kalerkantho

রবিবার। ২৮ চৈত্র ১৪২৭। ১১ এপ্রিল ২০২১। ২৭ শাবান ১৪৪২

জয় বাংলা কনসার্টের অভাব অনুভব করছে তরুণ সমাজ

'আগামী বছর আরো বড় পরিসরে হবে জয় বাংলা কনসার্ট'

অনলাইন ডেস্ক   

৬ মার্চ, ২০২১ ২৩:৪০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



'আগামী বছর আরো বড় পরিসরে হবে জয় বাংলা কনসার্ট'

প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি, বঙ্গবন্ধুর হলোগ্রাফিক ভিজুয়াল, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের রঙিন ভিডিও উপস্থাপন, ইয়াং বাংলার মাধ্যমে তরুণদের দেশ গঠনে গ্রহণ করা বিভিন্ন উদ্যোগ থেকে শুরু করে বিগত বছরগুলোর প্রদর্শন করা হয় কনসার্টের বিশেষ মুহূর্তগুলো ইয়াং বাংলার ফেসবুক পেজে।

জাতির পিতার দেওয়া ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ স্মরণে জয় বাংলা কনসার্টে দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড দলগুলো গান পরিবেশন করে যার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে তরুণ প্রজন্ম। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে সেই ঐতিহাসিক ভাষণ ৫০ বছর পরও আজও আমাদের অনুপ্রেরণা যোগায়।

ঐতিহাসিক এই দিনটিতে নিয়মিত 'জয় বাংলা কনসার্ট' আয়োজন করে আসছে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) প্রতিষ্ঠান ইয়াং বাংলা। কনসার্টটির নাম বঙ্গবন্ধুর স্লোগান 'জয় বাংলা' থেকে গ্রহণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ভাষণের সমাপ্তি টানেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

চলতি বছর কনসার্টটি আয়োজন করা হচ্ছে না বৈশ্বিক মহামারির করোনার কারণে। কিন্তু আগামী বছর কনসার্টটি আরো বড় পরিসরে আয়োজন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন সিআরআই'র ট্রাস্টি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক।

চলতি বছর কনসার্টের আয়োজন না হলেও বিগত বছরগুলোতে আয়োজিত কনসার্টের চুম্বক অংশগুলো নিয়ে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান আয়োজন করবে ইয়াং বাংলা যা তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে সম্প্রচার করা হবে। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমের ফেসবুক পেজেও এই আয়োজন সম্প্রচার করা হবে।

এছাড়াও এই কনসার্টে নিয়মিত পারফর্ম করা ব্যান্ডদলগুলোকে নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান হবে। আগামী ৭ মার্চ ৮টা ৩০ মিনিটে চ্যানেল ২৪-এ এবং গান বাংলা চ্যানেল একই দিন রাত ৮টায় পৃথক দুটি আলোচনা অনুষ্ঠান হবে।

পূর্বের জয় বাংলা কনসার্টে জনপ্রিয় ব্যান্ড শিল্পীদের সমন্বয়ে গাওয়া দেশাত্মবোধক গানগুলো নিয়ে ৭ মার্চ রাত ১১টায় মাছরাঙ্গা টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হবে ১ ঘণ্টার একটি অনুষ্ঠান।

২০১৫ সাল থেকে নিয়মিত জয় বাংলা কনসার্টের আয়োজন করে আসছে ইয়াং বাংলা। মূলত মুক্তিযুদ্ধকালে প্রচারিত দেশাত্মবোধক গান এবং ওয়েস্টার্ন পপ মিউজিকের মিশ্রণে হওয়া এই কনসার্ট দারুণ জনপ্রিয় তরুণ প্রজন্মের কাছে।

প্রথমবারের মতো ৭ মার্চের ভাষণের রঙিন ভিডিও প্রদর্শন

২০১৬ সালে দেশের বৃহত্তম এই কনসার্টে বিশেষ আয়োজন ছিল প্রথমবারের মতো জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের রঙিন ভিডিও প্রদর্শন। এদিন রাত ৮টা ৩০ মিনিটে ৩০ হাজার দর্শক সরাসরি আর্মি স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণের রঙিন ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। অবশ্য বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের কাছে বঙ্গবন্ধুর মূল ভাষণে সম্পূর্ণ ১৭:৫০ মিনিট না থাকায় ১১:৪০ মিনিট হাই ডেফিনিশন (এইচডি) রঙিন ভিডিও হিসেবে কনভার্ট করে কনসার্টে প্রচার করা হয় যা মুগ্ধ হয়ে দেখে উপস্থিত সকলে। কলেজ শিক্ষার্থী রাজিন জানান, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের রঙিন ভিডিও প্রদর্শন আমার কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জাতির পিতাকে রঙিন ভিডিওতে দেখা অন্য রকম একটি প্রভাব রাখে আমার কাছে। এটি বর্তমান সময়ের সকলকে বঙ্গবন্ধুর সেই সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

২০২০ সালে প্রথমবারের মতো থ্রি-ডি হলোগ্রাফে ৭ মার্চের ভাষণ প্রদর্শন

২০২০ সালে অবাক হয়ে সকলে চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পায়। ৫০ বছর আগে যেই জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রদান করেন তা হলোগ্রাফের মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে ওঠে। জাতিসংঘ স্বীকৃত বিশ্বের স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে স্থান পাওয়া বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণ আরো একবার বাস্তবতায় ফিরে আসে এই হলোগ্রাফিক ভিজুয়ালের মাধ্যমে।

বঙ্গবন্ধুর এই হলোগ্রাফিক ভাষণ প্রদর্শনের আগে কনসার্টে প্রদর্শন করা হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানাকে। সেখানে শেখ হাসিনার আবৃত্তি করা একটি কবিতাও প্রদর্শন করা হয়।

গত বছর কনসার্টের আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানার উপস্থিতি।

ইয়াং বাংলার মাধ্যমে দেশ জুড়ে তরুণদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও উদ্যোগ নিয়েও অডিও ভিজুয়াল প্রচার করা হয় কনসার্টে। কনসার্টকে ঘিরে ওয়েস্টার্ন মিউজিক এবং দেশাত্মবোধক গানের মাধ্যমে তরুণদের দেশ প্রেমের যে দীক্ষা প্রদান করা হয় তার অভাব দারুণভাবে অনুভব করছে তরুণরা। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী দুর্জয় দাস বলেন, 'ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই কনসার্টের আয়োজন হচ্ছে না। ৫০ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধকালে গোপন রেডিও স্টেশনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রচারিত এই গানগুলো দেশের মানুষকে বিশ্বের জঘন্যতম এক গণহত্যাকালে বেঁচে থেকে যুদ্ধের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে প্রচারিত সেই গানগুলো বর্তমান সময়ের শিল্পীরা উপস্থাপন করে জয় বাংলা কনসার্টে। এমন একটি আয়োজনে অংশ নিতে পারাটাও দুর্দান্ত একটি বিষয়। এ বছর এমন অসাধারণ এক আয়োজন হচ্ছে না, কিন্তু আরো বড় পরিসরে কনসার্টটি দেখতে চাই আগামী বছর।'

'এই দেশের বর্ণাঢ্য সংস্কৃতির বিষয়টি কল্পনা করে নিতে আপনাকে। ১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ চলে, তখন কিছু শিল্পী গান লিখে সুর করে তা গেয়ে শোনায় যা তখনকার মতো এখনো আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়ে যায়। জয় বাংলা কনসার্ট যেভাবে সেই গানগুলোকে নতুন রূপে জীবন্ত করে তোলে তা আমার অনেক ভালো লাগে। এই গানগুলোর মূল্যই প্রমাণ করে আমাদের অসাধারণ এক সংস্কৃতি চর্চার কথা। যখন কনসার্টে কোনো ব্যান্ড দল গেয়ে ওঠে 'পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল; জোয়ার উঠেছে জনসমুদ্রে, রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল', আর তার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরা তরুণরাও যখন গেয়ে উঠি গানটি, আমরা তখন আসলে ১৯৭১ সালের সেই যুদ্ধের ময়দানেই ফেরত চলে যাই। গান, শিল্প এবং সাহিত্যের মাধ্যমে ইতিহাসকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য এমন আরো অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত আমাদের।' - বুয়েটের সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী তাহসিন আহমেদ কথাগুলো বলেন।

শিল্পকলা বিভাগের শিক্ষার্থী হুসেইন রাভি কনসার্ট প্রসঙ্গে বলেন, 'যখন আপনি যুদ্ধকালীন দেশাত্মবোধক গানের পুরাতন সেই অনুভবগুলোর সঙ্গে একবিংশ শতকের রক ব্যান্ডকে জুড়ে দেন, তখন বেশ উত্তেজনাকর এক অনুভূতি সৃষ্টি হয় সকলের মাঝে।'

গত বছরের অন্যতম আকর্ষণের বিষয় ছিল হলোগ্রাফিক স্ক্রিনের মাধ্যমে স্টেজে জীবন্ত হয়ে ওঠা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ প্রদান। তরুণ স্থাপত্যবিদ আতিকুর রহমান বলেন, 'এটি অবিশ্বাস্য ছিল। সত্যিও বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি। আমাদের প্রজন্মের জন্য ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের পরিস্থিতি বোঝাটা একটু কঠিন। দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে পাকিস্তানের শোষণ, নির্যাতন, হত্যা ও অবিচারের কারণে ফুঁসছিল এ দেশের মানুষ। সেই সময় ফেরত যাওয়া সত্যিই কঠিন ছিল, যখন বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠে ভাষণ প্রদান করেন এবং এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থানের আহ্বান জানান। তার এই কণ্ঠস্বরই তখন স্বাধীনতার দামাম বাজিয়ে দেয়। যেই লাল সবুজের পতাকা নিয়ে আমরা আজ গর্ব করি, যেই মানচিত্র নিয়ে আমরা আজ নিজেদের পরিচয় দেই এবং যেই স্বাধীনতা আমরা আমাদের হৃদয়ে অনুভব করি তার সবই সম্ভব হয়েছিল এই ভাষণের কারণে। এমন একটি বিষয়কে জীবন্ত করে তোলার জন্য জয় বাংলা কনসার্ট দুর্দান্ত এক আয়োজন।'

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সকল রাস্তার শেষ ঠিকানা ছিল রেসকোর্স ময়দান। বঙ্গবন্ধুরে দেওয়া ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, যা বিশ্ব ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে ভোটে জয়ী হওয়ার পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় জাতির পিতা বজ্রকণ্ঠে পাকিস্তানি শোষকদের রুখে দেওয়ার আহ্বান জানান। পাকিস্তানের এই শোষকেরা হত্যা, নির্যাতন ও অবিচারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও বাংলার মানুষের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে তারা বেছে নেয় ইতিহাসের নিকৃষ্টতম গণহত্যার পথ। বাংলাদেশের মানুষের দুর্বিষহ সেই জীবনের কথা জর্জ হ্যারিসন বর্ণনা করেছেন তার 'বাংলাদেশ' গানের মাধ্যমে। এই গণহত্যা ও শোষণের মাধ্যমেও বাংলার মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারেনি পাকিস্তানি শোষকেরা। উল্টো শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সকলের সামনে নিজেদের মাথা নত করে এই বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। বিশ্বের ইতিহাসে এর আগে কখনো কোনো সেনাবাহিনী এভাবে আত্মসমর্পণ করেনি! এমন ঐতিহাসিক এক ঘটনার মাধ্যমে বিশ্বের বুকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাংলাদেশ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা