kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

‘বিজয়ী হয়ে ফিরব নইলে ফিরবই না’র কামরুল স্যার...

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ   

৭ আগস্ট, ২০১৮ ১৪:২৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘বিজয়ী হয়ে ফিরব নইলে ফিরবই না’র কামরুল স্যার...

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক কামরুল স্যার ফটো কার্টেসি: মেজর (অব.) নূরুল মান্নান

কামরুল স্যারকে নিয়ে লেখার ইচ্ছে ছিলো না আমার। কেউ মরে যাবার পর তার সম্পর্কে লিখতে ইচ্ছে করে না। আমার ধারণা যারা মারা যান, তারা পৃথিবীতে জীবিতদের কাছ থেকে তাদের জন্যে প্রার্থনা ছাড়া আর কিছুই চান না।

এর আগেও আমি কামরুল স্যারকে নিয়ে লিখেছিলাম একবার। বছর দুয়েক পূর্বে। তখন তিনি আমাকে চিনতেন না, কিন্তু আমি তাকে চিনতাম। উনাকে আমার জানাশুনা পৃথিবীর মানুষেরা সবাই চিনতো। না চেনার কোন কারণও নাই। একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা। কৈশোরে ছাত্রাবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। আমৃত্যু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করেছেন। 

স্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বই লিখেছেন। ফেসবুকে লিখে গেছেন তাদের নিয়ে জীবনভর। দুইদিন পূর্বেও। যাতে তারা আমাদের স্মৃতির ভেতর থেকে হারিয়ে না যায়, তাদের গৌরবান্বিত ত্যাগকে আমরা ভুলে না যাই। আইরনিক্যালি এদের নিয়ে ইতিহাসবিদরা কখনোই ভাবেননি। 

আমার বিশ্বাস বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সাবল্টার্ন ইতিহাস চর্চার জনক মেজর কামরুল। এককভাবে। বাংলা একাডেমি পদকপ্রাপ্ত। তাঁর লেখা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইয়ের সংখ্যা ২৩টি। উল্লেখযোগ্য হলো ‘জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা’, ‘বিজয়ী হয়ে ফিরব নইলে ফিরবই না’, ‘২ নম্বর সেক্টর এবং কে ফোর্স কমান্ডার-খালেদের কথা’ (সম্পাদিত), ‘একাত্তরের কন্যা, জায়া, জননীরা’ ‘পতাকার প্রতি প্রণোদনা’, ‘মুক্তিযুদ্ধে শিশু-কিশোরদের অবদান’ এবং ‘একাত্তরের দিনপঞ্জি’।

ওই বছরেও তিনি ছিলেন মৃত্যুপথযাত্রী। সবাই ভেবে নিয়েছিলো তিনি আর প্রত্যাবর্তন করবেন না। আমিও খুব বিচলিত হয়ে লিখতে বসেছিলাম। মনে হয়েছিল সময় খুব কম। যা কিছু লেখার তা এখনই লিখতে হবে আমাকে। পরলোকগত কামরুল স্যারকে নিয়ে যেনো আমাকে লিখতে না হয়। অবাক করা ব্যাপার হলো, আমার লেখার পর তিনি মারা যাননি। মৃত্যুকে পরাজিত করে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। আমিও ভীষণ খুশী হয়েছিলাম।

লেখার সূত্র ধরেই তিনি আমাকে খুঁজে বের করেছিলেন। আমি তখন ফেসবুকে সৌখিন লেখক। নিজের ছেলেবেলা নিয়ে লিখি। কামরুল স্যারের সাথে প্রথম দেখাতেই তিনি আমাকে বললেন, “আসাদ, তোমার লেখাগুলো আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে কেন জানো?” আমি বিস্মিত ও বিহ্বলভাবে তাঁর দিকে তাকাতেই বললেন, “তুমি তোমার যে ছেলেবেলার কথা লিখেছো, তা ছিলো আমার সদ্য অতীত হওয়া শৈশব। কাজেই লেখাগুলো আমাকে ভীষণভাবে স্মৃতিতাড়িত করেছে।”

তারপর অনেকদিন। প্রায়শই তিনি ঢাকা কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি থাকতেন। তার জন্যে সিএমএইচের একটা কক্ষ নির্ধারিত ছিলো। নদীর নামে নাম এই কক্ষের। তিনি ডাক দিলেই আমি যেতাম। কিছুক্ষণ তার সাথে বসে গল্প করতাম। আমি দেখেছি মৃত্যু চিন্তা তাকে কখনোই তাড়িত করতো না। যদিও তিনি জানতেন মৃত্যু তার চারপাশেই ঘুর ঘুর করছে।

কয়েকদিন পূর্বেও তিনি আমাকে ডেকেছিলেন। এবারেও কোনো উপলক্ষ্য নয়। খুব সাধারণ কথাবার্তা। সক্রেটিসের মৃত্যুর পূর্বে শিষ্যদের সাথে শেষ আলাপচারিতার মতো। শিষ্যরা আশা করছিল সক্রেটিস তাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দেবেন। কিন্তু সক্রেটিস কিছুই না বলে এক শিষ্যকে নির্দেশ দিলেন তার নেওয়া একটা মুর্গির টাকা কাউকে পরিশোধ করে দিতে। 

মেজর (অব.) কামরুল হাসান ভূঁইয়া                               

অনেক সাধারণ কথাবার্তার পর কামরুল স্যার আমাকে বললেন, “অন্যদিন এসো। তোমার সাথে লেখালেখি নিয়ে কথা বলবো।”

আজ (সোমবার, ৬ আগস্ট, ২০১৮) কিছুক্ষণ পূর্বে শুনলাম কামরুল স্যার ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)।

কয়েকদিন পূর্ব থেকেই তিনি ভীষণ অসুস্থ ছিলেন। ক্রমশ তার দেহের গুরুত্বপূর্ণ অরগ্যানগুলো ফেইল করছিলো। তবুও আমার কাছে মনে হচ্ছিলো তিনি আমাদের ছেড়ে যাবেন না। পুনরায় তার সাথে আমার কথা হবে। সাধারণ আটপৌরে গল্প। জনযুদ্ধের গণযোদ্ধাদের গল্প।

পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষের মৃত্যু হয় না। তারা অন্যদেরকেও বাঁচিয়ে রাখেন। কামরুল স্যারের ভালোবাসার ছত্রছায়া আমাদেরকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

মন্তব্য