kalerkantho

জন্মের পরে জায়গা হয় ডাস্টবিনে, সেই নূপুর জিতলেন ১২ লাখ টাকা

দ্য ওয়াল   

২৮ আগস্ট, ২০১৯ ১৪:১৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জন্মের পরে জায়গা হয় ডাস্টবিনে, সেই নূপুর জিতলেন ১২ লাখ টাকা

জন্মের পরে আস্তাকুঁড়ে জায়গা হয়েছিল যাঁর, তিনিই পৌঁছে গেলেন ভারতের সব চেয়ে বড় গেম শো ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র আসরে! জিতে আনলেন সাড়ে ১২ লক্ষ টাকা!

মৃত সন্তান জন্মেছে। আজ থেকে ২৯ বছর আগে, কানপুরের এক সরকারি হাসপাতালে পরিবারের সদস্যদের এমনটাই বলেছিলেন চিকিৎসকেরা। শোকে-কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন সকলে। হাসপাতালের পেছনে যে ডাস্টবিন, সেখানে ফেলেও দেওয়া হয়েছিল এক রত্তির মৃতদেহ। আচমকাই এক আত্মীয়র চোখে পড়ে যায়, ফেলে দেওয়া সেই ছোট্ট শরীরটা যেন নড়ছে। তাড়াহুড়ো করে তুলে আনা হয় তাকে। জোর করে ডেকে দেখানো হয় ডাক্তারদের, ব্যবস্থা করা হয় চিকিৎসার। অলৌকিকতা ঘটে যায়! প্রাণ ফিরে পায় শিশুকন্যা!

কিন্তু প্রথম কয়েক মিনিটের ওই অবহেলার কারণে, কিছু অসুবিধা থেকে যায় তার। আজীবনের জন্য শারীরিক ভাবে পঙ্গু হয়ে যায় সে। কিন্তু কে জানত, কপালফেরে বেঁচে যাওয়া সেই ‘পঙ্গু’ মেয়েটি ২৯ বছর বয়সে পৌঁছে ডাক পাবে কৌন বনেগা ক্রোড়পতির মঞ্চে! জয় করে নেবে সাড়ে ১২ লক্ষ রুপি!

অমিতাভ বচ্চনের সঞ্চালনায় এই গেম শো ভারতের অন্যতম বড় এবং দামি গেম শো-গুলোর মধ্যে একটা। বিভিন্ন প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলে পাওয়া যায় টাকা। প্রথমে এক হাজার, দু’হাজার দিয়ে শুরু করে, বাড়তে থাকে টাকার অঙ্ক। শেষ অবধি সঠিক উত্তর দিয়ে যেতে পারলে পাওয়া যেতে পারে এক কোটি টাকাও! মাঝখানে ভুল উত্তর দিলে, ফিরতে হয় সেখান থেকেই। তার আগে অবধি যতটা টাকা পাওয়া গিয়েছে, ততটা সঙ্গে করেই। উন্নাও জেলার বাসিন্দা, বিহাগপুরের নূপুর উত্তর দিয়েছেন ১২টি প্রশ্নের। জিতে নিয়েছেন সাড়ে ১২ লাখ টাকা।

কেবিসি ১১ সিজ়নের বৃহস্পতিবারের এপিসোডে আরও ন’জন প্রতিযোগীর সঙ্গে সিলেক্টেড হয়েছিলেন নূপুর। বাকিদের হারিয়ে তিনি কেবিসি-র হট সিটে বসার সুযোগ পান। অমিতাভ বচ্চন নিজে নেমে গিয়ে তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন হট সিটে। হাঁটা চলায় অসুবিধা থাকলেও, নিজের জেদেই কখনও হুইলেয়ারে বসেননি নূপুর। ওয়াকিং স্টিকের সাহায্যের চলা ফেরা করেন বরাবর। অমিতাভ বচ্চন তাঁকে হাত ধরে খানিকটা এগিয়ে আনার পরে, নূপুরের ভাই উঠে আসেন সিট থেকে। কোলে করে তাঁকে বসিয়ে দেন অমিতাভ বচ্চনের সামনের আসনে।

এর পরে অমিতাভ বচ্চন নূপুরকে জিজ্ঞেস করেন, তাঁর জীবনের লড়াইয়ের কথা। তখনই সব বলেন নূপুর। দর্শকদের মধ্যে অনেকেই কেঁদে ফেলেন। আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অমিতাভ বচ্চন নিজেও। কুর্নিশ জানান নূপুরের জীবনকে। এর পরে অমিতাভ প্রশ্ন করেন, নূপুর কেন হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন না। নূপুর উত্তর দেন, স্যার, এক বার যদি আমি হুইলচেয়ারে অভ্যস্ত হয়ে যাই, আমি আর কোনও দিন হাঁটতেই পারব না। চেষ্টাই করব না। তাই শত অসুবিধাতেও আমি জোর করে হাঁটার চেষ্টা করি। এই উত্তর আরও এক বার বিস্মিত করে দেয় অমিতাভ বচ্চনকে এবং দর্শকদেরও।

পেশায় কৃষক রামকুমার সিং ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা স্বাভাবিক ভাবেই উচ্ছ্বসিত তাঁদের মেয়ের এই কীর্তিতে। কল্পনা বলছিলেন, ও পড়াশোনায় ভাল ছিল প্রথম থেকেই। শারীরিক অসুবিধা ওকে পিছিয়ে রাখেনি কখনও। ও শিক্ষিকা হতে চেয়েছিল, প্রথম সুযোগে বি-এড পরীক্ষায় পাশও করে। এখন ও নিজে এক জন শিক্ষক, স্কুলে পড়ায়। তার পরেও বিকেলে মাঠে গরিব ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে টিউশন দেয়।

নূপুরের বাবা বলছিলেন, আমাদের বাড়িতে দেখা হতো, কৌন বনেগা ক্রোড়পতি। যখনই অমিতাভ বচ্চন প্রশ্ন করতেন, নূপুর ঠিক উত্তরটা দিয়ে দিত প্রতিযোগীর আগেই। আমরা এই বার ওকে বলি, কেবিসি-তে যাওয়ার চেষ্টা করতে। ও-ও করে। তখনও অবশ্য জানতাম না, ও সিলেক্টেড হবে। তার পরে যখন হলও, তখনও কি ভেবেছিলাম, এত টাকা নিয়ে আসবে!

তবে এ সবের মাঝেও এখনও ফিরে ফিরে আসে ২৯ বছর আগে, নূপুরের জন্ম নেওয়ার সেই দিনটা! ও তো মরেই গেছিল! ওকে তো ফেলেই দিয়েছিল আস্তাকুঁড়ে। ভাগ্যিস আমাদের এক আত্মীয় ওখানে ছিল, দেখতে পেয়েছিল নূপুর নড়ছে…! তবে এই ঘটনায় চিকিৎসকদের উপরে কোনও ক্ষোভ নেই নূপুরের পরিবারের। নূপুরের শারীরিক ত্রুটির জন্য চিকিৎসকদের দায়ীও করেন না তাঁর পরিবার। মা কল্পনা বলেন, এটা হয়তো ওর ভাগ্যে ছিল। কাউকে কোনও দোষ দেওয়ার নেই। ও যে বেঁচে আছে, এটাই তো অনেক আমাদের কাছে!

সেই ভুল করে বেঁচে যাওয়া মেয়েই আজ সারা গ্রামের চোখে তারকা। নূপুরের বাড়ির বাইরে কৌতূহলী উঁকিঝুঁকি সারা দিন। মেয়ে কখন আসবে, তাকে কী ভাবে অভিনন্দন জানানো হবে, সেই আলোচনাতেই মেতেছে গোটা বিহাগপুর।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা