kalerkantho

শুক্রবার । ২১ জুন ২০১৯। ৭ আষাঢ় ১৪২৬। ১৭ শাওয়াল ১৪৪০

গল্প

আমার কেউ নেই

শ্যামল চন্দ্র নাথ

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



আমার কেউ নেই

অঙ্কন : এসএম রাকিবুর রহমান

কই তুমি, চলো পালাই!

জোছনার গভীর আলোয় কমলের হাতটি ধরে পূজা বের হলো চিরদিনের জন্য। কমলের কেউ নেই, তাই কাউকে কিছু বলার নেই, কারো কথা শোনারও দরকার নেই। এ এক উন্মত্ত স্বাধীনতা, এর নাম কেঁদে উঠে আবার দাঁড়িয়ে যাওয়া। চাঁদের আলোয় মাঠের মধ্য দিয়ে হাঁটছে আর মাঝে মাঝে ফুরফুরে হাওয়ায় তারা কেঁপে উঠছে। পূজার একটাই দোষ—ভোরে তার ঘুম ভাঙে না, রোদ উঠলে ভাঙে। সাত বছর হলো তারা প্রেম করছে। সাত বছরের প্রেমময় জীবনের সময়টা কম নয়! অতীতের ভেতর অতীত হয়ে কাটিয়ে দেওয়া সময়। প্রেমটা খানিক নিস্তরঙ্গ হয়ে গেছে। তবু পালিয়ে যাওয়ায় কোনো বাধা ছিল না। মানুষ মাত্রই মনে মনে প্রথাবিরোধী এবং মানুষ স্বভাবতই স্নায়ুরোগে ভোগে। কমল ও পূজা পালিয়ে যাওয়ার পর খানিক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আনন্দ ও শঙ্কা অনুভব করছে। চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু ও বেদনারাশি ঝরে পড়ছে। তবে এই সম্পর্কের মধ্যে কখনো সংঘাত, কখনো হতাশাও দেখা দিত। হয়তো সংঘাত না জন্মালে যৌবনের নব নব সৌন্দর্য-সজ্জার দরকার পড়ত না। ঠিক যেন কিছু স্বপ্ন ইচ্ছায়, কিছু স্বপ্ন বাস্তবে বাঁচে। ধীরে ধীরে কখন যে প্রেমের আগুন গভীর হয়ে গেছে, কেউ টের পেল না। এ অভ্যাসের ছাঁচ নয়, জীর্ণ মলিন সংসারের ধুলাও নয়। অকস্মাৎ পূজার একটা হাত চেপে ধরে কমল বলল—চুপ করে থেকো না, কিছু বলো। আজ আমাদের অটলতার গৌরব যেমন আছে, আছে দুর্বলতার লজ্জাও। পূজার দীর্ঘ সুঠাম দেহের মহিমা ও মাধুর্য চাঁদের আলোর সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিল। তুমি কিছু বলছ না কেন? তা হয় না, তা হয় না। কমলের কণ্ঠ আবেগে তীক্ষ হয়ে উঠছে। পূজার মধ্যে মিষ্টতার আভা রয়েছে চেহারায়, কণ্ঠস্বরে ও প্রকৃতিতে। কিন্তু তার নির্বাক উপস্থিতি কমলকে শঙ্কিত করে দিচ্ছে। পূজার নড়াচড়া ও কথা বলার কোনো আগ্রহ না দেখে কমল চুপ হয়ে গেল ভয়ে, রাগে, ক্রোধে। পালিয়ে এসে এখন পিঠটান দিতে চাইছে, এ কেমন ভণ্ডামি! মনে মনে ভাবছে কমল। শুধু চেহারা ও পোশাকে অপরিচ্ছন্ন না হলেও কমলের মনেও একটা ক্লান্ত ঔদাসীন্য আছে সব ব্যাপারে। যেন কচুপাতায় পানি আর লজ্জাবতীগাছের নিজের ভেতর স্থির ও অস্থির থেকে ডুব দেওয়া। খানিক পর নীরবতা ভেঙে পূজা বলল—তোমার মন কোথায় লুকিয়ে রেখেছ? এই বলে পূজা যেন একটি ছোট শিশুর মতো দুটি হাতে হাত দিয়ে তার বুকের ওপর কমলকে তুলে নিল। কমল পূজার বুকের ওপর দীর্ঘশ্বাস নিচ্ছে। এখন যেন তাদের চোখে ধুলা ছুড়েছে কেউ, যাতে পূজা ওকে দেখতে না পায়, কমলও ওকে চিনতে না পারে। ঠিক যেন তাদের প্রথম দেখা বৈশাখের ঝড়ের মতো। কমল এখন অন্ধকার দেখতে শুরু করেছে। সেই অন্ধকারের নাম নিষ্ঠুর বাস্তব। তবে এই বাস্তব কোনোমতে দৃষ্টি হরণ করতে পারে না। দৃষ্টিকে পীড়া দিলেও সে প্রতিনিয়ত অতিক্রম করে, ছাড়িয়ে যায়। কমলের ওপর কিছু সত্য ভর করে কয়লা চাপানোর মতো তেজি করে তুলেছে এবং সে বলে—এখন শুধু তোমার কথাই শোনা যাক। পূজা বলল, মনটাকে মানাতে আমার কত সময় লেগে গেল, কিভাবে আমি পারলাম! কমল হাত নেড়ে বলল—না, থাক। তুমিই শুধু পেরেছ, আমি কি কিছুই পারিনি? যেন থমথমে পরিস্থিতি—চলো ফিরে যাই, পূজা।

