kalerkantho

সোমবার । ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭। ১ মার্চ ২০২১। ১৬ রজব ১৪৪২

বঙ্গবন্ধু ছবির সেটে মুম্বাইয়ে একদিন

মুম্বাইয়ের ফিল্ম সিটিতে চলছে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের বহুল আলোচিত বায়োপিক ‘বঙ্গবন্ধু’র শুটিং। মুম্বাইয়ে গিয়ে শুটিং দেখে এসেছেন জেরিন হোসেন   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১২:৫১ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বঙ্গবন্ধু ছবির সেটে মুম্বাইয়ে একদিন

পেছনে সবুজ ও কালো কাপড় দেওয়া। লেকের মধ্যে নদীর আবহ তৈরি করে চলছে শুটিং

তখন সকাল ১০টা। মুম্বাইয়ের গোরেগাঁওতে ফিল্ম সিটির প্রধান প্রবেশপথে পৌঁছতেই গাড়ি থামাল রক্ষীরা। ‘কোথায় যাবেন?’ বললাম, পরিচালক শ্যাম বেনেগালের ‘বঙ্গবন্ধু’ ছবির সেটে। ‘বঙ্গবন্ধুর সেট তো ছয়-সাতটা জায়গায় পড়েছে। আপনি কোনটায় যাবেন?’ একটু ঘাবড়ে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি দেখে রক্ষী নিজেই পরামর্শ দেন, ‘এক কিলোমিটারের মতো এগিয়ে গিয়ে গেট নম্বর দুইয়ের বাঁ দিকে দেখবেন আবু ভিলেজ, ওখানেই প্রথম সেট। সেখানে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন টিম আজকে কোথায় কাজ করছে।’

এগিয়ে গেলাম আবু ভিলেজের দিকে। ঢোকার মুখেই ‘বঙ্গবন্ধু’ ছবির বোর্ড। গ্রামের ভেতরে ঢুকে দেখি প্রডাকশন টিমের কিছু লোক ছাড়া তেমন কেউই নেই। আর সেই সেটও ভেঙে ফেলা হচ্ছে। গ্রামবাংলার পরিচিত কুঁড়েঘর, খড়ের গাদা—সরিয়ে ফেলা হচ্ছে সব। দু-একজনের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, আগের দিনও এখানে টুঙ্গিপাড়া গ্রামের দৃশ্য শুট করা হয়েছে। আজ শুটিং হচ্ছে নৌকার ঘাটে। ছবির সব কলাকুশলী সেখানেই রয়েছেন। কিন্তু ঘাটটা কোথায়? একজন বললেন, “এখান থেকে সোজা ফিল্ম সিটির ৩ নম্বর গেটের দিকে চলে যান। একটু এগোলেই দেখবেন রাস্তা দুই দিকে চলে গেছে। বাঁ দিকেরটা ধরে এগিয়ে যাবেন, পাহাড়ের ওপর দেখবেন মারাঠি ‘বিগ বস’-এর সেট। তারপর ঢাল বেয়ে নামলেই ডাউন লেক শুটিং স্পট, ‘বঙ্গবন্ধু’ আজকে ওখানেই।”

কথামতো সেই লেকের ধারে পৌঁছে দেখি বিশাল সেট! প্রায় শ তিনেক লোকের সমাগমে জায়গাটা গমগম করছে। প্রত্যেকে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে ইতিহাস বিনির্মাণের এই ছবির জন্য। আরেকটু এগোতেই পৌঁছে গেলাম নৌকার ঘাটের সেটে। শুনতে পেলাম পরিচালকের জলদগম্ভীর নির্দেশ, ‘অ্যাকশন!’ যে দৃশ্যটার শুটিং দেখলাম তার জন্য মানসিকভাবে সত্যি প্রস্তুত ছিলাম না। জেলের মধ্যে দীর্ঘ অনশন আন্দোলন সেরে অনেক দিন পর নিজের গ্রামে ফিরছেন শেখ মুজিবুর রহমান। রোগাভোগা, দুর্বল চেহারা। গ্রামের মানুষ তাদের প্রিয় মুজিবকে নিতে এসেছে, আছেন তার বাবা শেখ লুৎফর রহমানও। সবাই ধরাধরি করে ঘাট থেকে স্ট্রেচারে করে ওপরে তুলে আনল বঙ্গবন্ধুকে। ঘাটে ভিড়ে রয়েছে কয়েকটি নৌকা। ওপরে তরিতরকারির হাট, দোকানিরাও সব ফেলে ছুটে গেলেন মুজিবকে দেখতে। পুরো ঘটনাটা চোখের সামনে দেখলাম। মনে হলো এক টুকরা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইলাম যেন। বেশ কয়েকবার টেক হলো এই দৃশ্যের। পরিচালক শ্যাম বেনেগালের মনিটরের পেছন থেকেও উঁকি মারলাম বারকয়েক। শটটি ‘ওকে’ হওয়ার পর ধীরে ধীরে যখন মূল অভিনেতা এগিয়ে এলেন, মনে হলো যেন চোখের সামনে রক্তমাংসের বঙ্গবন্ধুকেই দেখছি। ভালো করে দেখে বুঝলাম, উনি অভিনেতা আরিফিন শুভ। 

লাইন প্রডিউসার সতীশ শর্মা ছুটে এসে জানালেন, এই লুকে ‘বঙ্গবন্ধু’র ছবি ক্যামেরায় ভুলেও তুলতে যাবেন না। চুক্তির দায়বদ্ধতা থাকায় এই মুহূর্তে সেই ছবি প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে বঙ্গবন্ধুর চেহারাটা ধরে রাখলাম মনের ক্যামেরাতেই। ডিলিট করে দিলাম মোবাইলে তোলা ছবি।

আরিফিন শুভ যখন এসে বসলেন, কথা বলছিলেন খুব দুর্বল গলায়। পরে যেটা বুঝলাম, অনশনে ক্লান্ত বঙ্গবন্ধুর চেহারাটা ফুটিয়ে তুলতেই তিনি দুর্বল রোগীদের মতো হাঁটাচলা করছেন এবং সেভাবেই স্তিমিত গলায় কথা বলছেন। আগের রাত থেকে কোনো খাবার খাননি, এমনকি পানিও না। পাশেই এসে বসলেন বঙ্গবন্ধুর বাবা লুৎফর রহমানরূপী চঞ্চল চৌধুরী। লম্বা দাড়ির মেকআপে প্রথমে তাঁকেও চিনতে পারিনি। পরের দৃশ্য শুটিংয়ের প্রস্তুতি চলছে। এর এক ফাঁকে দু-চারটা কথা বলার সুযোগ হলো পরিচালক শ্যাম বেনেগালের সঙ্গেও। আমি বাংলাদেশের মেয়ে শুনে বললেন, ‘আপনার দেশের অভিনেতারা তো সবাই দারুণ কাজ করছেন!’ মুম্বাইয়ে এখন মূলত শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের প্রথম দিককার কাজগুলোই হচ্ছে। এখানকার পর্ব মিটলে ছবির বাকি শুটিং বাংলাদেশে হবে, সেটাও জানালেন। বললেন, হয়তো সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে পুরো টিম ঢাকায় চলে যাবে।

‘মুজিববর্ষ’ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপিত হবে এই ২০২১ সালে। ফলে এ বছরের মধ্যেই ছবি শেষ করতে চান শ্যাম বেনেগাল। তবে মুক্তি পেতে পেতে ২০২২ সাল চলে আসতে পারে, এমনও ইঙ্গিত দিলেন। এরই মধ্যে আলোচনায় যোগ দিলেন বাংলাদেশের বাহাউদ্দিন খেলন, যিনি ছবির সহকারী পরিচালক। পেয়ে গেলাম অন্যতম চিত্রনাট্যকার শামা জাঈদিকেও। তিনি জানালেন, কিভাবে গবেষণা করে এবং শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার ‘ইনপুট’ নিয়ে তিল তিল করে লেখা হয়েছে চিত্রনাট্য। বাংলাদেশে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র শেখ রাসেলের খেলার সঙ্গীর সঙ্গেও কথা বলে এসেছেন তাঁরা।

দেখতে দেখতেই দুপুর গড়াল, লাঞ্চ ব্রেকের ঘোষণা এলো। বেশ কয়েকটা তাঁবুতে খেতে বসে গেলেন কলাকুশলীরা। একটা তাঁবুতে ঢুকে শুটিং টিমের সঙ্গে লাঞ্চ সারলাম। সাদামাটা সুস্বাদু মারাঠি খাবার। মুরগি, সবজি, খিচুড়ি, রুটি—এই সব। এরই মধ্যে খেলন ভাই কিভাবে যেন বাঙালি অভিনেতাদের জন্য মাছের ব্যবস্থাও করে ফেলেছেন। দিলারা জামান, গাজী রাকায়েত ও খায়রুল আলম সবুজের মতো অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ভোজ সারলেন সেই মাছের ঝোল দিয়েই। তাঁরা প্রত্যেকেই ছবিতে নানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছেন, দিলারা জামান করছেন বঙ্গবন্ধুর মা সায়েরা খাতুনের চরিত্র।

মধ্যাহ্নভোজের সময়ই আলাপ হলো প্রবীণ ভারতীয় বাঙালি অভিনেতা মাসুদ আখতারের সঙ্গে। ছবিতে তিনি টুঙ্গিপাড়ার এক পাগলের ভূমিকায় আছেন। যেদিন তাঁর শুটিং থাকে না, সেদিন প্রডাকশনের কাজে সাহায্য করেন। ‘আমার চরিত্রটা গ্রামের এক পাগলের, যে মুজিবকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। রাজনীতি-ফাজনীতি অত ভালো বোঝে না; কিন্তু যেখানেই মুজিবের মিটিং হয়, দলের পতাকা নিয়ে সে দৌড়ে যায়। অন্য সময় বাজারে, মন্দিরে বা মসজিদে পড়ে থাকে।’ বললেন মাসুদ আখতার।

এরই মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্রসংবলিত টি-শার্ট পরিহিত এক যুবক এসে ঘোষণা করলেন, “লাঞ্চের পর সেটেই কেক কাটা হবে। কারণ আজ আমাদের ‘হিরো’ আরিফিন শুভর জন্মদিন!” এরপর পরিচালকের তাঁবুতেই সব কলাকুশলী উদযাপন করলেন নায়কের জন্মদিন। অভিনয়শিল্পীরা কস্টিউম ও লুক পাল্টে দ্রুত চলে এলেন। দুটি কেক রাখা হয়েছিল। একটায় ছিল বঙ্গবন্ধুর নাম, অন্যটায় আরিফিন শুভ ও ছবির আরেক শিল্পীর নাম, তাঁরও জন্মদিন ২ ফেব্রুয়ারি। কেক কাটার পর বার্থডে বয়-দের সবাই আদর করে গালে সেটা মাখিয়ে দিলেন। শুভর সঙ্গে সেলফি তোলার ধুম পড়ে গেল। এর পরই হোটেলে ফিরে গেলেন শুভ। যাওয়ার আগে বললেন, পুরো ছবিটা তাঁকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তিনি যেন বঙ্গবন্ধুর ছায়াতলেই আছেন। শুভ বলেন, ‘একটা ঘোরের মধ্যে আছি। ঘোরটা কাটলে হয়তো অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব। এমন একটা ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি, পাগল করে দেওয়ার মতো ভালোলাগা। বোধ হয় ভালো করে বুঝেও উঠতে পারছি না আমার জীবনে ঠিক কী ঘটে চলেছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রে আমি অভিনয় করছি, এটা এখনো বিশ্বাসই হচ্ছে না। শ্যাম বেনেগালের মতো বরেণ্য পরিচালক, বাংলাদেশের বড় বড় গুণী শিল্পী অভিনয় করছেন এখানে আর এই পুরো টিমটা, সহকারী পরিচালক থেকে শুরু করে কস্টিউম টিম, ক্যামেরা ইউনিট—সবার এত ভালোবাসা পেয়ে আমি অভিভূত।’

বঙ্গবন্ধুর বাবার ভূমিকায় অভিনয় করা চঞ্চল চৌধুরীর শুটিং শেষ। দুই দিন বাদেই তিনি ঢাকায় ফিরে যাবেন। শ্যাম বেনেগালের মেয়ে পিয়া বেনেগাল ছবির পোশাক ডিজাইন করছেন, তিনিও এসে এক ফাঁকে শিল্পীদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিলেন। সেই আড্ডা শেষ হতে হতে বিকেল। পরের শুটিং কোথায় কিভাবে হবে, সেটা জানার জন্য অদম্য কৌতূহল থাকলেও বিদায় নিতে হলো। কিন্তু সেলুলয়েডের পর্দায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শেষ পর্যন্ত কোন রূপে ধরা দেবে, সেটা দেখার আগ্রহটা বেড়ে গেল বহুগুণে!


ট্রাংকভর্তি প্রপস। পাশে হ্যাঙ্গারে টাঙানো শিল্পীদের পোশাক


​শুটিংয়ের আগে ও পরে সারাক্ষণ এই পোশাকেই থাকছেন আরিফিন শুভ। তবে শুভ জানিয়েছেন, ছবিতে তাঁকে এই পোশাকে দেখা যাবে না


​ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির ডামি

ডামি অনুযায়ী চলছে বাড়ি তৈরি কাজ

মেকআপ তুলে এলেন চঞ্চল চৌধুরী, পাশে প্রতিবেদক জেরিন হোসেন

শ্যাম বেনেগালকে কেক খাওয়াচ্ছেন শুভ। পাশে দিলারা জামান, চঞ্চল চৌধুরীসহ অন্যরা

ঘাটে নৌকা, পারে দোকানপাট। অনশন থেকে ফিরে এই নৌকায় তোলা হবে ‘মুজিব ভাই’কে

কেকের ওপর লেখা ‘হ্যাপি বার্থডে আরিফিন বঙ্গবন্ধু’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা