kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

আসন শূন্য করে বিদায় অভিনেতার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:৩১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আসন শূন্য করে বিদায় অভিনেতার

জন্ম : ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ মৃত্যু : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১

তিনি নায়ক নন, কখনো খলনায়ক, কখনো বা কৌতুক অভিনেতা; কিন্তু তাঁর সময়ের প্রায় সব চলচ্চিত্রে ছিলেন অনিবার্য চরিত্র। দুর্দান্ত অভিনয়ের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের হূদয় জয় করা অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান (৮০) আসন শূন্য করে চলে গেলেন। সেই ষাটের দশক থেকে চার শতাধিক চলচ্চিত্রের বহু চরিত্রকে অমর করে গেছেন তিনি। অভিনেতার পাশাপাশি পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার ও গল্পকার হিসেবেও তিনি সুনাম কুড়িয়েছেন। সব মিলিয়ে ছয় দশকের ক্যারিয়ারে নিজের নামকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন তিনি।

গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর সূত্রাপুরের বাসায় তিনি ঘুমের মধ্যে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলে জানিয়েছেন তাঁর ছোট ভাই সালেহ জামান। সকালে পরিবারের সদস্যরা নাশতার জন্য ডাকতে গিয়ে বুঝতে পারেন, তাঁর ঘুম আর ভাঙবে না। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।

গতকাল বাদ জোহর পুরান ঢাকার নারিন্দায় পীর সাহেব বাড়ি জামে মসজিদে প্রথম জানাজা এবং বাদ আসর সূত্রাপুর মসজিদে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে বড় ছেলের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় এই বরেণ্য অভিনেতাকে।

এ টি এম শামসুজ্জামানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদসহ বিশিষ্টজনরা।

শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘এ টি এম শামসুজ্জামানের মৃত্যু দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশে তাঁর অবদান মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর শোকবার্তায় বলেন, ‘জনপ্রিয় এই শিল্পী তাঁর অসাধারণ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে দেশবাসীর হূদয়ে বেঁচে থাকবেন।’

এ টি এম শামসুজ্জামানের জন্ম ১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে, নানাবাড়িতে। বেড়ে উঠেছেন পুরান ঢাকায় দেবেন্দ্রনাথ দাস লেইনে। শৈশবে মায়ের সঙ্গে হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে দেখতে ভালোবেসে ফেলেন সেই জগৎকে। শুরুর দিকে ছিলেন নাটকের প্রমোটার। ২০ টাকা করে পেতেন। অভিনয় শুরুর পর বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন বাবা। ১৯৬১ সালে উদয়ন চৌধুরীর বিষকন্যা সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজের সুযোগ পান শামসুজ্জামান। পরে নারায়ণ ঘোষ মিতার জলছবি সিনেমার জন্য লেখেন চিত্রনাট্য। সেই সিনেমাতেই অভিষেক ঘটে নায়ক ফারুকের। সিনেমার পর্দায় এ টি এম শামসুজ্জামানের অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৫ সালের দিকে। শুরুর দিকে মূলত কমেডি চরিত্রেই তাঁকে দেখা যেত। ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেনের নয়নমণিতে খল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বোদ্ধাদের নজর কাড়েন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

বৈচিত্র্যময় অভিনয় কুশলতার জন্য প্রবাদপ্রতিম জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এ টি এম শামসুজ্জামান। লাঠিয়াল, অশিক্ষিত, গোলাপী এখন ট্রেনে, পদ্মা মেঘনা যমুনা, স্বপ্নের নায়ক সিনেমায় শামসুজ্জামান যেমন খল চরিত্রে ফ্রেমবন্দি হয়েছেন; তেমনি রামের সুমতি, ম্যাডাম ফুলি, যাদুর বাঁশি, চুড়িওয়ালায় তাঁর কমেডি চরিত্রের কথাও মনে রেখেছে ঢাকাই চলচ্চিত্রের দর্শকরা। ওরা ১১ জন, স্লোগান, সংগ্রাম, সূর্য দীঘল বাড়ি, ছুটির ঘণ্টা, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, পদ্মা মেঘনা যমুনা ও গেরিলার মতো সিনেমাতেও এ টি এম শামসুজ্জামানকে দেখা গেছে নানা ভূমিকায়।

চলচ্চিত্রে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগে ও পরে টেলিভিশনের বহু নাটকে দেখা গেছে তাঁকে। ভবের হাট, রঙের মানুষ, ঘর কুটুম, বউ চুরি ও শতবর্ষে দাদাজান তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

অভিনয়ের জন্য আজীবন সম্মাননার পাশাপাশি পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন এ টি এম শামসুজ্জামান। ১৯৮৭ সালে কাজী হায়াতের ‘দায়ী কে’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান শামসুজ্জামান। এরপর ১৯৯৯ সালের ম্যাডাম ফুলি, ২০০১ সালের চুড়িওয়ালা, ২০০৯ সালের মন বসে না পড়ার টেবিলে সিনেমায় অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। ২০১২ সালের চোরাবালি সিনেমার জন্য পান পার্শ্বচরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার। আর ২০১৭ সালে ৪২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাঁকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। অভিনয়ের জন্য তাঁর প্রথম পুরস্কার ছিল বাচসাস পুরস্কার। ২০১৫ সালে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

একুশে পুরস্কার নিতে প্রথমে আপত্তি জানিয়েছিলেন এ টি এম শামসুজ্জামান। এর পেছনে কষ্ট ছিল, ক্ষোভ ছিল। তাঁর বিশ্বাস ছিল, চলচ্চিত্রের অঙ্গনে তাঁর সঠিক মূল্যায়ন কখনো হয়নি। তাহলে চার শর বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে গেলেন কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে উত্তর ছিল—‘ভাত খাওয়ার জন্য অভিনয় করেছি; শুধু টিকে থাকার জন্য।’

এ টি এম শামসুজ্জামানের মৃত্যুর খবরে শনিবার সকাল থেকেই তাঁর সূত্রাপুরের বাসায় ভিড় করেন সহশিল্পী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। এ সময় অভিনয়শিল্পী আনোয়ারা বলেন, ‘তিনি যেহেতু খল চরিত্রে অভিনয় করতেন, অনেকেই তাঁকে খারাপ মানুষ মনে করতেন। এ টি এম শামসুজ্জামান মানুষ হিসেবে অনেক ভালো ছিলেন। আর অভিনেতা হিসেবে ছিলেন অসাধারণ।’

অভিনেতা মীর সাব্বির বলেন, “আমার সুযোগ হয়েছে তাঁর সঙ্গে অভিনয় করার। ‘নোয়াশাল’ নাটকে আমরা দীর্ঘ আট বছর কাজ করেছি। তাঁকে নিয়ে আমার কথা বলার যোগ্যতা নাই।”



সাতদিনের সেরা