kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

সাক্ষাৎকারে রোহিঙ্গা চেয়ারম্যান হোসেন

ঘরে ঘরে লাশ জানাজা-দাফন দিয়ে এসেছি

তোফায়েল আহমদ ও ছোটন কান্তি নাথ, কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির থেকে   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ঘরে ঘরে লাশ জানাজা-দাফন দিয়ে এসেছি

মিয়ানমারে কিভাবে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ চলছে প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানিতে তা শুনলেও গা শিউরে ওঠে।

মংডুর এক ইউনিয়নে চেয়ারম্যান হিসেবে ২০১০ সাল থেকে দায়িত্ব পালনকারী এই জনপ্রতিনিধি তাঁর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীদের নরহত্যার পর ফেলে রাখা বীভৎস লাশ কিভাবে তিনি লোকজন নিয়ে উদ্ধার করে জানাজা শেষে দাফন করেছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন।

রাখাইন রাজ্যের দক্ষিণাংশের মংডু শহরের দক্ষিণের বড়ছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান (রাখাইনে বলা হয় ‘ওকাট্যা’) মোহাম্মদ হোসেন (৩২)। বাবা আবুল বশর। দুই দিন হেঁটে এবং আরো এক দিন নৌকা ও গাড়িতে চড়ে মোহাম্মদ হোসেনসহ আরো ১৮ জন রোহিঙ্গা গত শুক্রবার রাতে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে পৌঁছান।

গতকাল শনিবার দুপুরে কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় মিয়ানমার স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে কয়েক বছর ধরে দায়িত্ব পালনকারী মোহাম্মদ হোসেনের। তিনি জানান, গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এবারের রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে সবচেয়ে কম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বড়ছড়া ইউনিয়নের বড়ছড়া গ্রামে। গ্রামের ৮৫০টি পরিবারে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার রোহিঙ্গা ছিল। হোসেন বলছিলেন, ‘তন্মধ্যে ৩০ থেকে ৩২ জনকে খতম (নিধন) করা হয়েছে গুলি ও লইঞ্চা (রকেট লাঞ্চার) দিয়ে। অন্যরা লুকিয়ে এবং পালিয়ে রক্ষা পায়। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়।’ তবে তাঁর ইউনিয়নের দুটি গ্রামে চরমভাবে বিপন্ন হয়েছে মানবতা।

মোহাম্মদ হোসেন জানান, ইউনিয়নের দুটি গ্রাম ধুংছা ও শীলখালী মংডুর রাশিদং জেলার সীমান্তের কাছাকাছি। চারপাশেই রয়েছে ১৮টি রাখাইন পল্লী। সেখান থেকে এসে সশস্ত্র রাখাইন সন্ত্রাসীরা একযোগে ধুংছা ও শীলখালী গ্রামে ২৫ আগস্টের পরদিন হামলে পড়ে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর তিন ভাগের একভাগ শিশু, নারী ও বৃদ্ধকে কুপিয়ে ও জবাই করে খতম করে তারা। সুন্দরী রোহিঙ্গা নারীদের বেছে বেছে আলাদা করে গণধর্ষণের পর হত্যা করে।

মোহাম্মদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি বড়ছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলে স্থানীয় রোহিঙ্গা মুসলিম ধর্মীয় নেতা মাওলানা হাসান শরীফ আমাকে অনুরোধ করেন তাঁদের গ্রামে ঘরে ঘরে পড়ে থাকা অসংখ্য শিশু, নারী ও বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার করে কবর দিতে। আমি ২০ জনের মতো লোককে সঙ্গে নিয়ে শীলখালী গ্রামে যাই হত্যাকাণ্ডের পরদিন রাতে। চার-পাঁচটি ঘর থেকে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত শিশু, নারী ও বৃদ্ধের ৩০ জনের মতো লাশ নিজের হাতে উদ্ধার করে জানাজা শেষে গণকবর দিই।’

রাখাইনের এই ইউপি চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘২৫ আগস্টের পর কয়েক দিন মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের খতমে ধারালো অস্ত্রের চেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে গুলি, লইঞ্চা (রকেট লাঞ্চার), বোমাসহ সামরিক সরঞ্জাম। পাশাপাশি রাখাইন যুবকদেরও সংগঠিত করে তাদের হাতে হাতে রামদা, চাপাতিসহ ধারালো অস্ত্রশস্ত্র তুলে দেয় রোহিঙ্গা নিধনে। এখন এই সন্ত্রাসীরাই রোহিঙ্গা খতমের মূল কাজটি করছে।’ হোসেন আরো বলেন, ‘এভাবে নিধনযজ্ঞ চালানোর সুবিধা হলো রাখাইন রাজ্যকে রোহিঙ্গাশূন্য করা গেল কম খরচেই।’

ইউপি চেয়ারম্যান হোসেনের খালাতো ভাই আবদুল হাফিজ আগে থেকেই উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে আছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ভাইসহ ১৮ জন এসেছে শনিবার রাতে। তাঁরা তিন দিন ধরে কিছুই খেতে পারেনি। পায়ে হেঁটে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে লেগেছে দুই দিন, আর এক দিন লেগেছে নাফ নদী পার হতে এবং গাড়িতে। আমি তাঁদের আমার সঙ্গে রেখে আপাতত পাঁচ কেজি চাল দিয়ে তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করেছি।’

মন্তব্য