kalerkantho

লোকরস

সোনার টেপা পুতুল

গাজী খায়রুল আলম

৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সোনার টেপা পুতুল

ছয় ফুট আকারের দশাসই চেহারার বিপত্নীক মতিন সাহেবের দাদা ছিলেন জমিদার। জমিদারি না থাকলেও সেই দাপট এখনো আছে। থাকেন একা। নিজের মতো করে বানিয়ে নিয়েছেন বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ি। সেই বাড়ির বিশাল এক ঘর নিজের মতো করে সাজিয়েছেন। প্রাচীন আমলের মতো লম্বা জানালা আর দরজা আছে তাতে। ছেলে-মেয়েরা সব বিদেশ। বাড়িতে থাকে কিছু কাজের লোক। রেগে আগুন হয়ে তাদেরই ডাকলেন তিনি। চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে এলো বামুন দারোয়ান বাটুল শাহ, কেয়ারটেকার মজনু, মালির সহকারী পিচ্চি মামুন ও গৃহকর্মী সুফিয়া।

মতিন সাহেব রেগে বললেন, ‘কী ঘটেছে তা কেউ একজন জানো। আমার এই বাড়ি থেকে আমার অজান্তে ঢোকার বা বের হওয়ার সুযোগ নেই। কোন জিনিস কোথায় থাকে তা-ও জানো সবাই। যে-ই কাজটি করেছ, স্বীকার করে নেও এখনই। ক্ষমা করে দেব।’

এই বলে মতিন সাহেব দারোয়ানের দিকে তাকালেন।

দারোয়োন বলল, ‘স্যার, কী হয়েছে সত্যিই জানি না। এখানে দশ বছর ধরে আছি। এখন পর্যন্ত কোনো অন্যায় করিনি।’ দারোয়ানের কথা শেষ হওয়ার আগেই কেয়ারটেকার মজনু বলতে শুরু করল, ‘তুমি জানো না, তাহলে জানবেটা কে? বামুনদের পেটে পেটে শয়তানি। বাইরে জিনিসপত্র পাচার করা তোমার জন্য নস্যি।’

চুপ থাকো। তুমি ঠিক বলছ না বেঠিক বলছ, তার বিচার পরে হবে। দাদা আমাকে খুব আদর করতেন। ছোটবেলায় বৈশাখী মেলায় গিয়ে কিছু টেপা পুতুল কিনেছিলাম। খেলতে গিয়ে সেগুলো ভেঙে যায়। আমার কান্না থামাতে দাদা বলেছিলেন, তোর জন্য সোনার টেপা পুতুল এনে দেব। দুদিন না যেতেই দাদা সেটি এনে দেন। পুতুলটি গত ষাট বছর যত্ন করে তুলে রেখেছি আলমারিতে। তোমাদের বিশ্বাস করতাম বলে তালাও লাগাতাম না। দরজায় শুধু ছিটকিনিটাই লাগাতাম। আজ সেই সুযোগ নিলে তোমাদের একজন!

মজনু বলল, স্যার আমার জুতা ছিল না, তাই জুতা কিনতে বাজারে গিয়েছিলাম রাতে। আর আমার মতো লম্বা মানুষের বুদ্ধি থাকে হাঁটুতে। সোনার পুতুল চুরি করব—এ সাহস নেই। দারোয়ান, না হয় সুফিয়া, না হয় ওই মামুন এ কাজ করেছে। মামুনকে আপনার রুমের কাছে ছোঁকছোঁক করতেও দেখেছি।

সঙ্গে সঙ্গে মিনমিন করে বলল মামুন, ‘আসলে স্যার আপনার কাছে কিছু টাকা চাইতে গিয়েছিলাম। কিন্তু দরজায় ঠেলা মারার আগেই মনে হলো, আপনি কী যেন করছেন। এ জন্য আর ভেতরে ঢুকিনি। চলে আসি।

‘অথচ আমি তখন মর্নিং ওয়াকে। কেন? তুমি জানতে না?’

মাথা নিচু করে ফেলল মামুন।

মতিন সাহেব ধমক দিলেন—দেখো, আমি জানি কে চুরি করেছ। একটা সুযোগ দিতে চাই ক্ষমা চাওয়ার। ক্ষমা না চাইলে সোজা পুলিশে দেব। সুফিয়া বলল, আমি সকালে আপনাকে চা দিতে গিয়েছিলাম, স্যার। কিন্তু দরজা দেখি বাইরে থেকে বন্ধ। আপনি ছিলেন বাইরে। ছিটকিনি উঁচুতে হওয়ায় দরজা খুলে আপনার টেবিলে যে চা রেখে আসব, সে উপায়ও নেই।

‘দেখো, গতকাল একটা পাউডারের কৌটা পড়ে গিয়েছিল ফ্লোরে। ওটা পরিষ্কার করা হয়নি। তাতে কিন্তু একটা পায়ের ছাপ আমি পেয়েছি। কেউ একজন চুপিসারে দরজা খুলে ঢুকে চুরি করে আবার বের হয়ে দরজা লক করে গেছ। গোটা বারান্দা খালি। গোটা বাড়িতে একটা চেয়ার বা টুল নেই। কারণ আমি গদিতে বসতে পছন্দ করি।

কেউ ঠিক বুঝতে পারল না কী বলতে চাচ্ছেন মতিন সাহেব। কেয়ারটেকার আবার বলল, ‘স্যার, আপনি দরকার হলে চাকরি থেকে বাদ দিন। তবু চুরির অপবাদ দেবেন না।’ একই কথা বলল দারোয়ানও। সুফিয়া কাঁদছে তো কাঁদছেই।

উপায় না দেখে মতিন সাহেব থানায় ফোন দিলেন। চোরও ধরা পড়ল সহজে।

বলো দেখি, কী করে চোর ধরে ফেললেন মতিন সাহেব?

মন্তব্য