিজেকে জড়াতে চাই।’ জান্নাতুল ইসলাম মনে করে, পড়ালেখা করলেই মেয়েদের সব সমস্যার সমাধান হয় না। প্রতিবাদ করতে না শিখলে সব কাজেই নির্যাতনের শিকার হতে হবে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের কাজে চ্যালেঞ্জ বহুমুখী, বলছিল আরেক ঘাসফড়িং জীবননিসা খানম। ‘এলাকার খামারগাঁও গ্রামের সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর বিয়ে হচ্ছে খবর পেয়ে অন্যদের জানিয়ে একাই ঘটনাস্থলে যাই। মেয়ের পরিবারের একজন বলে ওঠে, আমাদের মেয়ে যদি আত্মহত্যা করে তবে এর দায় কে নেবে? আমি বলি, ‘এর জন্য দায়ী হবে ওই মেয়ের মা-বাবা। কারণ বাল্যবিয়ে দিতে সরকারের নিষেধ আছে। এখানে অন্যদের কোনো দায় নেই।’ শেষ পর্যন্ত বাল্যবিয়েটি ভাঙতে সক্ষম হয় ঘাসফড়িং। এখন ওই মেয়ে যথারীতি বিদ্যালয়ে পড়ছে। জান্নাতুল আক্তার বলে, ‘পড়ালেখার সঙ্গে সঙ্গে বাল্যবিয়ে ঠেকানোর কাজটি একটা দায়িত্ব মনে করছি।’ তুলি বলে, ‘সমাজের জন্য ভালো কাজ করতেই ঘাসফড়িং গঠন করেছি।’ ঘাসফড়িংয়ের সদস্য লিজুয়ানা তাবাসসুমের স্কুলের দূরত্ব বাড়ি থেকে আট কিলোমিটার এবং মাঝে মাঝে হেঁটেই সে স্কুলে যায়, পথে বাল্যবিয়ের খবর পাওয়া যেতে পারে এই আশায়।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেকেরও অনেক গর্ব সাত ঘাসফড়িং নিয়ে। তিনি বলেন, ‘বড়রা যা পারে না ওরা তা পেরে দেখিয়ে দিচ্ছে। এখন আমার বিদ্যালয়ের কোনো ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয় না বললেই চলে।’ নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘সাত ঘাসফড়িং বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এদের সাহসিক ভূমিকায় প্রশাসনের হাতও অনেক শক্তিশালী হয়েছে। এই কাজে তাদের সহায়তা করা আমার একটা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।’ প্রশাসনিক পরিকল্পনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের সঙ্গে নিয়ে খুব শিগগিরই আমার উপজেলাকে শতভাগ বাল্যবিয়েমুক্ত করতে চাই।’

মন্তব্য