kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

জুডিশিয়াল সার্ভিস বিধিমালা নিয়ে আইনজীবীরা

সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করার বিধান ভারসাম্যপূর্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করার বিধান ভারসাম্যপূর্ণ

নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত সব বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করার বিধান রেখে গেজেট জারি করেছে সরকার। এ ব্যবস্থাকে ভারসাম্যপূর্ণ বলে অভিমত দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এমপি বলছেন, এ গেজেটে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এ বিধানের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদা মোটেই ক্ষুণ্ন হয়নি, বরং একটু বেড়েছে। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিমও গেজেটের প্রশংসা করেছেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেছেন, এই গেজেটের মাধ্যমে বিচার বিভাগ পৃথক্করণের চেতনা ধ্বংস হয়েছে। ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলামও মনে করেন, এখানে বড় রকমের ভুল হয়েছে।

সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের আলোকে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে রেখে সোমবার ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা-২০১৭’  গেজেট জারি করে আইন মন্ত্রণালয়।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক : আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এমপি সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, গেজেট না পড়েই কেউ কেউ সমালোচনা করছেন। এ গেজেটের মাধ্যমে কোনোভাবেই নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে নেওয়া হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদাও কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন করা হয়নি। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতির ব্যবস্থা নেওয়ার যে ক্ষমতা ছিল তাই রয়েছে। ফলে সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদাকে বাড়ানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছে এই শৃঙ্খলাবিধির গেজেট করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী বলেন, ‘যারা সংবিধান নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে চেয়েছিল তাদের সেই ষড়যন্ত্র ভেঙে গেছে। সংবিধান নিয়ে আর কাউকে ফুটবল খেলতে দেওয়া হবে না।’

আইনমন্ত্রী বলেন, শৃঙ্খলা বিধিমালার ২৯ বিধির (২) উপবিধিতে পরিষ্কারভাবে বলা আছে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের (রাষ্ট্রপতির) প্রস্তাব ও সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অভিন্ন না হলে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ প্রাধান্য পাবে, যা আগে কখনই ছিল না। তিনি বলেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে শিরোধার্য মনে করে এই বিধিমালা করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এবং আপিল বিভাগের সব বিচারপতির সঙ্গে বসেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, মাসদার হোসেন মামলার যে ১২টি নির্দেশনা ছিল তার সাত নম্বর নির্দেশনায় যা ছিল সেটাকেও এটার মধ্যে গ্রহণ করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই আচরণবিধি করা হয়েছে। সবার চাহিদা অনুযায়ী এই আচরণবিধি করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, সরকার সব সময়ই সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে গাইড লাইন হিসেবে গ্রহণ করেছে।

অধস্তন আদালতের বিচারকরা স্বাধীনভাবে বিচার করতে পারবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ১১৬(ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে, বিচার কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ এবং ম্যাজিস্ট্রেটগণ বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন। সংবিধানের ৯৪(৪) ও ২২ অনুচ্ছেদেও এ বিষয়ে বলা আছে। আর কী লাগবে। সংবিধান তো তিনি সংশোধন করতে পারবেন না।

সাবেক প্রধান বিচারপতি শৃঙ্খলাবিধি প্রণয়নে কিভাবে বাধা দিয়েছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, ষোড়শ সংশোধনী ছিল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদকে নিয়ে। ১১৬ অনুচ্ছেদের ইস্যু ছিল না। কিন্তু সাবেক প্রধান বিচারপতি তাঁর জাজমেন্টের মধ্যে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে সংবিধান পরিপন্থী করে দিয়েছেন।

ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ : সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এই গেজেট নিয়ে বিতর্ক করার সুযোগ নেই। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। এই বিধিমালায় সেটাই করা হয়েছে। বর্তমান আইনমন্ত্রীর মতো তিনিও বলেন, এই গেজেট জারির আগে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে সরাসরি কোনো ফাইল যেতে পারবে না। সুপ্রিম কোর্ট থেকে কোনো ফাইল পাঠানো হলে তা আইন মন্ত্রণালয় হয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে যাবে। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে। এই বিধানই বহাল রাখা হয়েছে।

ব্যারিস্টার আমীর : যে মামলার কারণে (মাসদার হোসেন মামলা) নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলার বিধিমালা করার নির্দেশনা আসে সেই মামলা বাদীপক্ষের আইনজীবী ও সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। এখানে কোনোভাবেই মন্ত্রণালয়ের আসার সুযোগ নেই। তিনি আরো বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পরামর্শ করার কথা। কিন্তু আপিল বিভাগের বিচারপতিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন আইনমন্ত্রী। আইন মন্ত্রণালয় মূল ভূমিকা পালন করেছে। এই প্রক্রিয়াটি বৈধ নয়। তাই এ গেজেট জারির গোড়াতেই গলদ হয়েছে।

ব্যারিস্টার আমীর আরো বলেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গেজেট জারি করতে হবে, করা হয়েছে ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী। এভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের অধীন করে ফেলা হয়েছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক এবং মাসদার হোসেন মামলার পরিপন্থী। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বৈশিষ্ট্য ও পৃথককরণের উদ্দেশ্য খর্ব করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ১৩৩ অনুচ্ছেদ সরকারি অপরাপর কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বিচারকদের ক্ষেত্রে কিছু করতে হলে ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী করতে হবে। এ বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হবে বলেও তিনি জানান।

অ্যাটর্নি জেনারেল : রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, সংবিধানের ১১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করার বিধান বর্ণিত আছে। এই বিধািমালায় তারই প্রতিফলন ঘটেছে। বুধবার এই গেজেট আদালতে দাখিল করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি (এস কে সিনহা) চেয়েছিলেন সমস্ত ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতেই থাকবে। সেটা তো সংবিধানবিরোধী একটা অবস্থান।

শ ম রেজাউল করিম : আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, মাসদার হোসেন মামলার মূল স্পিরিট এবং সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের আলোকেই এ গেজেট করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের বিধান রাখার মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগের মধ্যে সুসমন্বয় ঘটেছে।

১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ মাসদার হোসেন মামলায় ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন। ওই রায়ের আলোকে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা ছিল। এই নির্দেশনার আলোকে সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন সময় গেজেট জারি করার ওপর তাগিদ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার গেজেট জারি করেছে। আজ গেজেট আপিল বিভাগে দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।

 

 

মন্তব্য