kalerkantho

বুধবার । ২০ শ্রাবণ ১৪২৮। ৪ আগস্ট ২০২১। ২৪ জিলহজ ১৪৪২

আমার অত্যন্ত প্রিয় আর একজন মানুষ চলে গেলেন : হানিফ সংকেত

অনলাইন ডেস্ক   

২০ জুলাই, ২০২১ ২০:৪৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমার অত্যন্ত প্রিয় আর একজন মানুষ চলে গেলেন : হানিফ সংকেত

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু সাইমন ড্রিং চলে গেছেন না ফেরার দেশে। গত শুক্রবার তাঁর জীবনাসান হলেও খবরটি মিডিয়া এসেছে আজ মঙ্গলবার। সাইমন ড্রিং প্রথম সাংবাদিক হিসেবে একাত্তরে পাকবাহিনীর নৃশংস গণহত্যার খবর বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন। এরপর বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরি হতে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশে সাইমন ড্রিংয়ের মাধ্যমেই প্রথম বেসরকারি টেরিস্টরিয়াল টিভি চ্যানেল 'একুশে টিভি'র যাত্রা শুরু হয়। সেই সময়ের কিছু স্মৃতিকথা শোনালেন নন্দিত উপস্থাপক-নির্মাতা হানিফ সংকেত।

সোশ্যাল সাইটে হানিফ সংকেত লিখেছেন, 'আমার অত্যন্ত প্রিয় আর একজন মানুষ চলে গেলেন। সাইমন ড্রিং। আমাদের দেশের আধুনিক টিভি সাংবাদিকতার পথিকৃত। ছিলেন একাধারে একজন সাংবাদিক, তথ্যচিত্র নির্মাতা, টিভি উপস্থাপক। এদেশে বর্তমানে বিভিন্ন চ্যানেলে আমরা যে সংবাদ উপস্থাপনা দেখি এসবই মূলতঃ সাইমন ড্রিংয়ের অবদান। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ছিল অসাধারণ ভূমিকা। আর সেজন্যেই তাকে বলা হয় বাংলাদেশের বন্ধু।'

'গত শুক্রবার রোমানিয়ার একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর মৃত্যু হয়। খবরটা আজ জানলাম সংবাদ মাধ্যমে। ভীষণ কষ্ট পেলাম। বলা যায় তাঁর সঙ্গে আমার ছিলো আত্মিক সম্পর্ক। বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি টেরেস্ট্রিয়াল টেলিভিশন একুশে টিভি’র যাত্রা শুরু হয়েছিলো এই সাইমন ড্রিংয়ের হাত ধরেই। এখানে কাজ করতে এসেই সাইমনের সাথে আমার যোগাযোগ। বয়সে বড় হলেও ফজলে লোহানীর মতো তিনিও ছিলেন আমার বন্ধুর মতো। তাঁর সঙ্গে আমার রয়েছে অনেক স্মরণীয় স্মৃতি।'

'একুশে টেলিভিশনে কাজ করার সময় বলতে গেলে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তাঁর সঙ্গে দেখা হতো, কথা হতো। সাইমন ছিলেন ইত্যাদির প্রায় নিয়মিত দর্শক। অনুষ্ঠান দেখে প্রায়ই ফোন করতেন। বাংলা বলতে না পারলেও বিষয়বস্তু বুঝতে পারতেন। আর তখন থেকেই একুশে টেলিভিশনের অনেক কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেন আমাকে। দিনের পর দিন তাঁর সঙ্গে অনেক আড্ডা দিয়েছি। অনুষ্ঠান সংক্রান্ত মিটিং করেছি। একুশের ভবন ছাড়াও কখনও কখনও তাঁর বাসায় আড্ডা হতো।'

'কখনও বা একটা ফোন করে চলে আসতেন আমার বাসায়। ডাল খুব পছন্দ করতেন। তাই আমার ওখানে আসার আগে ডালের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। বিদেশ থেকে এলে সবসময় কোন না কোন উপহার সামগ্রী নিয়ে আসতেন। কখনও কোন দুর্লভ সিডি, কখনও ক্যামেরা, কখনও বা বিবিসির দুর্লভ কোন তথ্যচিত্র। তখন এই অনলাইনের যুগ ছিলো না। তাঁর উপহার দেয়া একটি ভিডিও ক্যামেরা স্মৃতি হিসাবে এখনও অনেক যত্ন করে রেখে দিয়েছি। সাইমন ড্রিংয়ের কারণেই একুশের যাত্রা শুরুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি করেছি।'

'জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে উন্মুক্ত মঞ্চে ধারণ করা হয় সেই অনুষ্ঠান। দেশের ইতিহাসে প্রথম চার হাজার শিশু-কিশোর একসঙ্গে সংসদ ভবনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করে সেই অনুষ্ঠানে। গানটি গেয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন ও প্রয়াত বন্ধু এন্ড্রু কিশোর। অনুষ্ঠান ধারণের পুরোটা সময় সাইমন আমাকে সঙ্গ দিয়েছেন। ধারণকালে বার বার কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলতেন, ‘কোন হেল্প লাগবে?’, ‘সব ঠিক আছে?’, ‘কিছু খাবেন?’।'

'একুশের প্রথম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানটিও করেছিলাম তাঁর কারণেই, নাম ছিলো ‘একুশের পাল তুলে’। যেখানে একুশে টিভির সমালোচনা করে, এর ভুলত্রুটি তুলে ধরেছিলাম। কারো কারো আপত্তি থাকলেও সাইমন ড্রিং বলেছিলেন, ‘গঠনমূলক সমালোচনা অনুষ্ঠানের মান বাড়াবে’। সারা রাত সম্পাদনা করেছিলাম অনুষ্ঠানটির। রাত জেগে সম্পাদনা করার সময় রাত ১২ টার পর প্রতিদিন আমার জন্য ফ্ল্যাক্সে করে কফি বা শুকনো খাবার নিয়ে আসতেন। যাওয়ার সময় বলে যেতেন, ‘ক্লান্ত লাগলে বিশ্রাম নিবেন’।'

'শুধু তাই নয়, আমি এবং সহকারীদের জন্য তিনটি ভাঁজ করা খাটেরও ব্যবস্থা রেখেছিলেন। তাঁর এই ভালোবাসার কারণেই একুশের জন্য সে সময় বেশকিছু অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছিলাম। অসম্ভব বন্ধুবৎসল একজন মানুষ ছিলেন সাইমন ড্রিং। এ দেশ ছেড়ে গেলেও তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ হতো ইমেইলে। দেশে এলে দেখা হতো। হঠাৎ সাইমন ড্রিংয়ের এই মৃত্যু সংবাদ, শুনে প্রচণ্ড আঘাত পেলাম। এদেশের মিডিয়া জগৎ তাঁর তাছে ঋণী। সাইমন আমরা কখনো তোমাকে ভুলবো না। সাইমন ড্রিংয়ের আত্মার শান্তি কামনা করছি।'



সাতদিনের সেরা