পূজা খানিক বিস্মিত হয়ে বলে, কেন? বিয়ে করতে চাও না? তুমি তো এমন না, তোমার মধ্যে সত্যের একটা ঝংকার ছিল, গভীরতার একটা সীমা ছিল, যা কেউ ধরতে না পারলেও আমি পারতাম। পূজা চোখে জল এনে চোখ মুছতে মুছতে আবার শিউরে ওঠে। সংগত সন্দেহে মনে হলো, দুঃস্বপ্নে জেগে ওঠে পূজা। চারদিকে দুর্নামের বাতাস বইবে। কপালের দোষে নয়, বিচারের দোষে। সব দায় মনে হয় ব্যাটা ভগবানের, যাকে কেউ দেখেনি। আরে আজেবাজে কথা থামাও—মন—পূজা।

তোমার কি ধর্মভয়ও নেই? পূজা শিউরে উঠল। যেন কোনো কান্না নেই চোখে, বুকে, নিউরনে, মুখে—কোথাও। নীরবে অগ্রহায়ণের বাতাসের মতো হৃদয়ের মধ্যে বইছে সব কিছু। কিন্তু বৈশাখের ঝড়ের মতো বের হচ্ছে লণ্ডভণ্ড-বিধ্বস্ত হয়ে। আমি ছুটি নিতে চাই জীবন থেকে, তোমার কাছ থেকে, মরণ থেকে—ছুটি দেবে তুমি আমাকে? উত্তেজিত, তবে অস্বস্তির দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে অকপট কমল। তুমি আমাকে কী বিশ্বাস করতে বলো? তুমি যা চাও, তাতে তেমন কোনো লাভ হবে না আমাদের। পূজা বিস্ময়ে ও আবেগে আপ্লুত হয়ে কমলকে জড়িয়ে ধরল। ভুলে যাচ্ছ কেন সব প্রতিজ্ঞার কথা, সব আবেগময় উপদেশের কথা। চলো, এখন তাড়াতাড়ি পালাই, ভোর হয়ে গেলে বিপদ হয়ে যাবে। অতঃপর কমল বলল—না, থাক; চলো। কী ব্যাপার! পূজা চঞ্চল হয়ে উঠল। তুমি যা ভাবছ—না না, এ হতেই পারে না এখন। এ অসম্ভব! মা-বাবা টের পেয়ে যাওয়ার আগেই গ্রাম ছেড়ে পালাতে হবে। তাদের মধ্যে থমথমে পরিস্থিতি। কত লোক বিয়ে করছে পালিয়ে—করে সুখীও হচ্ছে। আর আমরা সুখী হব না! কথার সুরটা যেন খানিক বিকৃত হয়ে বের হচ্ছে পূজার কণ্ঠ থেকে। আমার তো কেউ নেই—বলতে বলতে কমলের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো।     মা-বাবা সেই ছোটবেলায় পরপারের ডাকে সাড়া দিয়ে দিয়েছে। একটা আদরের ছোট বোন ছিল, সে-ও আজ নেই। গত হয়েছে গেল মাসে। আবারও কান্নার আবহ তৈরি হবে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজন দুজনের হাত ধরে হাঁটা শুরু করল। গ্রামের সবচেয়ে বড় তালগাছটা পার হয়ে বিলের ধার ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছে তারা। কিছুদূর যাওয়ার পর পূজা আবার দাঁড়িয়ে পড়ে। বড় বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে। চারদিকে শুধু কান্নার শব্দ শুনতে পায় পূজা। বাড়িঘর, রাস্তা, মাঠ, দোকান, নদীর জল, বড় তালগাছটা, গাছপালা ও পাখিরা—সবাই কান্না করছে। ভোর হয়ে আসছে। রাস্তায় উঠতেই তারা একটা সিএনজির দেখা পেল। অনেক পথ হেঁটে তারা ক্লান্ত।

 

শহরে বড় হয়েছে তারা। গ্রামে বেড়াতে এসে পালাল! অদ্ভুত ব্যাপার!

অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো, এমনি অবস্থা যেন নারী ও পুরুষকে রক্ষা করতে পারে না। একজন আরেকজনের হাত হাতের মধ্যে তুলে চুম্বন করল। কিন্তু হাত দুটি শক্ত হয়ে গেছে! তাদের হাতে বিন্দুমাত্র সময় নেই। বারবার মনে হলো, তাদের পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। কোথায় তাদের আশ্রয়? কোথায় তাদের অবলম্বন? তবু তাদের কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তা এবং জ্বলজ্বলে চোখ দুটির ওপর বেদনার বিচ্ছুরণ কেটে আনন্দের সীমাহীন সৌন্দর্য দেখা যায়। ওদিকে আকাশের কাজল-নয়না মেঘ সোনালি রঙের ঘোমটা টেনে বসে আছে। হঠাৎ হাতের অশান্ত ফোনটা বেজে উঠল কমলের। গ্রামের আশিস কাকা তাকে ফোন দিয়েছে। ফোন ধরার কোনো প্রশ্নই তার মনে জাগল না।

কিন্তু এতবার ফোন এলো যে এবার না ধরে পারল না। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বলে উঠল—হারামজাদা, মেয়ে নিয়ে পালালি! পালিয়ে কত দূর যাবি! পুলিশকে বলেছি। পুলিশ তোদের খুঁজছে। এপাশ থেকে কমল কিছুই বলল না, ফোনটা রেখে দিল সুইচ অফ করে। পূজার ফোন আগে থেকেই অফ করা। রক্ত হিম হয়ে এলেও থেমে যাওয়ার মানুষ নয় কমল। পূজা বলে ওঠে—হায় ভগবান, এখন কী হবে!

কিচ্ছু হবে না, পূজা।

কিছু যাতে না হয়, তাহলেই বাঁচি।

আমার ক্ষতি হয়ে যাক, তোমার যাতে কিছু না হয়, কমল। তা না হলে আমি জীবিত থেকেও মৃতের স্বাদ আস্বাদন করব।

কী বলছ এসব তুমি! থামো।

সিএনজি রেলস্টেশনের দিকে খুব জোরেশোরে এগোচ্ছে।

সব চিন্তা ভুলে গিয়ে কমল পূজার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ভাবছে, হঠাৎ কী করে মধ্যবয়সী মেয়েটি একেবারে কিশোরী হয়ে গেছে। আহা রে!

তারা কোথায় পালিয়ে যাবে, তা-ও ঠিক হয়নি। ততক্ষণে সূর্যের মাধুর্য পৃথিবীকে আলিঙ্গন করতে শুরু করেছে।

পূজা বলে উঠল, আমার ভয় করছে।

কিসের ভয়?

কেন, কলঙ্কের?

এই বিপদময় মুহূর্তেও পূজার চোখে-মুখে চকিত বিদ্যুতের মতো একঝিলিক হাসি দেখা গেছে। যদিও আজকাল হাসিও অন্ধ হয়ে গেছে। অস্ফুট গলায় পূজা কমলের নাম ধরে ডাকল—শোনো, যদি আমরা ধরা পড়ে যাই, কখনো আমার মা-বাবা তো মেনে নেবে না। তবু আমি সারা জীবন, এমনকি পরজনমেও তোমাকেই চাইব।

আবার তারা চুপচাপ। রেলস্টেশন চলে এসেছে। তাদের গন্তব্য আপাতত কুষ্টিয়া লালন সাঁইজির আখড়া। কমল লালনের খুব ভক্ত আর পূজা রবি ঠাকুরের। ঢাকায় পালিয়ে তো লাভ নেই। ধরা পড়ে যেতে হবে তাড়াতাড়ি। যেন প্রাণের ভয়ে ভীত দুটি প্রাণী ভালোভাবে পালাতেও পারছে না। সন্দিহান ও অস্বস্তিকর অবস্থায় দুজনই অধৈর্য হয়ে পড়েছে। এ এমন জীবন, যেন ভালোবাসায়ও ভরসা নেই, আবেগেরও মূল্য নেই। কতটা আর বদলেছে মানুষ, কতটা এই সমাজ!

কারো কাছে পরিচয় স্বীকার করতে উভয়েই নারাজ। ট্রেনের কামরায় উঠতেই একজন জিজ্ঞেস করে—বাড়ি কোথায় তোমাদের?

পূজা-কমল দুজন দুজনের দিকে তাকায়।

কমল বলে ওঠে, নিশ্চিন্তপুর আমাদের গ্রামের বাড়ি। আসলে গ্রামের বাড়ি ভবেরচর। আবার মৃত্যুর মতো নিস্তব্ধ হয়ে আসে সব। মুহূর্তগুলো কাটে মৃত্যুর প্রতীক্ষার মতো। ধরা পড়ে গেলেই সব শেষ।

ও আচ্ছা, রেলের কামরায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি আবার বলে ওঠে। কোথায় যাবে তোমরা?

এই তো, সামনে।

কমল উল্টো প্রশ্ন করে—আপনি কোথায় যাবেন?

চাটমোহর, লোকটি উত্তর দেয়।

ট্রেন চলছে তার নিজস্ব গতিতে। ওরা দুজন চলছে পরিচিত লোকচক্ষুর আড়ালে। লোকটি কোথায় যেন অকস্মাৎ হাওয়া হয়ে গেল ট্রেনের অন্য কোনো কামরায়।

আলোর মধ্যেও দুই জোড়া চোখ অবিশ্বাসে-উত্তেজনায় আবার বড় বড় হয়ে উঠল। কিন্তু ট্রেনের জানালায় বইয়ে চলা বাতাসে দুজনের মন দুলতে লাগল।

আশপাশের লোকজন দেখে তারা ক্ষণে ক্ষণে চমকে উঠছে। এই বুঝি ধরা পড়ে গেলাম। অন্তত এক রাত-দুই রাত কাটিয়ে দিলে আর কিছুই হবে না। কমল মনে মনে ভাবছে—তারপর তো পূজা আমার, আমি পূজার। কী সব সহস্র হাবিজাবি চিন্তা ও ভয় মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। পূজা চুপচাপ বসে আছে। কোনো কথা বলছে না। কমল পূজার ছিপছিপে সুন্দর পাখির পালকের মতো হালকা নরম থুতনিটা হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল—চিন্তা কোরো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে তাদের। শুকিয়ে অপরাজিতার কলির মতো নীলচে সাদা হয়ে আছে পূজার মুখ। দেখে কমলের খুব কষ্ট হচ্ছে। অশ্রুসজল চোখ। জল গড়িয়ে পড়বে হয়তো। এমন সময় পূজা বিড়বিড় করে বলে উঠল, তোমাকে না পেলে আমার কী যে হতো! সঙ্গে সঙ্গে কমল ওর গালে একরাশ চুমো খাওয়ার ভান করে দু-একটা ভুরুর শাসনকে উপমায় তৈরি করে ফেলেছে। তবু তাদের ভালো লাগে না। কিছুই ভালো লাগে না। ঝিকঝিক আওয়াজ তুলে ট্রেন চলে যাচ্ছে আঁকাবাঁকা সাপের মতো রেললাইন পেরিয়ে। ট্রেনে হঠাৎ পুলিশের পায়চারি দেখে দম বন্ধ হয়ে আসছে কমলের। মনে হচ্ছে, পুলিশ তাদের দিকে আসছে। পূজা ক্ষণিক আগে কমলের বুকে মাথা রেখেছে। তন্দ্রা পেয়েছে পূজার। জানালার পাশের বাতাসে পূজার রেশমি চুল উড়ছে। আর কমল মনে মনে বলছে—এখন আমাদের কী হবে? আমার কী হবে!

আমার কেউ নেই। তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই।

মন্তব্য