kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

নবম-দশম শ্রেণি

বাংলা দ্বিতীয় পত্র

লুৎফা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক, বিএএফ শাহীন কলেজ, কুর্মিটোলা, ঢাকা

১৭ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাংলা দ্বিতীয় পত্র

শ্রেণিভিত্তিক

গুরুত্বপূর্ণ

অনুচ্ছেদ

শরৎকাল

ভাদ্র-আশ্বিন এ দুই মাস শরৎকাল। ঝকঝকে নীল আকাশে শুভ্র মেঘ, ফুলের শোভা আর শস্যের শ্যামলতায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এ ঋতু। শরতের সৌন্দর্য বাংলার প্রকৃতিকে করে তোলে রূপময়। গাছপালার পত্র-পল্লবে গুচ্ছ গুচ্ছ অন্ধকার ফিকে হয়ে আসতেই পাখপাখালির দল মহাকলরবে ডানা মেলে উড়ে যায় নীল আকাশে। আকাশের উজ্জ্বল নীলিমার প্রান্ত ছুঁয়ে মালার মতো উড়ে যায় সেই পাখির ঝাঁক। নীল আকাশে শিমুল তুলোর মতো ভেসে চলে সাদা মেঘের ভেলা। চারদিকে সজীব গাছপালার ওপর বয়ে যায় শেফালি ফুলের মদির গন্ধভরা ফুরফুরে মিষ্টি হাওয়া। শিউলিতলায় হালকা শিশিরে ভেজা দূর্বা ঘাসের ওপর চাদরের মতো বিছিয়ে থাকে সাদা আর জাফরান রং মেশানো রাশি রাশি শিউলি ফুল। শরতের ভোরের সেই সুরভিত বাতাস মনে জাগায় আনন্দের বন্যা। তাই অতি ভোরেই শিশু-কিশোররা ছুটে যায় শিউলিতলায় ঝরা ফুল কুড়াতে। একটু পরে সূর্য ওঠে সোনার বরণ রূপ নিয়ে। নির্মল আলোয় ভরে ওঠে চারদিক। আমন ধানের সবুজ চারার ওপর ঢেউ খেলে যায় উদাসী হাওয়া। আদিগন্ত শুধু ‘সবুজে সবুজময়’। নদীর তীরে কাশবনের সাদা ফুল কখনো হাতছানি দিয়ে ডাকে। কাশফুলের সেই মনোরম দৃশ্য থেকে চোখ ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ে। ভরা নদীর বুকে পাল তুলে মালবোঝাই নৌকা চলে যায়। ডিঙি নৌকা বাইতে বাইতে কোনো মাঝি হয়তো বা গেয়ে ওঠে ভাটিয়ালি গান। পুকুরপাড়ে আমগাছের ডালে মাছরাঙা ধ্যান করে আর স্বচ্ছ পানিতে পুঁটি, খলসে মাছের রুপালি শরীর ভেসে উঠলে ছোঁ মেরে তুলে নেয় লম্বা ঠোঁটে। নদীর চর চখাচখি, পানকৌড়ি, বালিহাঁস বা খঞ্জনা পাখির ডাকাডাকিতে মুখর হয়ে ওঠে। কলসি কাঁখে মেঠোপথে হেঁটে যায় গাঁয়ের বধূ। ফসলের খেতে অমিত সম্ভাবনা কৃষকের চোখে আনে স্বপ্ন। বিলের জলে নক্ষত্রের মতো ফুটে থাকা সাদা ও লাল শাপলা এক স্বপ্নিল দৃশ্যের আভাস আনে। শরতের এই স্নিগ্ধ মনোরম প্রকৃতি মানবজীবনেও এক প্রশান্তির আমেজ বুলিয়ে দেয়। মাঠভরা সোনার ধান দেখে কৃষকের মনে দানা বেঁধে ওঠে আসন্ন সুখের স্বপ্ন। শহরের মানুষও অবকাশ পেলে শরতের মনোরম প্রকৃতিকে উপভোগ করার জন্য গ্রামের বাড়িতে ছুটে যায়। হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দুর্গাপূজার মহা ধুম পড়ে যায় এ সময়। শরৎ বর্ষার ঠিক পরবর্তী ঋতু বলে এর আগমনে প্রকৃতি থাকে নির্মল ও স্নিগ্ধ। শরতের মতো নীল আকাশ আর কোনো ঋতুতে দেখা যায় না। এ সময় রাতের আকাশে লক্ষ তারার মেলা বসে আর জ্যোত্স্নায় আলোকিত হয় সমস্ত প্রকৃতি। সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলার ঋতু পরিক্রমায় সবচেয়ে মোহনীয় ঋতু-শরৎ।

শৃঙ্খলাবোধ

মানব জীবনের এক কল্যাণমুখী বন্ধনের নাম শৃঙ্খলা। প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শৃঙ্খলার নানা বন্ধন তৈরি করেই মানুষ অর্জন করেছে শ্রেষ্ঠত্ব, নির্মাণ করেছে সভ্যতা। মানুষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জেনেছে, তার প্রতিটি কর্মের জন্য প্রয়োজন হয় সুসমন্বয়ের আর তার জন্য দরকার শৃঙ্খলা। বিশ্ব প্রকৃতির সর্বত্রই রয়েছে নিয়মের রাজত্ব। প্রকৃতির সুশৃঙ্খল নিয়মে সকালে সূর্য ওঠে, সন্ধ্যায় অস্ত যায়। দিবারাত্রির এই পরিক্রমার পথ বেয়ে প্রকৃতিতে চলে ষড় ঋতুর আবর্তন। প্রকৃতির এই নিয়মের বন্ধনে বাঁধা মানুষের জীবন ও অস্তিত্ব। মানুষের ব্যক্তিজীবনের বিকাশ ও পরিচালনার সঙ্গে শৃঙ্খলার যোগ হয়েছে। এই শৃঙ্খলা যেন মানুষের জীবনে চলার ছন্দ। মানুষের উন্নতি ও কল্যাণ নিশ্চিত করার স্বার্থেই অনেক নিয়ম গড়ে তুলেছে সমাজ। যেসব নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয় মানুষের ব্যক্তিত্ব, মনুষ্যত্ব ও প্রতিভা। শিক্ষিত মানুষের সুশৃঙ্খল জীবনের ভিত্তি রচিত হয় ছাত্রজীবনে। সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মানুবর্তিতার মেলবন্ধনে ছাত্রজীবনে অর্জিত হয় শৃঙ্খলার ছন্দ। এ ক্ষেত্রে ছন্দপতন ঘটলে জীবনে বিপর্যয় ঘটতে পারে। শৃঙ্খলাবোধ আত্মস্থ করার জন্য অবশ্যই কতিপয় রীতিনীতি অনুসরণ করা জরুরি। প্রথমত প্রয়োজন সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলা। দ্বিতীয়ত প্রয়োজন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। শৃঙ্খলাবোধ অর্জনের ক্ষেত্রে উত্তম নৈতিকতা ও শিষ্টাচারের অনুশীলন দরকার। বিশৃঙ্খলা পরিহার করে জীবনকে সুন্দর করার জন্য শৃঙ্খলাবোধের বিকল্প নেই। সুশৃঙ্খল জীবনে প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার হয়। চিন্তা ও কর্মে শৃঙ্খলা অনুসরণ করলে মানুষ মহৎ এবং কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে। শৃঙ্খলা কাম্য হলেও কখনো কখনো শৃঙ্খলার বাড়াবাড়িতে জীবনের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। মানুষের জীবন তখন যন্ত্রের জীবনে পরিণত হয়। তার পরও শৃঙ্খলাই ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনকে সুন্দর করে তোলে। প্রতিটি ব্যক্তির সুশৃঙ্খল চিন্তা, কর্ম ও আচরণের শক্তিতেই জাতি বিশ্বসভায় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।

যৌতুক প্রথা

বিয়েসংক্রান্ত ব্যাপারে বরপক্ষ কনেপক্ষের নিকট থেকে যে টাকা, অলংকার, গৃহসজ্জা ও বিনোদনমূলক সামগ্রী গ্রহণ করে থাকে তাকে বলে যৌতুক। ধনীদের বেলায় এটি বিলাসিতা হলেও দরিদ্রদের জন্য এটি অভিশাপ। যৌতুক কথাটি আমাদের সমাজের সঙ্গে কবে থেকে পরিচিত, তা সঠিকভাবে বলা যায় না; তবে প্রাচীনকাল থেকেই সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর লক্ষে ছেলেপক্ষকে নানা প্রকার উপহারসামগ্রী প্রদান করত; কিন্তু আধুনিক সমাজে এই যৌতুক প্রদান বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক অক্ষমতা বা অসমতা যৌতুক প্রথার একটি প্রধান কারণ। আমাদের দেশের বিপর্যন্ত অর্থনীতি যৌতুক প্রথার প্রসারে সাহায্য করছে। দরিদ্রতার চাপে বা অভাবে পড়ে অনেকে যৌতুক গ্রহণ করে। ফলে বর্তমানে এটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজে যৌতুকের প্রতিক্রিয়া মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ প্রথার ফলে পিতা-মাতাসহ পরিবারের সব সদস্যের শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হয়। যৌতুকের কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা আজকের সমাজে একটি প্রাত্যহিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যৌতুক হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়াও স্বর্ণালংকার, ফ্রিজ, টিভি, মোটরসাইকেল, বাড়ি, উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ গমনের টাকা পাত্রপক্ষকে প্রদান করতে হয়। এত কিছুর বিনিময়েও কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা তাঁর কন্যাকে পাত্রস্থ করে স্বস্তিতে থাকতে পারেন না। নতুন করে টাকা-পয়সা চেয়ে মেয়ের বাপের বাড়িতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। কন্যার বাবা যদি সে দাবি মেটাতে না পারেন, তবে তার ওপর শুরু হয় শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের পালা। কখনো কখনো যৌতুকের টাকা না পেয়ে মুখে এসিড নিক্ষেপ করে ঝলসিয়ে তাকে বিদায় দেয়। কখনো বা শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়, যাকে পরবর্তী সময় আত্মহত্যা বলে চালানোর জন্য গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়। কন্যাপক্ষ সব ক্ষেত্রেই অসহায়। তারা থানায় গিয়ে মামলা পর্যন্ত করতে পারে না। যাতে কখনো মামলা দায়ের করার সাহস করতে না পারে সে জন্য পুরো পরিবারকে মৃত্যুর হুমকি পর্যন্ত দেয়। এভাবে ন্যায়বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদে মরে। সামর্থ্য থাক না থাক, মেয়ে বিয়ে দিতে হলে যৌতুক দিতেই হবে, এটি আমাদের সমাজের এক বিষাক্ত ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। যৌতুক প্রথাকে বর্তমান সমাজ পরিহার করেছে। দেশের প্রগতিশীল সংগঠনগুলো এবং নারী সংগঠন এরই মধ্যে যৌতুকবিরোধী আন্দোলন শুরু করেছে। দেশের আইন বিভাগ ও সংসদ যৌতুক প্রথা বন্ধের জন্য আইন পাস করেছে। এত কিছুর পরও এ সমস্যার সমাধান হয়নি। তাই যৌতুক নির্মূল করার জন্য দল-মত-নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এ কুপ্রথার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রচুর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, বিশেষ করে মেয়েদের স্বশিক্ষিত এবং বাস্তব জ্ঞান সম্পন্ন হয়ে সংসারে প্রবেশ করতে হবে, যাতে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের আদর্শ যৌতুকবিরোধী হতে পারে। যদি পুরুষের নৈতিকতা ও মানসিকতার স্ফুরণ ঘটে, তাহলে এ প্রথার নিরাময় সম্ভব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা