kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১০ আষাঢ় ১৪২৮। ২৪ জুন ২০২১। ১২ জিলকদ ১৪৪২

শফিক তুহিনের অভিযোগ, সাউন্ডটেকের বাবুলের কয়েকটি প্রশ্ন

অনলাইন ডেস্ক   

৫ মে, ২০২১ ১৭:১৪ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শফিক তুহিনের অভিযোগ, সাউন্ডটেকের বাবুলের কয়েকটি প্রশ্ন

সম্পতি সোশাল মিডিয়ায় একটি বিবাদ বা বাহাস মিডিয়া ব্যবহারকারীদের বেশ নজর কেড়েছে। এটাকে অনেকে বিবাদ বলছেন, আবার অনেকে অন্যভাবেও বিষয়টিকে ট্রিট করছেন। বিষয়টি মূলত একজন নামি শিল্পীর সঙ্গে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের। বিষয়টিতে অনেকে ইন্ধন যোগাচ্ছেন আবার অনেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন এ বিতর্ক থেকে। গত ৩ মে দৈনিক কালের কণ্ঠের অনলাইন সংস্করণে এ বিষয়টি নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় শফিক তুহিনের কপিরাইট ক্লেইম, যা বলল সাউন্ডটেক শিরোনামে। তার প্রেক্ষিতেই আজ সাউন্ডটেক কর্ণধার সুলতান মাহমুদ বাবুল তাঁর সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল ফেসবুকে একটি বড় পোস্ট লেখেন। সেই পোস্টে চলমান বিষয়টির প্রসঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

সাউন্ডটেকের কর্ণধার সুলতান মাহমুদ বাবুল লেখেন, আমি এই সোশাল মিডিয়াতে বাহাস করার মোটেই পক্ষপাতী নই, এতে কেউই লাভবান তো হতেই পারে না বরং শুধু দুটি প্রতিপক্ষ তৈরি হয় এবং ঘটনার সত্যাসত্য বিচার করার সুযোগ থাকে না বলে অন্যরা দুই পক্ষকেই বুঝে/না বুঝে অসন্মানিত করে আর তা কোনো কোনো সময় নোংরামিতেও পরিণত হয়। যাই হোক, যেহেতু দেশের গুণী একজন সংগীত ব্যাক্তিত্ব, শফিক তুহিন একটি প্রসঙ্গ টেনে তাঁর ফেসবুক প্রফাইল থেকে আমার/সাউন্ডটেক এর বিরুদ্ধাচার করছেন সেহেতু আমি ব্যাখ্যা না করলে ভুল বুঝাবুঝির সুযোগ থেকে যাবে। আমি যদিও এই বক্তব্য সেখানেও দিয়েছিলাম কিন্তু দুঃখজনকভাবে তার পরপরই তিনি তা নির্দিষ্ট পরিসরে সীমিত করে দিয়েছেন। তাই সকলের জ্ঞাতার্থে কথাগুলো এখানেও শেয়ার করলাম।

প্রথমেই তিনি বলেছেন, 'নাম মাত্র মূল্যে' তাঁর সৃষ্টি সাউন্ডটেক কিনেছে। এখানে আমার প্রশ্ন, নাম মাত্র মূল্যে তিনি কেনই-বা তাঁর সৃষ্টি বিক্রয় করলেন এবং আমরা কিভাবে নাম মাত্র মূল্যে সেগুলো কিনতে পারলাম, তা-ও আবার একটি দুটি নয়, শত শত?! কি এমন দুর্যোগে তিনি এই কাজটি করেছিলেন আশা করি ব্যাখ্যা করবেন।

দ্বিতীয়ত, তিনি বলেছেন, তাঁর তিন শতাধিক গান… তাহলে তিনি কেন মাত্র ৪৪টি গানের কপিরাইটের জন্য আবেদন করেছেন? বাকি গানগুলোর (যদি থেকে থাকে) ভাগ্যে কি ঘটেছে সেটা সবার জানা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, যেহেতু তিনিই বলেছেন দুই যুগ আগের কথা, সেহেতু এটা তাঁর অজানা নয় যে ওই সময়ও গানের বাণিজ্যিক স্বত্ব কিভাবে ক্রয় বিক্রয় হতো। যারা বিষয়টি অবগত নন তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলছি, অনেকটা এখনকার মতোই, তখন সাধারণত একটি গানের/অ্যালবামের যেকোনো একজন স্রষ্টা (শিল্পী/সুরকার/গীতিকার) বাকি দুজনের সম্মতি এবং সম্মানী বিনিময়ের মাধ্যমেই যেকোনো মিউজিক লেবেল এর কাছে ওই সৃষ্টির সব স্বত্ব আজীবনের জন্যই এককালীন মূল্যে বিক্রি করে দিতেন। এখানে এটা সবারই জানা (বা অন্তত নিজের মনের কাছে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে), 'না কোনো স্রস্টা পাঁচ বছরের নিয়তে তাঁর সৃষ্টি বিক্রয় করেছে, না কোনো লেবেল পাঁচ বছরের নিয়তে কোনো গান কিনেছে'। আর হ্যাঁ, যতটুকু মনে পড়ে তাঁর বেশির ভাগ গান সরাসরি তাঁর মাধ্যমের চেয়ে কোনো শিল্পীর মাধ্যমে ওই বন্দোবস্তেই তখন আমাদের কাছে এসেছিল (আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সে সময় কোনো শিল্পীই তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানী থেকে বঞ্চিত করেননি বা তিনিও কখনও সেরকম কোনো অভিযোগও উত্থাপন করেছেন বলে আমার জানা নেই)।

তাঁর নিশ্চয়ই মনে আছে, সাউন্ডটেক এ কর্মরত (উপযুক্ত সন্মানী ও সুযোগ-সুবিধার বিনিময়েই) থাকাকালীন তিনি নিজেও আমাদের হয়ে এই একই ব্যবস্থায় বেশ কিছু চুক্তি সম্পাদনে আমাদেরকে সহযোগিতা করেছিলেন।

যদিও একাধিকবারে সংশোধিত হয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের কপিরাইট আইন বর্তমানে আমাদের জন্য বিতর্কিত একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে (বিশেষ করে পুরনো গানের ক্ষেত্রে), এই কারণেই আমরা পুরনো লেবেল কম্পানিগুলো এবং সিনিয়র স্রষ্টাবৃন্দ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছি এবং সবচেয়ে কষ্টকর হচ্ছে এই বিতর্ক এবং একগুঁয়েমির কারণে সেসব সোনালি/কালজয়ী সৃষ্টিগুলো হারিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু সেই সময়ে আমাদের সকলের মধ্যে যে শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, আন্তরিকতা, ভালোবাসা ছিল তার ফলশ্রুতিতেই শুধু পারস্পরিক বোঝাপড়া/মৌখিক চুক্তিতেই উভয় পক্ষ ওই আমলে লক্ষ লক্ষ টাকা লেনদেন করেছি। বলতে দ্বিধা নেই, এখনও যেমন স্রষ্টা তাঁর কর্ম আজীবনের জন্যই (৬০ বছর) বিক্রয় করে বা মিউজিক লেবেলও এই ব্যবস্থার বাইরে কোনো গান ক্রয় করে না তখনও মৌখিক বা দুই পাতার 'কাঁচা' চুক্তিতেও একই রকম বোঝাপড়া করেই ক্রয় বিক্রয় হতো।

ন্যায্যত আমরা সকলেই বুঝি, ওই মৌখিক বা কাঁচা চুক্তির দায় (যদি থেকে থাকে) শুধু মাত্র মিউজিক লেবেল এর দুর্ভোগের কারণ যেমন হতে পারে না তেমন সেটার সুযোগও শুধু স্রষ্টা নিতে পারেন না, যেখানে দুই পক্ষের সম্মতিতেই তা ঘটেছিল। যদিও কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল/আছে। যাই হোক, এই বিতর্ক এখানে লিখে শেষ করার মতো না।

আরেকটি ব্যাপার এখানে আলোচনার দাবি রাখে, এখন যেমন ভবিষ্যৎ বিনোদন মাধ্যমের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই এবং স্রষ্টা তাঁর কর্ম ৬০ বছরের (আজীবন) জন্য সকল মাধ্যমের জন্যই বিক্রি করছেন ঠিক তখনও বর্তমানে উদ্ভাবিত ডিজিটাল মাধ্যমের (ইউটিউব, ফেসবুক, ওয়েলকাম টিউন ইত্যাদি) কথা স্বাভাবিক ভাবেই কোনো চুক্তিতে উল্লেখ করা হয় নেই।

চতুর্থত, তাঁর দাবির প্রেক্ষিতে খুব স্বাভাবিক ভাবেই একটি প্রশ্ন চলে আসছে, আমরা তাঁর গানগুলো সেই তখন থেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে বছরের পর বছর ব্যবহার করে 'অঢেল টাকা' উপার্জন করছি জেনেও কেন তিনি দুই যুগ পর এসে তাঁর কর্মের দাবি উত্থাপন করলেন তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। এইতো ৪-৫ বছর আগেও তিনি সাউন্ডটেক এর কয়েকটি নতুন গান করেছেন প্রতিটি 'সর্বস্বত্ব', 'সর্ব মাধ্যম', 'ভবিষ্যৎ মাধ্যম' ইত্যাদি বিক্রয় করে এবং তাও আবার 'আজীবনের' জন্য। তখনও তো তিনি কোনো ব্যতিক্রম করেননি বা তাঁর কোনো আক্ষেপ/অভিযোগ প্রকাশ করেননি!

পঞ্চমত, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী 'বেআইনি ও অপেশাদার' আচরণ, কে কিভাবে করছে তা নির্ধারণের ভার দেশের আইন এবং ইন্ডাস্ট্রি সংশ্লিষ্টরাই ভালো বুঝবেন, তাঁর বা আমার দাবিই চূড়ান্ত নয়।

তিনি বলেছেন, সংগীত সৃষ্টি তাঁর পেশা; তেমনই তা বিক্রি, বিতরণ, বিপণন, সংরক্ষণ ইত্যাদিও আমাদের পেশা; মেধা যেমন তাঁর বিনিয়োগ; অর্থ, শ্রম, মেধা এসবই আমাদের বিনিয়োগ। সুতরাং আমাদের সকলেরই উচিত অন্যের পেশার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। সেটা না হলে তিনি যেমন মর্মাহত হন বা কষ্ট পান বলে মন্তব্য করেছেন, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে আমাদের কষ্ট তাঁর চেয়ে কোনো অংশে কম। আমরা মাঝে মাঝে ভুলে যাই লেবেল, স্রষ্টা, কলাকুশলী কেউ কারও প্রতিপক্ষ তো নয়ই বরং একে ওপরের পরিপূরক, একজন ছাড়া অন্যজন খোঁড়া।

'লেবেল'রা স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসা করছে লাভ-লোকসানের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই, আজ পর্যন্ত কোনো লেবেল কি কোনো স্রষ্টার কাছে তাঁর সন্মানী থেকে লোকসানের ভাগ চেয়েছে, নাকি একের পর এক ব্যবসাঅসফল কাজের জন্য জরিমানা করেছে? আর যখন কোনো কাজ ব্যবসাসফল হয়েছে তখন তাঁর মনে হয়েছে তিনি ঠকে গিয়েছেন বা তাঁকে ঠকিয়ে লেবেল 'কোটি কোটি টাকা' কামাচ্ছে।

পরিশেষে, যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে তা হলো, আমার প্রতি তাঁর অবিশ্বাস এবং ভুল ধারণা। আমি কখনো আশা করিনি আমার স্নেহের এবং দেশের খ্যাতিমান একজন স্রষ্টা আমার কাছে সরাসরি তাঁর অভিযোগ-অনুযোগ না করে ফেসবুকে আমাদের সবাইকে ছোট করার চেষ্টা করবে!

যাই হোক (সবার উদ্দেশে), এত কিছুর পরও আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির সব শ্রদ্ধেয়/স্নেহের শিল্পী, সুরকার, গীতিকার, কলাকুশলী সবার মঙ্গলের জন্য যেকোনো পদক্ষেপ বা প্রয়োজনে আমাকে আগেও যেমন পাশে পেয়েছেন বা আমার মনের ও অফিসের দরজা সব সময় যেমন খোলা ছিল তেমনই ভবিষ্যতেও থাকবে, ইনশাল্লাহ। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন।

ইন্ডাস্ট্রিসংশ্লিষ্ট সবার বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আমি মনে করি আমাদের 'সকলের' স্বার্থে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির সকল অংশীদারদের গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধি সমন্বয়ে একটি কমিটি/প্যানেল গঠনের মাধ্যমে আমাদের সকল অমীমাংশিত বিষয়গুলো সমাধান এবং ভবিষ্যৎ গাইডলাইন তৈরি করা এখন অপরিহার্য। এটুকু আমি জোর দিয়েই বলতে পারি, আমাদের স্বার্থ আমাদের নিজেদেরই সংরক্ষণ করতে হবে, না হলে এই কাদা ছোড়াছুড়িও যেমন কোনো দিন শেষ হবে না, তেমনই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও তাদের অবশ্যম্ভাবী দুর্ভোগের জন্য আমাদের কখনো ক্ষমা করবে না।



সাতদিনের সেরা