kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বহির্বিশ্বে তাঁদের সৌরভ

দাউদ হোসাইন রনি   

১৩ জানুয়ারি, ২০২১ ১২:১৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বহির্বিশ্বে তাঁদের সৌরভ

শবনম, ববিতা, ফেরদৌস ও জয়া আহসান। ফাইল ছবি

অভিনয়ে বাংলাদেশের অনেকেই নাম করেছেন, পেয়েছেন তারকাখ্যাতি। অভিনয়ের নিজস্ব রীতিও তৈরি করেছেন কেউ কেউ। তবে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুরভি ছড়াতে পেরেছেন খুব কম শিল্পীই। শবনম, ববিতা, ফেরদৌস ও জয়া আহসান—ব্যস, এই চারটি নামই আছে।

শবনমের ক্যারিয়ারের প্রথম ও শেষ ছবি বাংলায়—‘হারানো দিন’ [১৯৬১] ও ‘আম্মাজান’ [১৯৯৯]। মাঝের চার দশকে তিনি অভিনয় করেছেন ১৭০টি চলচ্চিত্রে। এর মধ্যে বাংলা ছবি মাত্র ১৪টি। ১৫২টি উর্দু এবং চারটি পাঞ্জাবি ছবি। চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক এহতেশামের ‘এই দেশ তোমার আমার’-এ ছোট্ট একটা চরিত্রে। ‘হারানো দিন’-এ তিনি প্রথম নায়িকা হন। ১৯৬২ সালে করেন উর্দু ছবি ‘চান্দা’। এই ছবি দিয়েই পশ্চিম পাকিস্তানে তুমুল জনপ্রিয়তা পান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পর স্বামী রবিন ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে ভিসা না দেওয়ার জন্য পাকিস্তান সরকারকে অনুরোধ করেন ললিউডের নির্মাতারা। নির্মাতারা আশঙ্কা করেছিলেন, একবার দেশে গেলে আর পাকিস্তানে ফিরবেন না শবনম। পরে সবাইকে আশ্বস্ত করেন শবনম, মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে তিনি শিগগিরই তাঁর ভক্তদের কাছে ফিরবেন। কথা রেখেছেন ঝর্ণা বসাক [তাঁর আসল নাম]। ফিরে গিয়ে আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ললিউডের এক নম্বর নায়িকার আসন রেখেছেন নিজের দখলেই। নাদিম বেগ, ওয়াহিদ মুরাদসহ বেশ কয়েকজন নায়কের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল তাঁর জুটি। এ সময় ডাক পেয়েছিলেন বলিউডের যশরাজ ফিল্মসের ছবিতেও। কিন্তু যুক্তরাজ্যে গিয়ে শুটিং করতে হবে বলে ছবিটি ছেড়ে দেন তিনি। শবনম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের ভালোবাসা যেমন পেয়েছেন, তেমনি পেয়েছেন পুরস্কার। পাকিস্তানের জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন তিনবার। সম্মানসূচক নিগার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন ১৩ বার। এই রেকর্ড এখনো কেউ ভাঙতে পারেনি। এ পর্যন্ত ললিউডের ২৩টি ছবি হীরক জয়ন্তী উদযাপন করেছে। এর মধ্যে ১২টিরই নায়িকা শবনম।

বড় বোন সুচন্দা অভিনেত্রী, বোনজামাই জহির রায়হান বাংলা চলচ্চিত্রের এক দিকপাল। তাঁদের হাত ধরে কিশোরী বয়সেই অভিনয়ে এলেন ববিতা। ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুতেই অস্কারজয়ী ভারতীয় বাঙালি পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘অশনি সংকেত’-এর নায়িকা করেন ববিতাকে। এর পরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে তাঁর। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর চিত্রগ্রাহক নিমাই ঘোষকে ঢাকায় পাঠান সত্যজিৎ রায়। এফডিসিতে দেড়-দুই শ ছবি তুলে নিয়ে যান তিনি। সেই ছবি দেখে প্রাথমিকভাবে ‘অনঙ্গ বউ’ চরিত্রে নির্বাচন করেন সত্যজিৎ রায়। পরে বড় বোন সুচন্দাকে সঙ্গে নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দেখা করে অডিশন দিলেন। পরের ইতিহাস তো সবারই জানা। সেই ছবি বার্লিনে পেল গোল্ডেন বিয়ার, ভারতে পেল সেরা আঞ্চলিক ছবির স্বীকৃতি। এর পরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে ববিতার নাম। ১৯৭৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার চালু হলে টানা তিন বছর সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান ববিতা। বাংলাদেশি ছবি ‘বসুন্ধরা’, ‘লাঠিয়াল’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, ‘ডুমুরের ফুল’, ‘দহন’, ‘হারজিত’ নিয়ে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের উৎসবে গেছেন। ছবিগুলো রাশিয়ার বিভিন্ন হলেও স্থানীয় ভাষায় ডাবিং করে চালানো হতো। সেখানকার অনেক দর্শকই সত্তরের দশকের ববিতাকে চিনত। এক সাক্ষাৎকারে ববিতা নিজেই সেই তথ্য দিয়েছেন। ‘অশনি সংকেত’-এর পর বলিউডের ছবিতে ববিতাকে নায়িকা করার অনেক প্রস্তাব এসেছিল সত্যজিৎ রায়ের কাছে। সেই প্রযোজকদের ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন সত্যজিৎ। মুম্বাই গিয়ে থাকার মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি তখন ছিল না বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ববিতা। তবে যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘দূর দেশ’ করেছিলেন। হিন্দিতে ছবিটা মুক্তি পায় ‘গেহরি চোট’ নামে। বলিউডের শশী কাপুর, শর্মিলা ঠাকুর, রাজ বব্বর, পারভিন ববি আর পাকিস্তানের নাদিম বেগ ছিলেন তাঁর সহশিল্পী। ‘নাদানি’, ‘আপস’, ‘মিস ব্যাংকক’সহ বেশ কিছু পাকিস্তানি ছবিতেও অভিনয় করেছেন। পুরস্কৃত হয়েছেন সেখানেও।

বাসু চ্যাটার্জির ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ দিয়ে সবাই চিনল ফেরদৌসকে। এই বাংলা ওই বাংলা—দুই বাংলায়ই। তবে ফেরদৌস সবচেয়ে বড় চমকটা দেখিয়েছেন হিন্দি ছবির নায়ক হয়ে। ইকবাল দুররানির ‘মিট্টি’ মুক্তি পেয়েছিল শাহরুখ খানের ‘অশোকা’র সঙ্গে। ২০০১ সালের ২৬ অক্টোবর মুক্তি পাওয়া ছবিটি বক্স অফিসে একেবারেই চলেনি তাতে কী! প্রথমবার বাংলাদেশের কেউ বলিউডের মূলধারার ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন, এটা তখন বিশাল একটা ব্যাপার। বলিউডে ঠাঁই না হলেও টালিগঞ্জে ঠিকই ঠাঁই পেলেন ফেরদৌস। জিৎ-দেবরা উঠে আসার আগে প্রায় ৩৫টি ভারতীয় বাংলা ছবির নায়ক হয়েছেন ফেরদৌস। ফেরদৌস-ঋতুপর্ণার জুটি তখন হিট। বক্স অফিসে তখন ফেরদৌসের মূল লড়াইটা হতো প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় মডেল-অভিনেত্রী জয়া আহসান। তাঁর অভিনয় প্রতিভার ঝলক টিভি নাটকের দর্শক দীর্ঘদিন দেখেছে। ‘গেরিলা’, ‘ডুবসাঁতার’, ‘চোরাবালি’র মতো ছবি করেছেন। তবে বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাঁর প্রতিভার মূল্যায়ন করতে পারেননি। জয়াকে নতুন করে আবিষ্কার করেন ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের নামকরা পরিচালকরা। রীতিমতো তাঁদের করে নিয়েছেন জয়াকে। অরিন্দম শীলের ‘আবর্ত’ [২০১৩] দিয়ে শুরু। এরপর সৃজিত মুখার্জির ‘রাজকাহিনী’, কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘বিসর্জন’ ও ‘বিজয়া’, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর ‘ভালোবাসার শহর’, নন্দিতা রায়-শিবপ্রসাদ মুখার্জি জুটির ‘কণ্ঠ’ এবং অতনু ঘোষের ‘রবিবার’—প্রতিটি ছবিতে দর্শক জয়াকে আবিষ্কার করেছে নতুন রূপে। পুরস্কারও পেয়েছেন। বাংলাদেশের জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন চারবার। মাদ্রিদ উৎসবে সেরা অভিনেত্রী হয়েছেন ‘রবিবার’-এ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা