kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

সব ক্ষেত্রেই সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ বাধ্যতামূলক

আশরাফ-উল-আলম ও এম বদি-উজ-জামান   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সব ক্ষেত্রেই সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ বাধ্যতামূলক

নিম্ন আদালতের বিচারকদের পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ, অনুসন্ধান, তদন্ত, দণ্ড ও বিভাগীয় মামলা রুজু ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালায়। তবে সব ক্ষেত্রেই সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা-২০১৭’ নামে ওই বিধিমালা গত সোমবার গেজেট আকারে জারি করেছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ।

বিচারকদের পেশাগত অসদাচরণ বলতে বিধিমালার কোনো বিধান মেনে না চলা বা এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো কাজ করা বা এতে নির্দেশিত কাজ করা থেকে বিরত থাকা; চাকরির শৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর কোনো কাজে লিপ্ত হওয়া; স্থানীয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আইনসংগত আদেশ বা নির্দেশ পালন না করা বা তা অমান্য করা বা সে অনুসারে কর্তব্য সম্পাদনে অবহেলা করা এবং সার্ভিসের কোনো সদস্য বা সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারক বা আদালতের কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে মিথ্যা, তুচ্ছ ও বিরক্তিকর অভিযোগ পেশ করাকে বোঝানো হয়েছে।

বিধিমালার সপ্তম অধ্যায়ে (বিবিধ) ‘সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শের কার্যকরতা’ শীর্ষক বিধিতে বলা হয়েছে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ (রাষ্ট্রপতি অথবা মন্ত্রণালয়) সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অনুসারে এই বিধিমালায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব ও সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অভিন্ন না হলে সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ প্রাধান্য পাবে।

বিধিমালায় বলা হয়েছে, জুডিশিয়াল সার্ভিসের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করার আনুষঙ্গিক সব পদক্ষেপ নেওয়া যাবে যদি কোনো কর্মকর্তা শারীরিক বা মানসিক অদক্ষতা ছাড়া কোনো অসদাচরণের সঙ্গে জড়িত হন। এসবের মধ্যে রয়েছে

দুর্নীতিমূলক কাজ বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার সংজ্ঞাভুক্ত কোনো কাজ বা পরিস্থিতি, রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর কাজের সংজ্ঞাভুক্ত কোনো কাজ বা পরিস্থিতি, সার্ভিস ত্যাগের সংজ্ঞাভুক্ত কোনো কাজ এবং ফৌজদারি অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ। তবে বিভাগীয় মামলা রুজু করার আগে অভিযুক্ত বিচারক বা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা প্রদানের সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ না নিয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া যাবে না। ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলেই কেবল অনুসন্ধান, তদন্ত ইত্যাদি শেষ করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেই কেবল অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রেও সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নিতে হবে।

বিধিমালায় বিচার বিভাগীয় কোনো কর্মকর্তার অসদাচরণের জন্য বা কোনো অপরাধের জন্য দুই ধরনের দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একটি লঘুদণ্ড আরেকটি গুরুদণ্ড। পাঁচ ধরনের লঘুদণ্ডের মধ্যে আছে তিরস্কার বা ভর্ত্সনা, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পদোন্নতি স্থগিত রাখা, যা এক বছরের বেশি হবে না, পেনশনের ওপর কোনো প্রভাব আরোপ না করে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি তিন বছর পর্যন্ত স্থগিত রাখা, পেনশনের ওপর  কোনো প্রভাব আরোপ না করে বেতন স্কেলের নিম্নধাপে তিন বছর পর্যন্ত বর্ধিতযোগ্য সময়ের জন্য অবনমিত করে দেওয়া এবং

সরকারের আর্থিক ক্ষতি হলে তার প্রাপ্য বেতন বা আনুতোষিক থেকে ওই ক্ষতির সম্পূর্ণ বা আংশিক আদায় করা। আর গুরুদণ্ডের ধাপ রয়েছে আটটি। এক. সার্ভিসে প্রবেশপদ ছাড়া অন্যান্য পদে কর্মরত অভিযুক্ত কর্মকর্তার ক্ষেত্রে তার বেতন বর্তমান বেতন স্কেলের এক ধাপ নিম্নতর স্কেলে অবনমিত করা।

দুই. ওই কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ পদোন্নতি বন্ধ করা। তিন. সার্ভিসের যেকোনো পদে কর্মরত কর্মকর্তার ক্ষেত্রে চাকরির মেয়াদ যা-ই হোক না কেন, স্বীয় বেতন স্কেল রেখে বা একধাপ নিম্ন

বেতন স্কেলে অবনমিত করে অবসর সুবিধাসহ বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান। চার. চাকরি থেকে বরখাস্ত করা, যা পেনশন প্রাপ্তি বা ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার চাকরিপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা হবে। পাঁচ. চাকরি থেকে অপসারণ যা পেনশন প্রাপ্তি বা ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার চাকরিপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা হবে না। ছয়. চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া; যে ক্ষেত্রে যোগ্যতা সাপেক্ষে ভবিষ্যতে সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের বা সংস্থার চাকরি লাভের সুযোগ অবারিত থাকবে। সাত. বেতন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে স্থায়ীভাবে অবনমিত করে দেওয়া এবং আট. বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া।

চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়ার আগে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে বিচার বিভাগীয় সদস্যদের সাময়িক বরখাস্ত করার বিধানও রয়েছে বিধিমালায়। এর তৃতীয় অধ্যায়ের ১১ বিধিতে সাময়িক বরখাস্তের বিধান ও মেয়াদ উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জুডিশিয়াল সার্ভিসের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অন্য বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা রুজুর সময় বা পরবর্তী যেকোনো পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অনুসারে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ লিখিত আদেশ দ্বারা অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবে। তবে শর্ত রয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে সাময়িক বরখাস্ত করার পরিবর্তে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে নির্ধারিত মেয়াদে ছুটির প্রাপ্যতা সাপেক্ষে

বেতন-ভাতাসহ ছুটিতে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া যাবে। সাময়িক বরখাস্ত থাকাকালে সার্ভিস সদস্য কোনো বিচারিক বা দাপ্তরিক কাজ করতে পারবেন না। সাময়িক বরখাস্তের মেয়াদ হবে এক বছর। এক বছরের মধ্যে অভিযুক্ত সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করে চূড়ান্ত আদেশ দিতে হবে। তা না হলে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাহার হয়েছে বলে গণ্য হবে। তবে সার্ভিসের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলে, ওই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সাময়িক বরখাস্তের আদেশ বলবৎ থাকবে।

 

 

মন্তব্য