kalerkantho

গল্প

সহ্যের সীমা

মূল : পল জেনিংস
রূপান্তর : তানভীর মৌসুম

৩১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সহ্যের সীমা

অঙ্কন : মানব

আগামীকাল কী ঘটবে, তা নিয়ে খুবই চিন্তিত। আব্বুর মধ্যে পরিবর্তন দেখা যাবে, সন্দেহ নেই। সে কেঁদেও ফেলতে পারে আবার প্রচণ্ড রেগে গিয়ে আমার গলাও চেপে ধরতে পারে।

আব্বুকে অনেক পছন্দ করি। আমাকে মাছ ধরতে নিয়ে যায়। শীতের দিনে তার সঙ্গে কুস্তি লড়ার মজাই আলাদা। সবাই যখন খবর দেখে, তখন আব্বু শব্দজট খেলতে বসে যায়। অনেক রসিকতা করে। কোনো জিনিস কিনতে চাইলে মানা করে না।

কিন্তু ওনার দুটি সমস্যা আছে। একটা হলো মাছি নিয়ে শুচিবাই। আব্বু প্রাণীটাকে দুই চোখে দেখতে পারে না। ঘরের ভেতর মাছি ঢুকলে তার মারতেই হবে। পরিবেশদূষণের ভয়ে সে কখনো স্প্রে করে না। খালি হাতে নয়তো বই নিয়ে মাছিকে তাড়া করে বেড়ায়। ঘরময় দৌড়ঝাঁপ দেখলে সবাই ওকে পাগল ভাববে। মাছি চ্যাপ্টা না হওয়া পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ থামে না। কোনো দুর্ভাগা চ্যাপ্টা মাছি ম্যাগাজিনের গায়ে লেপ্টে কিছুক্ষণ তড়পায়।

মাছিনিধনে তার জুড়ি মেলা ভার। কাজে নামলে মাছি মরবেই, তাতে সন্দেহ নেই। আব্বুর টার্গেট মিস হয় না।

কিন্তু মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত লাগে। যেভাবে একের পর এক ম্যাগাজিন নোংরা করছিল, তা দেখে কিছুদিন আগে মাছি মারার যন্ত্র কিনি।

এই তো গেল প্রথম সমস্যা। আব্বুর দ্বিতীয় সমস্যাটা হলো, টেবিলে বসার সৌজন্য নিয়ে। টেবিলে কিভাবে বসতে হবে, কী করতে হবে, কী করা যাবে না—এসব উপদেশ শুনতে শুনতে পাগল হয়ে গেছি।

‘অ্যানড্রু, টেবিলে কনুই রেখো না।’

‘মুখে খাবার নিয়ে কথা বোলো না।’

‘কখনো আঙুল চেটে খাবে না।’

‘কফির মধ্যে বিস্কুট ভেজাবে না।’

প্রতিবার খেতে বসলে আব্বু এ রকম কিছু না কিছু বলবেই। মাছি আর টেবিল ম্যানার নিয়ে সে একেবারে আপসহীন।

যাক সে কথা। একদিন নাশতার আগে আব্বু আলুর খোসা ছাড়াচ্ছিল। তখন টেবিলের নিচে পঞ্চাশ সেন্টের কয়েনটা খুঁজে বেড়াচ্ছি। ওটা এক সপ্তাহ আগে টেবিলের নিচে চলে যায়।

আম্মু নাশতা তৈরির ফাঁকে আব্বুর সঙ্গে কথা বলছিল। কেউই জানে না আমি টেবিলের নিচে।

বিকেলে চা খাওয়ার ব্যাপারে কথা হচ্ছিল। খুবই গুরুত্বপূর্ণ চা পর্ব, কারণ আব্বুর বস মিস্টার স্পিংক্স আসবে। বাসায় কোনো অতিথি এলে আব্বুর উপদেশ দেওয়ার গতি বেড়ে যায়।

‘চা খাওয়ার সময় অ্যানড্রুকে উপদেশ দেওয়াটা বন্ধ করা উচিত।’ আম্মু বলল।

‘উঁহু, বন্ধ করা যাবে না।’ আপত্তি জানাল আব্বু।

‘অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’ আম্মু বলল। ‘সব সময় এটা কোরো না, ওটা কোরো না শুনতে শুনতে ছেলেটার মন ছোট হয়ে যাবে।’

আম্মুর কথা শুনে বেশ মজা পেলাম।

‘আজ রাতে’—ফের বলে উঠল আম্মু। ‘পুরোটা সময় অ্যানড্রুকে কোনো ব্যাপারে নিষেধ করতে পারবে না। এমনটা যেন আজ একবারের জন্যও না হয়।’

‘সমস্যা নেই। একদিন ওকে কিছু না-ই বা বললাম।’ আব্বু বলল।

‘ওকে কিছু না বলার ব্যাপারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।’ আম্মু বলল। ‘কথা দাও, আজ রাতের ব্যাপারে।’

আব্বু বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আম্মুর দিকে। ‘ঠিক আছে। তোমার সঙ্গে না হয় চুক্তিই করলাম। ও কী করছে না করছে তা নিয়ে একটা কথাও বলব না। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তুমিও ওকে কিছু বলতে পারবে না। আমি মুখ বন্ধ রাখলে তোমাকেও রাখতে হবে।’

‘এসো হ্যান্ডশেক করি।’ আম্মু বলল। এই বলে হাত মেলাল দুজন, তারপর হাসা শুরু করল।

ওদিকে খানিক খোঁজাখুঁজির পর পঞ্চাশ সেন্টের কয়েনটা পেয়ে গেলাম। বাসা থেকে বের হলাম খানিক পর। পুরো ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করছি। মানে দাঁড়াল—আজ চা পানের সময় আব্বু আমাকে নিষেধ করে একটা কথাও বলবে না। কিভাবে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা যায় তা-ই ভাবছি। আব্বু যাতে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বেশি কঠিন হবে না কাজটা। জিব দিয়ে সশব্দে স্যুপ গিলব। এটা আব্বুর একেবারেই পছন্দ না। তখন সে আপনা থেকেই নিষেধ করবে। চিত্কারও করতে পারে। টেবিলে বসে দীর্ঘ সময় আব্বু চুপচাপ থাকবে—এমনটা হতেই পারে না।

‘দারুণ মজা হবে।’ নিজেকেই বললাম কথাগুলো।

সেই রাতে আম্মু নতুন টেবিলক্লথ বিছিয়ে দিল। সবচেয়ে সুন্দর ছুরি আর কাঁটাচামচগুলো শোকেস থেকে বের করল। প্লেটগুলোর কথা আর কী বলব। সবগুলো প্লেটই স্পেশাল, আমাকে স্পর্শ করার অনুমতি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। এই যে এত তোড়জোড়, কিসের জন্য? রাতের চায়ের দাওয়াতের জন্য। বোঝাই যাচ্ছে, অতিথি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেউ হবে। সাধারণত টেবিল এতটা সুসজ্জিত করা হয় না।

মিস্টার স্পিংক্স সম্ভবত সংগ্রহের সেরা স্যুটটি পরে বাসায় এলেন। চশমার ফ্রেমটা স্বর্ণের তৈরি। একটু পরপর ভুরু কুঁচকান। চেহারা দেখেই বুঝতে পারলাম, অতিথি সাহেব বাচ্চা ছেলেপেলে খুব একটা পছন্দ করেন না। বয়সে বড় কেউ যখন ছোটদের অপছন্দ করে, তখন সেটা দেখলেই বোঝা যায়। তারা বাচ্চাদের সামনে ঠোঁট জোড়া দিয়ে হাসার চেষ্টা করে; কিন্তু সেই হাসি চোখ পর্যন্ত পৌঁছে না।

যা-ই হোক, রাতে সবাই টেবিলে বসলাম। নিজের গোপন অস্ত্রটা রেখে দিলাম টেবিলের নিচে। এটা দিয়ে আব্বুকে সহজে জব্দ করা যাবে, আমি শতভাগ নিশ্চিত। তবে ব্যবহার করব সবার শেষে। আর সব কিছু ব্যর্থ হলে শুধু তখন।

প্রথমে এলো স্যুপ আর পাউরুটির রোল। আমি প্রচণ্ড শব্দ করে স্যুপ গেলা শুরু করলাম। কেউ একটা কথাও বলল না! তখন আরো জোরে শব্দ করতে লাগলাম। মনে হবে, কেউ পানিভর্তি বাথটাবের প্লাগ খুলে দিয়েছে। আব্বু শুধু একবার গলা খাঁকারি দিয়ে উঠল। কিন্তু মুখ দিয়ে একটা কথাও বলল না!

এবার নতুন কৌশল ধরলাম। পাউরুটি ডুবিয়ে দিলাম স্যুপের ভেতর। পানি শুষে রুটির টুকরোটা বেশ ভারী হয়ে গেল। সেটা মাথার বেশ খানিকটা ওপরে তুলে ধরলাম। সবাইকে দেখিয়ে আস্তে করে ছেড়ে দিলাম রুটিটা। তত্ক্ষণাত্ খোলা মুখের ভেতর লুফে নিলাম। টুকরোটা মুখে পড়ার সময় বেশ আর্দ্র একটা আওয়াজ হলো। একই কাজ আবারও করলাম, এবার বড় একটা টুকরো নিয়ে। কিন্তু কপাল খারাপ। দ্বিতীয় রুটিটা লুফে নিতে পারিনি। স্যুপে ভেজা রুটি আমার চোখে এসে পড়ল।

কেউ একটা কথাও বলল না! আব্বু আমার দিকে তাকাল। তাকাল আম্মুও। মিস্টার স্পিংক্স আমার দিকে না তাকানোর চেষ্টা করল। আব্বুর পদোন্নতির ব্যাপারে কথা বলছে সবাই, এমন ভান করছে, যেন আমি টেবিলে নেই।

এরপর এলো চিকেন আইটেম। এবার আব্বু মুখ না খুলে যাবে কোথায়? কিছু তো বলতেই হবে। মুরগির হাড্ডি কামড়ানোর সময় আব্বু বেশ বিরক্ত হয়।

সবাইকে চিকেন দেওয়া হলো। ‘আমি মুরগির পাছু পেয়েছি!’ চিত্কার করে বললাম।

এ কথা শুনে আব্বু অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলেও কিছু বলল না। আঙুল দিয়ে মাংসের টুকরোটা ধরে মুখের ভেতর ঠেসে ভরতে লাগলাম।

আব্বুকে দেখে কেমন যেন পাগল পাগল মনে হচ্ছিল। এমন অসহায়, দিশাহারা চেহারা আগে কখনো দেখিনি। ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে বেচারা, একটু পর পর অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করছে। থাকতে না পেরে গলা খাঁকারিও দিল কয়েকটা। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ উচ্চারণ করেনি, একটা কথাও আমার উদ্দেশে বলেনি! আব্বু প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অটল। কিছুই তাকে টলাতে পারবে না।

এবার মুরগির হাড্ডি সশব্দে ভেঙে ফেললাম। চাটা শুরু করলাম হাড্ডির মাঝের অংশ। চুষছি আর জিব দিয়ে চাটছি। আব্বুর মুখ লাল হয়ে গেছে। ফুলে উঠেছে নাকের ওপরের রগগুলো। কিন্তু এত কিছুর পরও টুঁ শব্দটা করল না!

সবার শেষে এলো কাস্টার্ড। এবার আব্বু যাবে কোথায়?

মিস্টার স্পিংক্স আব্বুর পদোন্নতির ব্যাপারে কথা বলা থামিয়ে দিয়েছেন। এখন কথা বলছেন নিয়ম-শৃঙ্খলা, সীমারেখা নির্ধারণ, আচার-ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে। এসবের ওপর জোর দিতে বলছেন।

আমি চেটে-চুষে এক টুকরো হাড্ডির মাঝখানটা খালি করে ফেলেছিলাম। সেটা ফেলে দিলাম কাস্টার্ডের ওপর, এক প্রান্ত রাখলাম দুই ঠোঁটের মাঝখানে। টেনে টেনে স্ট্রয়ের মতো হাড্ডি দিয়ে কাস্টার্ড খাচ্ছি!

আব্বু আবার গলা পরিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

‘অ্যানড্রু!’ ডাক দিল বেচারা আব্বু।

‘জি?’ আমি মুখভর্তি কাস্টার্ড নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

‘কিছু না।’ সে মৃদু গলায় বলল।

আহা! আব্বুর কোনো তুলনা হয় না! প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছে; কিন্তু এখনো পরাজয় বরণ করেনি! আর একটা কাজই বাকি। নিচ থেকে গোপন অস্ত্রটা তুলে নিলাম।

মাছি মারার যন্ত্রটা টেবিলের ওপর তুলে ছুরির পাশে রাখলাম।

টেবিলের ওপর জিনিসটা পড়ে থাকতে দেখল সবাই, সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে রয়েছে যন্ত্রটার দিকে। কেউ কিছু বলল না।

যন্ত্রটা হাতে নিয়ে চাটা শুরু করলাম। চাটছি তো চাটছিই, আইসক্রিমের মতো করে! কচরমচর করে চিবুতে লাগলাম মনের আনন্দে।

মিস্টার স্পিংক্স উঠেই ছুট মারল কিচেনের দিকে। সিংক থেকে বমির শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

অবশেষে! আব্বু উঠে দাঁড়াল! আর সহ্য করতে পারছিল না। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে বাধ্য হলো সে।

‘আআআআআ!’ বিজাতীয় এক চিত্কার বেরিয়ে এলো তার গলা থেকে। আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে আমার দিকে তেড়ে এলো, হাত দুটি বাজপাখির নখরের মতো করে রেখেছে!

আর পায় কে? দিলাম ছুট! এক দৌড়ে নিজের রুমে গেলাম, লাগিয়ে দিলাম দরজা।

হিংস্র পশুর মতো গর্জন করছে আব্বু, ক্ষণে ক্ষণে উদ্ভট চিত্কার দিয়ে উঠছে!

আগামীকাল আব্বুর মেজাজ ঠাণ্ডা হলে সব খুলে বলব। রাস্তা থেকে পঞ্চাশ সেন্ট দিয়ে মাছি মারার যন্ত্রটা কিনেছি, সেটা জানাব। বলে দেব, কফির গুঁড়া আর পানি মিশিয়ে যন্ত্রটার ওপর লাগিয়ে দিয়েছিলাম।

আমি তো মরা মাছি খাব না, খেলেও কোনো গুরুত্বপূর্ণ কারণ থাকতে হবে।

মন্তব্য