kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বাপ-ঠাকুরদার দেশের মিতা হক, বিদায়!

অনিমেষ বৈশ্য   

১১ এপ্রিল, ২০২১ ২১:৩৩ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বাপ-ঠাকুরদার দেশের মিতা হক, বিদায়!

সোমবার রাত সাড়ে ৯টা। রেডিও বাংলাদেশে আধ ঘণ্টার একটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান হতো। আমি সেটা নিয়মিত শুনতাম। ওই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই বাংলাদেশের শিল্পীদের সঙ্গে আমার পরিচয়। ঘোষক মহাশয় একে একে বলে যেতেন, এবারের শিল্পী কলিম শরাফি, এবার রেজওয়ানা চৌধুরী, এবার পাপিয়া সারোয়ার, এবার তপন মেহমুদ, এবার মিতা হক। তখন রেডিওর ঘোষকরা আর জে হয়ে ওঠেননি। অনর্গল প্যাঁচাল নেই। মন্দ্রস্বরে তাঁরা শুধু শিল্পীর নামটা বলতেন। বড় জোর গানের প্রথম চরণ। ঘোষকের গলায় একটা উদাসী সুর ছিল। আমি তাই ঠিক করেছিলাম, আমি রেডিওর ঘোষক হবে। হইনি। কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ। 

আমার রেডিওটা সুবিধার ছিল না। তখন একটা রেডিও দুই প্রজন্ম না-শুনলে নতুন কেনার প্রশ্ন ছিল না। ভাঙা রেডিওই বাঙালি বাড়ির শোভা। খান কতক মোলায়েম চড়-চাপ্পড় না-খেলে রেডিওর ঘুম ভাঙত না। নব ঘুরিয়ে রেডিওর এক সেন্টার থেকে আর এক সেন্টারে যাওয়ার সময় যে বিচিত্র আওয়াজ বেরোত তা আমার কানে আজও লেগে আছে। কত শব্দ হারিয়ে গেছে। কত গন্ধও এখন পাই না। কিন্তু ওই মহাজাগতিক আকাশ-বাণী আমি আজও ভুলিনি। তা বাংলাদেশ রেডিও ধরার হ্যাপা ছিল বিস্তর। সহজে স্পষ্ট আওয়াজ আসত না। রেডিওটা পুব দিকে মুখ করে রাখলে ধীরে ধীরে ডিম ফুটে পক্ষী ছানা বেরোনোর মতো দু'একটা গানের চরণ কানে আসত। 

আমার দুয়ারের পুব দিকে বাংলাদেশ। ওটা আমার বাপ-ঠাকুরদার দেশ। অতএব আমারও দেশ। শিল্পীর নাম মনে নেই। কিন্তু তিনি যখন গাইতেন 'কোন সুদূরের আকাশ হতে আনব তারে ডাকি নেই কেন সেই পাখি...,' আমি আমাদের বাড়ির লেপা উঠোন দেখতে পেতাম। কোনওদিন বাংলাদেশে না-গেলেও দেখতে পেতাম। ওই ভাঙা রেডিও আমাকে উদ্বেল করেছিল, ওই রেডিওই আমাকে শিখিয়েছিল, দেশ আসলে ভাগ হয়নি। যশোরে কোনও পাখির ডানা খসলে তা উড়তে উড়তে বনগাঁয় চলে আসে। কিছুই ভাঙেনি। চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি...। 

তা এরকমই একদিন রেডিওর মুখ পুব-পানে ঘুরিয়ে শুনেছিলাম মিতা হকের গান। অপূর্ব ঘষামাজা গলা। কোন গানটা প্রথম শুনেছিলাম মনে নেই। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই আমি ওঁর গানের প্রেমে পড়েছি। অজস্র গান উনি গেয়েছেন। সেই গানের ভিড়েই তিনি আজ সকালে হারিয়ে গেলেন। করোনা কেড়ে নিল মিতাকে। 

এখন বাংলাদেশ রেডিও ধরা যায় কি না, জানি না। সোমবার রাত সাড়ে ৯টার অনুষ্ঠান হয় কি না, তা-ও জানি না। তবে কালই তো সোমবার। রাতে একবার চেষ্টা করব ধরতে। হয়তো ধরা যাবে না। কিন্তু ওই ক্যাঁচর-ক্যাঁচর শব্দ নিশ্চয় শোনা যাবে। ওতে মিশে আছে আমাদের বাড়ির বকুল গাছে পাখির শিসের আওয়াজ, ওতে মিশে আছে মেঘলা আকাশের নিচে গাই-বাছুরের ডাক, ওতে মিশে আছে মিতা হকের গানও-- আমার মনের মাঝে যে গান বাজে শুনতে কি পাও গো। আমি রেডিওর মুখ পুব-পানে ঘুরিয়েই রেখেছি।

লেখক-
কলকাতার সাংবাদিক
ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া



সাতদিনের সেরা