kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

রোহিঙ্গা বাঁচাতে হাজারো হাত

তোফায়েল আহমদ ও ছোটন কান্তি নাথ উখিয়া সীমান্ত থেকে   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রোহিঙ্গা বাঁচাতে হাজারো হাত

ক্ষুধার তাড়নায় পাগলপ্রায় রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুরা। ত্রাণ মিলছে এমন খবরে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে তারা। ছবি : কালের কণ্ঠ

উখিয়ার কুতুপালং থেকে টেকনাফের নয়াপাড়া পর্যন্ত কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের (আরাকান সড়ক) ৩৫ কিলোমিটার অংশ এখন রোহিঙ্গায় একাকার। অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই নাফ নদ পেরিয়ে এ মহাসড়কে ঠাঁই নিয়েছে। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। পানি, খাবার নেই। পয়োনিষ্কাশনেরও ব্যবস্থা না থাকায় লাখ লাখ রোহিঙ্গার ভরসা এখন মহাসড়কের দুই পাশ। অনিবন্ধিত এসব রোহিঙ্গা এখনো কোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার কাছ থেকে পাচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এই রোহিঙ্গাদের এখন বড় ভরসা স্থানীয় এবং বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে এগিয়ে আসা মানুষ। মানবতাবাদী এসব মানুষ সাধ্যমতো সহযোগিতা দিচ্ছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কেউ খিচুড়ি রান্না করে, আবার কেউ কাপড়চোপড়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, যেমন—চাল, ডাল, তেল, লবণ, পেঁয়াজ, সবজিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য বিতরণ করছে। বিতরণ করা হচ্ছে শুকনা খাবারও। হিন্দু ধর্মীয় নেতারাও ছুটে যাচ্ছেন আর্তমানবতার সেবায়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবতার বিরল দৃষ্টান্ত রাখছে বাংলাদেশ। তবে অনেকেরই প্রশ্ন, এই সহায়তার স্রোত যদি ফুরিয়ে যায় তখন কী হবে? কারণ প্রতিদিন খাবারের জোগান দিতে একেকজনের অনেক অর্থ চলে যাচ্ছে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আরেক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন কক্সবাজার শহরের লোকনাথ সেবাশ্রমের সভাপতি ও কক্সবাজার পৌরসভার কাউন্সিলর রাজ বিহারী দাশ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কয়েক দিন ধরে তিনটি বড় ডেকচিতে করে খিচুড়ি রান্না করে সেখানে নিয়ে যাচ্ছি। তার মধ্যে এক ডেকচি খিচুড়ি দিচ্ছি হিন্দুদের জন্য, বাকি দুই ডেকচি খিচুড়ি মুসলিম রোহিঙ্গাদের। এ জন্য প্রতিদিন আমার খরচ হচ্ছে ২০ হাজার টাকা।’

স্থানীয়ভাবেই শুধু নয়, প্রবাসে থেকেও অনেকে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা জোগাচ্ছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত উখিয়ার বাসিন্দা শরীফ মাসুম হোসাইন রিপ্পি গ্রামে থাকা মাকে ফোন করে বলেন, ‘মা আমি সাড়ে ১৫ হাজার টাকা পাঠাচ্ছি। খাবার কিনে রোহিঙ্গাদের সহায়তা করেন।’ সন্তানের এই আকুতি পেয়ে খাবার কিনে মা ছুটে যান রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিলি করতে।

উখিয়ার পালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) নুরুল আবচার চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, আপাতত পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। তেমন খাবারের সংকট হচ্ছে না। আজ (শনিবার) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিন থেকে চার শতাধিক যানবাহনে করে ত্রাণ এনে মহাসড়কে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিলিয়ে গেছে মানুষ। অনেকে নগদ টাকাও দিচ্ছে। এভাবে হয়তো আরো কিছুদিন খাবারের সংকটে পড়বে না রোহিঙ্গারা।

এই ইউপি সদস্য একটি পরিসংখ্যান দেন কালের কণ্ঠকে। তিনি জানান, এখানে মহাসড়কে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ অবস্থান করছে। তাদের প্রায় অর্ধেক পালিয়ে আসার সময় নগদ অর্থ (কিয়েত), স্বর্ণালংকারসহ যা পেরেছে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। ১০ শতাংশ রোহিঙ্গা গবাদি পশু এবং ৫ শতাংশ রোহিঙ্গা কিছু ধান-চালও সঙ্গে নিয়ে আসতে পেরেছে। তবে এসব একটি নির্দিষ্ট সময় পর ফুরিয়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক একটি সংবাদ সংস্থায় কর্মরত ঢাকার এক আলোকচিত্র সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি যখন রোহিঙ্গাদের এই দৃশ্য ধারণ করি এবং তাদের মুখে বর্বরতার বর্ণনা শুনি, তখন আমারও মনের ভেতর কান্না আসে। ছবি তুলতে গেলেই তারা দুই হাত পাতা শুরু করে। এ পর্যন্ত আমি নিজে ৩৫ হাজার টাকা নগদ বিলি করেছি এবং কিছু খাবার কিনেও তাদের খাইয়েছি।’

উখিয়ার বালুখালী সীমান্তের বাসিন্দা সৌদিপ্রবাসী ছৈয়দ করিম বলেন, ‘রোহিঙ্গারা হিন্দু বা মুসলিম যা-ই হোক, তারা তো মানুষ। আমাদের বাড়িতে পাঁচ দিন ধরে ২০ জন রোহিঙ্গাকে খাওয়ানোসহ তাদের স্থান দিয়ে পরে অস্থায়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছি। এভাবে আমাদের বাড়িতে রোহিঙ্গাদের জন্য পাঁচ দিন করে থাকা এবং খাবারের ব্যবস্থা করছি পালাক্রমে।’

টেকনাফের বাহারছড়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনজুর আলম বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর হয়ে নৌকাযোগে আসা কয়েক শ রোহিঙ্গাকে একটানা পাঁচ দিন ধরে খিচুড়ি রান্না করে খাইয়েছি।’

টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উলুবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা হাফেজ আহমদ, সাইফুল ইসলাম সাব্বির, আবু বক্কর মুন্সি জানান, তাঁদের এলাকায় আসা রোহিঙ্গাদের দুই দিন করে খাওয়ানোর পর তাদের তাঁরা অস্থায়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছেন।

রাখাইন রাজ্যের তমবাজার এলাকা থেকে এসে অনুপ্রবেশকারী ৫১৭ জন রোহিঙ্গা হিন্দুকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের কাছের হিন্দুপল্লীর হরিমন্দিরের পাশের একটি মুরগির ফার্মে। সেখানে ১৩ দিন ধরেই এসব হিন্দু শিশু, নারী-পুরুষ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। উখিয়ার হলদিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) স্বপন শর্মা রনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এত রোহিঙ্গা হিন্দুকে একবেলা খিচুড়ি খাওয়াতে সাত-আট হাজার টাকার খরচ পড়ে। প্রতিদিন এক বেলা মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাওয়াতে ১৫ হাজার এবং এক বেলা মাছ দিয়ে ভাত খাওয়াতে ১২ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এভাবে আর কত দিন চালাতে পারব, তা ভগবানই বলতে পারবে।’

গতকাল সন্ধ্যায় উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের সামনে কথা হয় মিয়ানমারের মংডু জেলার চাইন্দা গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা দম্পতি আনজুল করিম ও রশিদা বেগমের সঙ্গে। তাঁরা জানান, গত পাঁচ দিন আগে তাঁরা সীমান্ত পেরিয়ে নাফ নদ দিয়ে শাহপরীর দ্বীপে ওঠেন। সেখানে একটি বাড়িতে আশ্রয়ে থাকার পর গতকাল বিকেলে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের এক আত্মীয়ের সঙ্গে থাকছেন। তাঁরা বলেন, ‘আজ সকাল থেকে অনেকের কাছ থেকে টাকা, খাবারদাবার পেয়েছি সাহায্য হিসেবে। এ জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করছি এবং এ দেশের সরকার ও মানুষের জন্য দোয়া করছি।’   

উখিয়ার স্থানীয় দুই সংবাদকর্মী জানান, কোনো গাড়ি এলেই একসঙ্গে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে সাহায্য নিতে। ফলে ত্রাণকর্মীদের অনেকে একটু দূরে গিয়ে আবারও গাড়ি থামালে সেখানেও হামলে পড়ছে ত্রাণের আশায়। এভাবেই চলছে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের ৩৫ কিলোমিটার এলাকার চিত্র।

গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে টেকনাফ থেকে একটি মাইক্রোবাস কক্সবাজার যাচ্ছিল। মাইক্রোবাসটি উখিয়া টিভি উপসম্প্রচার কেন্দ্রের কাছে পৌঁছলে চারদিক থেকে শত শত রোহিঙ্গা ঘিরে ধরে। এই অতি ভিড়ের কারণে ত্রাণ দেওয়াও সম্ভব হচ্ছিল না। এ অবস্থায় প্যাকেটভর্তি খাদ্যসামগ্রী যা ছিল, তা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ছিটিয়ে দিলে কুড়িয়ে নেয়। কালের কণ্ঠ’র প্রতিনিধিরা এ রকম দৃশ্য গতকাল অনেকবারই দেখেছেন মহাসড়কে।

এদিকে অজানা-অচেনা ব্যক্তি, নামসর্বস্ব এবং ভুঁইফোড় বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারেও কিঞ্চিত পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার নামে ফটোসেশন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। অনুপ্রবেশকারী প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা এবং গত ২৫ আগস্টের পর থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত আরো তিন লাখ রোহিঙ্গাসহ বর্তমানে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট লাখে। এ ছাড়া নিবন্ধিত আছে ৩৩ হাজার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা