kalerkantho

শনিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৮ সফর ১৪৪২

দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে আলাউদ্দিন আলী

দাউদ হোসাইন রনি   

১০ আগস্ট, ২০২০ ০২:৩৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে আলাউদ্দিন আলী

জন্ম : ২৪ ডিসেম্বর ১৯৫২ মৃত্যু : ৯ আগস্ট ২০২০

‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়/যে ছিল হৃদয়ের আঙিনায়/সে হারাল কোথায় কোন দূর অজানায়...।’ বিখ্যাত এ গানের সুরকার আলাউদ্দিন আলী আর নেই। সুরের ভুবন ছেড়ে তিনি চলে গেলেন সবার দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে।

রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মৃত্যু হয় ৬৮ বছর বয়সী এই সুরের জাদুকরের। ঢাকাই চলচ্চিত্রের হৃদয়কাড়া বহু গানের এই গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের প্রদাহ ও রক্তে সংক্রমণের সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবরে শোকে মুষড়ে পড়েছে সংগীতাঙ্গন। গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ প্রমুখ।

আলাউদ্দিন আলীর মেয়ে আলিফ আলাউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শনিবার ভোরের দিকে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হলে বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। করোনা টেস্ট করা হয়। আজ (গতকাল) দুপুরে ফল পাই নেগেটিভ। আমরা কিছুটা আশার আলো দেখেছিলাম। কিন্তু বাবার শরীরের পালস পাওয়া যাচ্ছিল না। ক্রমশ অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। চিকিৎসকরাও তেমন কোনো আশার কথা শোনাতে পারলেন না। তবু একটা রিপোর্টের অপেক্ষায় ছিলাম, যেটা আগামীকাল (আজ) পাওয়ার কথা। তার আগেই তো বাবা চলে গেলেন। আমার বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।’

২০১৫ সালে আলাউদ্দিন আলীর শরীরে ধরা পড়ে ক্যান্সার। কয়েক দফা বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন। ব্যাংককের চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানালেন, তাঁর ফুসফুসে একটি টিউমারও রয়েছে। টিউমারসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি ক্যান্সারের চিকিৎসাও চলছিল। সাভারে সেন্টার ফর রিহ্যাবিলিটেশন অব প্যারালাইজড সেন্টারেও চিকিৎসা নিয়েছেন দীর্ঘদিন। তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। এরপর আর ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে। মনোযোগ দিতে পারেননি সংগীতেও।

আট হাজারেরও বেশি গানের সুরকার আলাউদ্দিন আলী। বেশির ভাগ গানই করেছেন চলচ্চিত্রের জন্য। এর বাইরে বিটিভির জন্য করেছেন আধুনিক, দেশাত্মবোধক, লোকজ ও ধ্রুপদি গান। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি চলচ্চিত্রে পূর্ণাঙ্গ সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। চলচ্চিত্রের গান তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর ছিল নিজস্ব ধরন। লোকজ ও ধ্রুপদি গানের সংমিশ্রণে করতেন আলাদা রকমের সুর। তাঁর সেই সুরের জাদু সহজেই কাবু করে ফেলত চলচ্চিত্র দর্শক ও আপামর শ্রোতার হৃদয়। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত প্রায় চার দশকজুড়ে বাংলা গানে তাঁর সুরের জাদু ছড়িয়ে দিয়েছেন। অসংখ্য জনপ্রিয় গান আছে তাঁর। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসত’, ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’, ‘আছেন আমার মোক্তার’, ‘সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী’, ‘কেউ কোনো দিন আমারে তো’, ‘পারি না ভুলে যেতে’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’, ‘বন্ধু তিন দিন তোর বাড়ি গেলাম’, ‘এমনও তো প্রেম হয়’, ‘হয় যদি বদনাম হোক আরো’, ‘যেটুকু সময় তুমি কাছে থাকো’, ‘দুঃখ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়’, ‘ভালোবাসা যতো বড় জীবন ততো বড় নয়’।

পরিচালক আমজাদ হোসেনের সঙ্গে তাঁর জুটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। এই পরিচালকের প্রায় সব ছবিতেই সুর করেছেন আলাউদ্দিন আলী। এই জুটির উল্লেখযোগ্য ছবি ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘ভাত দে’, ‘কসাই’, ‘সুন্দরী’, ‘আদরের সন্তান’।

পুরস্কারও পেয়েছেন অনেক। এর মধ্যে জাতীয় পুরস্কারই পেয়েছেন আটবার। সাতবার পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ সুরকারের পুরস্কার, একবার পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ গীতিকারের। সুরকার, সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি তিনি ছিলেন বেহালাবাদক ও গীতিকার। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বহু স্বনামধন্য শিল্পী তাঁর সুরে গান করে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছেন।

১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে এই সংগীতজ্ঞের জন্ম। বাবা ওস্তাদ জাদব আলী, মা জোহরা খাতুন। দেড় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ঢাকার মতিঝিল এজিবি কলোনিতে চলে আসেন ছোট্ট আলাউদ্দিন। তিন ভাই ও দুই বোনের সঙ্গে সেই কলোনিতেই তাঁর বেড়ে ওঠা। চাচা সাদেক আলীর কাছে সংগীতে হাতেখড়ি। ১৯৬৮ সালে পেশাদার বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে পা রাখেন চলচ্চিত্রে। শুরুতেই পেলেন শহীদ আলতাফ মাহমুদের সান্নিধ্য। প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজের সহকারীও ছিলেন দীর্ঘদিন।

আলাউদ্দিন আলীর দীর্ঘদিনের সহকারী ফোয়াদ নাসের বাবু জানান, আজ সোমবার বাদ জোহর খিলগাঁওয়ের তালতলা মসজিদের সামনে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় জানাজা হবে এফডিসিতে। এরপর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা