kalerkantho

সোমবার। ৪ মাঘ ১৪২৭। ১৮ জানুয়ারি ২০২১। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সুর শুধু ছড়িয়েছে সৌরভ

দাউদ হোসাইন রনি   

১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০৮:৩০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সুর শুধু ছড়িয়েছে সৌরভ

‘প্লিজ গিভ আস রুনা লায়লা, অ্যান্ড টেক অল দ্য ওয়াটার অব ফারাক্কা’—বাংলাদেশ সরকারের কাছে এমন আবদার করে সত্তরের দশকে দিল্লির একটি পত্রিকায় লিখেছিলেন নামি সাংবাদিক খুশবন্ত সিং। রুনা লায়লাকে নিয়ে উপমহাদেশজুড়ে তাঁর ভক্তদের যেসব উন্মাদনার ঘটনা আছে, খুশবন্ত সিংয়ের লেখাটি তার মধ্যে অন্যতম। 

মিউজিক ভিডিওর এই যুগে অনেকেই বলে, গান এখন আর শুধু শোনার নয়, দেখারও। অথচ পাঁচ দশক আগেই রুনা লায়লা নিজের পারফরম্যান্স স্টাইল দিয়ে কথাটি প্রমাণ করেছিলেন। মঞ্চে জড়সড় হয়ে কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে তিনি গাইতেন না কখনোই। এখনো তিনি হাত নেড়ে, কোমর দুলিয়ে দর্শকের চোখে চোখ রেখে গান করেন। তাঁর আগে উপমহাদেশের আর কোনো শিল্পীই এভাবে গাইতেন না। দিল্লির কনসার্ট দেখে এসে পত্রিকায় সেই কথাও লিখেছিলেন খুশবন্ত সিং।

শুধু উপমহাদেশ নয়, ৫৫ বছরের শিল্পীজীবনে পৃথিবীর প্রায় সব বড় শহরে গিয়ে গেয়েছেন কিংবদন্তি এই গায়িকা। বাংলা, উর্দু, হিন্দি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, বেলুচ, পশতু, ফারসি, আরবি, মালয়, জাপানি, স্প্যানিশ, ফরাসি, লাতিন, ইংরেজিসহ ১৮টি ভাষায় ১০ হাজারেরও বেশি গান কণ্ঠে তুলেছেন তিনি। গিনেস রেকর্ড বুকেও নিজের নাম তুলেছেন। সত্তরের দশকের শুরুতে পাকিস্তানের করাচিতে তিন দিনে ‘গজল অওর গীত’ অ্যালবামের ৩০টি গান লাইভ রেকর্ড করেছিলেন। বাদ্যযন্ত্রীরা বাজিয়েছেন আর তিনি গেয়েছেন। রেকর্ডের পর আর কোনো ধরনের বাদ্য মেশানো হয়নি।

বাংলাদেশের জন্মেরও পাঁচ বছর আগে উর্দু ছবি ‘জুগনু’-তে প্রথম গান করেন ১২ বছর বয়সের ছোট্ট রুনা। বাবার কর্মসূত্রে করাচিতে বড় হয়েছেন। অল্প বয়সেই উর্দু ছবির গানে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত গেয়েছেন শতাধিক উর্দু, পাঞ্জাবি ও পশতু ছবির গান। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয় ‘উনকি নজরোঁ সে মোহাব্বাত’, ‘জানেমান ইতনা বাতা দো’, ‘দিনওয়া দিনওয়া’, ‘হামে খো কর’, ‘কাটে না কাটায়’ গানের কথা। তাঁর নামে পাকিস্তানের সরকারি টিভি চ্যানেল পিটিভিতে শো হতো ‘বাজমে লায়লা’ নামে।

বলিউডে রুনা লায়লা প্রথম কণ্ঠ দেন কল্যাণজি-আনন্দজির সুরে ‘এক সে বড়কার এক’ [১৯৭৬] ছবিতে। পরে গেয়েছেন ‘ঘারোন্দা’, ‘জান-ই-বাহার’, ‘ইয়াদগার’, ‘ঘর দুয়ার’, ‘অগ্নিপথ’ ও ‘সাপ্নো কা মন্দির’ ছবিতে। বলিউডের ছবিতে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাবও তিনি পেয়েছিলেন কয়েকবার। বি আর চোপড়া, রাজ কাপুরদের প্রস্তাবে তখন রাজি হননি রুনা লায়লা। তবে অভিনয় তিনি করেছেন, চাষী নজরুল ইসলামের ছবি ‘শিল্পী’তে [১৯৯৭] আলমগীরের সঙ্গে।

১৯৮২ সালে বাপ্পী লাহিড়ীর সুরে অ্যালবাম ‘সুপার রুনা’ মুক্তির প্রথম দিনেই এক লাখ কপি বিক্রি হওয়ায় পেয়েছিলেন গোল্ডেন ডিস্ক অ্যাওয়ার্ড। এ ছাড়া ভারতে পেয়েছিলেন সায়গল পুরস্কার, দাদা সাহেব ফালকে সম্মাননা, তুমি অনন্যা সম্মাননা। পাকিস্তানের নিগার পুরস্কার পেয়েছিলেন দুইবার। বাংলাদেশে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারসহ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন সাতবার।

রুনা লায়লার পর গানে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন একজন রক গায়ক—ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। ভক্তরা অবশ্য তাঁকে ‘গুরু’ বলেই ডাকে। গায়ক হবেন বলে কিশোর বয়সে বাবার সঙ্গে অভিমান করে ঘর ছেড়েছিলেন। চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে গিয়ে ওঠেন তিনি। সেখানকার বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘ফিলিংস’। এরপর গড়েন ‘নগর বাউল’। জেমসের খোলা গলার গানে অদ্ভুত এক মায়া, সেই মায়ার জালে জড়িয়ে পড়ল সারা দেশের যুবসমাজ। কনসার্টে তাঁর ভক্তদের উন্মাদনা দেখার মতো। 

তিনি যখন ‘লেইস ফিতা লেইস’ বলে গলা ছাড়েন, কনসার্টে উপস্থিত একজন শ্রোতাও গলা না মিলিয়ে থাকতেই পারে না। শুধু বাংলাদেশ নয়, ওপার বাংলায়ও জেমসের বিশাল ভক্ত-শ্রোতা। ভারতের বাঙালি সংগীত পরিচালক জেমসকে নিয়ে বাজি ধরলেন বলিউডে। ২০০৫ সালে অনুরাগ বসুর ‘গ্যাংস্টার’-এ গাওয়ালেন ‘ভিগি ভিগি’। কলকাতার ব্যান্ড ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র বিখ্যাত গান ‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে’র সুরে হিন্দি গানটিকে অন্য মাত্রা দিলেন জেমস। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বলিউড টপচার্টের শীর্ষে ছিল ‘ভিগি ভিগি’। ছবির প্রযোজক মহেশ ভাট এক সাক্ষাৎকারে জেমসকে নিয়ে বললেন, ‘তাঁর গায়কির ভক্ত না হয়ে থাকা যায় না। জেমস আমার চোখে দক্ষিণ এশিয়ার জিম মরিসন। এমন গায়ক এই তল্লাটে নেই।’

পরের বছরই প্রীতমের সুরে গাইলেন মোহিত সুরির ‘ওহ লামহে’-তে ‘চল চলে আপনে ঘর’। যথারীতি তুমুল সাড়া ফেলল গানটি। অনুরাগ বসু তাঁর পরের ছবি ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’-তে জেমসকে দিয়ে গাওয়ালেন দুটি গান—‘আলবিদা’ ও ‘রিশতে’। শুধু তা-ই নয়, ছবিতে অভিনয়ও করালেন জেমসকে দিয়ে। বলিউডের কল্যাণে সারা পৃথিবীর মানুষ চিনল বাংলাদেশের এই গায়ককে। এরপর বিরতি। ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’র ছয় বছর পর গাইলেন ‘ওয়ার্নিং’-এ ‘বেবাসি’।

বলিউড ছবিতে জেমসের গান রাখার একটি সীমাবদ্ধতার কথা বললেন মহেশ ভাট। তিনি বলেন, ‘জেমসের গায়কির সঙ্গে ঠোঁট মেলানোর মতো অভিনেতা পাচ্ছি না, নইলে প্রতিটি ছবিতে ওর গান রাখতাম!’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা