kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

এবার কূটনৈতিক লড়াই

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ সবার সমর্থন চায় বাংলাদেশ

মেহেদী হাসান   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এবার কূটনৈতিক লড়াই

ফাইল ছবি

সাত দিনে ১৭ বার মিয়ানমারের হেলিকপ্টারের বাংলাদেশের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশ, সীমান্ত বরাবর স্থলমাইন পোঁতা, গুলিবর্ষণ—এ ধরনের নানা উস্কানি সত্ত্বেও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়ায়নি বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবেই পরিস্থিতি মোকাবেলার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। কাজ করছে বাংলাদেশের পুরো কূটনৈতিক সম্প্রদায়।

জানা গেছে, সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর রোহিঙ্গা সমস্যাই ছিল মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নের বড় বাধা। বাংলাদেশ বরাবরই মিয়ানমারের সঙ্গে সমস্যাটি দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাতে কার্যকর কোনো ফল আসেনি। মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে বৈঠকে বসে সমস্যা সমাধানে রাজি হয়েছে। আবার বৈঠক থেকে বেরিয়েই মিথ্যাচার করেছে। এটা এখন আর গোপন নয় যে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এবার কূটনৈতিক লড়াই হবে সেখানেই।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বাংলাদেশের এ প্রচেষ্টা শুধু মিয়ানমারের লাখ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা থেকে এ দেশকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যেই শুধু নয়, রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশে ফেরত পাঠানোর মাধ্যমে বহু পুরনো এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানও নিশ্চিত করা।

উত্তর কোরিয়া, মালি নিয়েই ব্যস্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে পূর্ণমাত্রায় জাতিগত নিধন ও গণহত্যায় হাজারের বেশি মৃত্যু, তিন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলমানের সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া, নাফ নদের দুই পারে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়—এসব নিয়ে ভাবার তাদের সময় কোথায়? যুক্তরাষ্ট্রের হলোকস্ট জাদুঘর মিয়ানমারের রাখাইন পরিস্থিতিকে ‘গণহত্যার পূর্বাভাস’ বলে অভিহিত করেছে। আরো এক সপ্তাহ আগে ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে পরিস্থিতি আর কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করা যায় না’—এমন সতর্ক করে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিকে নজিরবিহীন এক চিঠি লিখেছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেজ। কিন্তু তাতেও টনক নড়েনি নিরাপত্তা পরিষদের। উল্টো মিয়ানমার সরকার ঘোষণা দিয়েছে, নিরাপত্তা পরিষদে তাদের বন্ধু চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখছে। তাই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো প্রস্তাবই সেখানে টিকবে না। এর আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ মিয়ানমারে তদন্তদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেও দেশটি বৈশ্বিক সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ অব্যাহত রেখেছে।

গত ২৫ আগস্ট থেকে সন্ত্রাসী দমনের নামে মিয়ানমার পূর্ণমাত্রায় জাতিগত নিধন ও গণহত্যাযজ্ঞ চালালেও তা থামাতে দায়সারা বিবৃতি ও আহ্বান জানানোর বাইরে আর কোনো উদ্যোগই নেয়নি বিশ্বের বড় শক্তিগুলো। এটি অতীতে বিভিন্ন সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গণহত্যা ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজিরবিহীন ব্যর্থতা ও যথাযথ দায়িত্ব পালন না করে নীরব সমর্থন করার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অতীতের মতো এবারও বিশ্ব সম্প্রদায় ও প্রভাবশালী দেশগুলো বিভক্ত নিজ নিজ স্বার্থে। এ কারণে মিয়ানমারে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন, এমনকি গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের মতো ভয়াবহ অভিযোগ সত্ত্বেও তারা একে অগ্রাহ্য করছে। মিয়ানমার জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালিয়ে তা অস্বীকার করার পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার মতো নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে যায় এমন যেকোনো উদ্যোগ আটকে দেওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা দিচ্ছে।

অথচ মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার সর্বোচ্চ সাধ্য দিয়েই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। এবার বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত, রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা। আর এ সমাধান মিয়ানমারের ভেতরেই। কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, এটি বাংলাদেশের বন্ধু এবং মানবাধিকার ও মানবতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর জন্যও এক অগ্নিপরীক্ষা। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর ব্যাপকভাবে পড়ায় এ সংকটের সঙ্গে এ দেশও ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে। নিকটতম প্রতিবেশী ও মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো ভারত ও রাশিয়ার জন্য আজ আবারও বন্ধুত্ব প্রমাণের পরীক্ষা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরোধিতা করা চীন পরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ‘ভেটো’ দিয়ে এ দেশের সদস্যপদ আটকে দিয়েছিল। সেই চীন পরে বাংলাদেশেরও বন্ধু ও সহযোগীতে পরিণত হয়েছে। এখন চীন নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের পক্ষ নিয়ে প্রকারান্তরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে কি না তা দেখার অপেক্ষায় কূটনৈতিক সম্প্রদায়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ আশা করছে যে বিশ্ব এ সংকটে সাড়া দেবে। মিয়ানমার তার দেশের রাখাইন রাজ্যে সাংবাদিক ও বিদেশিদের কার্যত নিষিদ্ধ করে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞ আড়াল করার চেষ্টা করলেও সেই নিধনযজ্ঞের ক্ষত নিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে। তারা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা মিয়ানমারে যেতে না পারলেও বাংলাদেশ তাঁদের জন্য উন্মুক্ত। তাই সত্য আড়াল করতে মিয়ানমারের চেষ্টা সফল হচ্ছে না। সত্য তুলে ধরার জন্য যা যা করা প্রয়োজন বাংলাদেশ সেগুলোর সবই করছে ও করবে। পরিস্থিতি দেখার জন্য বিদেশিরা বাংলাদেশে আসতে চাইলে তাদের অনুমতি দিচ্ছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া সঠিক চিত্র তুলে ধরার জন্য বেশ আগে থেকেই জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ও আসিয়ান জোট এবং সেগুলোর সদস্য দেশগুলোর সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ ও নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে ঢাকা। দৃশ্যত এর ফলও আসতে শুরু করেছে।

যুক্তরাজ্যের অনুরোধে গত ৩০ আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জোরালো কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেও মিয়ানমার পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইইউসহ অনেক দেশ। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান এ সপ্তাহেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মিয়ানমারের গণহত্যার বিষয়টি তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক যাচ্ছেন। জাতিসংঘ অধিবেশনে নিঃসন্দেহে তিনিও এ বিষয়ে সরব কূটনীতি চালাবেন।

মুসলমানপ্রধান দেশগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ভারতসহ সারা বিশ্বেই মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যার প্রতিবাদে মিছিল হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমারকে আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশও চায়, ওই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হোক। মিয়ানমারের ভেতরে রোহিঙ্গাদের ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার জন্যও বাংলাদেশ কূটনৈতিক প্রয়াস চালাচ্ছে।

আবার রোহিঙ্গা নিধনের অভিযোগের মধ্যেই ইসরায়েল গত সপ্তাহে মিয়ানমারের প্রতি সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও মিয়ানমারের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদারের পরিকল্পনা করছে। রাশিয়াও মিয়ানমার পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, বরং মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপের সমালোচনা করছে। বাংলাদেশ চায়, মানবতার কথা বলা পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আরো সরব হোক। অনেক দেশ আবার মুসলমান ইস্যুতে যতটা সরব বা রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে যতটা আগ্রহী, সংকট সমাধানে ততটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা