kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

বিজ্ঞান

গরমের চার কথা

ইদানীং গরম পড়ছে খুব। আলাদিনের দৈত্যকে বলে সুবিধাজনক একটি পরিবেশ আদায় করা গেলে ভালোই হতো! কিন্তু দৈত্য যদি ভুল করে তাপমাত্রা পরম শূন্য বানিয়ে দেয়? কিংবা সূর্যের কেন্দ্রের চেয়েও বেশি? বিজ্ঞানীরা কিন্তু তাপমাত্রা নিয়ে এর চেয়েও ভয়ানক সব কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন। তাপ নিয়ে এমন কিছুু পরীক্ষা ও ঘটনা সম্পর্কে জানাচ্ছেন কাজী ফারহান পূর্ব

৩১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গরমের চার কথা

গনগনে সূর্য থেকে মাঝে মাঝেই ছিটকে বেরিয়ে আসে আগুনের ফুলকি, যাকে বলে সোলার ফ্লেয়ার

সূর্যের চেয়েও বেশি তাপ!

গ্রীষ্মকালে সূর্য মামার দাপটে মাথা খারাপ হওয়ার দশা। এর কেন্দ্রের তাপমাত্রা কত জানো? স্পেস.কম-এর তথ্য মতে, এক কোটি ৫০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু যদি বলা হয়, পৃথিবীর ল্যাবরেটরিতে এর চেয়েও বেশি তাপ তৈরি হয়েছে! বিশ্বাস করবে? না করে উপায় নেই, কারণ নিউ ইয়র্কের ব্রুকহ্যাভেন ন্যাচারাল ল্যাবরেটরির ২.৪ মাইল দীর্ঘ রিলেটিভিস্টিক হেভি আয়ন কলাইডারে স্বর্ণের আয়নের মধ্যে ধাক্কা লাগিয়ে কোয়ার্ক-গ্লুয়োন প্লাজমা সৃষ্টি করে বিগব্যাংয়ের পুনরাবৃত্তির সময় দুর্দান্ত ঘটনাটি ঘটে। পরমাণুর নিউক্লিয়াসের প্রোটন, নিউট্রন ভেঙে চুরমার হয়ে একেবারে কোয়ার্কে পরিণত হয়ে যায়। এ ঘটনায় উত্পন্ন তাপমাত্রা চার ট্রিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস—অর্থাত্ চারের পর ১২টা শূন্য! বিগথিং ডটকম থেকে জানা যায়, এটা সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার গুণ বেশি! তবে এর চেয়েও বেশি তাপমাত্রা তৈরি হয়েছে সুইজারল্যান্ডের জেনেভার সার্নের লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে। সেখানকার এলিস এক্সপেরিমেন্টে ৯৯ শতাংশ আলোর বেগে সিসার আয়নে সংঘর্ষ ঘটিয়ে কোয়ার্ক-গ্লুয়োন প্লাজমা তৈরির সময় তাপের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের মতে, ১৩ আগস্ট ২০১২ সালের ওই পরীক্ষায় সৃষ্ট তাপই হলো মানবসৃষ্ট সর্বোচ্চ তাপ। ওটা ছিল ৫.৫ ট্রিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস! ৫৫-এর পর ১১টি শূন্য।

নাসার তোলা বৃহস্পতির এ ছবি দেখতে বেশ শীতল মনে হলেও গ্রহটির কেন্দ্রের তাপমাত্রা ২৪ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস

সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কত?

গবেষণাগারে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা অর্জন করেই তো থেমে থাকা যায় না। সর্বনিম্ন তাপমাত্রারও তো একটা রেকর্ড থাকা চাই! বিজ্ঞানীরা কিন্তু আমাদের হতাশ করেননি। তাঁরা নেমে পড়েছেন সবচেয়ে কম তাপমাত্রা অর্জনের কাজে। তাঁদের কাজ সম্পর্কে জানার আগে চলো পরম শূন্য তাপমাত্রা কী, তা জেনে নিই। পরম শূন্য বা অ্যাবসুলিউট তাপমাত্রা বলতে এমন তাপমাত্রাকে বোঝায়, যার চেয়ে ঠাণ্ডা আর কোনো কিছু হতে পারে না। এর মান শূন্য কেলভিন বা -২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাত্ বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটাই সবচেয়ে শীতল তাপমাত্রা। সায়েন্স অ্যালার্ট.কম থেকে জানা যায়, এ তাপমাত্রা অর্জন অসম্ভব, কারণ তখন সব পরমাণুর কম্পন থেমে যাবে। আর্থ স্কাই থেকে জানা যায়, বুমেরাং নেবুলা হলো এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে ঠাণ্ডা জায়গা। এর তাপমাত্রা -২৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুনে অবাক হবে যে নাছোড়বান্দা বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরীক্ষার পর পরীক্ষা চালিয়ে বুমেরাং নেবুলার চেয়েও কম তাপমাত্রা অর্জন করেছে। পরীক্ষামূলকভাবে অর্জিত নিম্নতম তাপমাত্রা হলো -২৭৩.১৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ইতালিতে পরীক্ষাটি করা হয়। লাইভসায়েন্স ডটকম থেকে জানা যায়, বিজ্ঞানীরা একটি ৪০০ কেজির তামার ঘনক নিয়ে সেটাকে শীতল করেন। ক্রায়োস্ট্যাট হলো কোনো জিনিসকে প্রচণ্ড শীতল রাখার এক বিশেষ পাত্র। ইতালির ইনস্টিটিউটে ন্যাজিওনালে ডি ফিজিকা নিউক্লিয়ারের (আইএনএফএন) গবেষক কারলো বুচ্চি বলেন, ‘ক্রায়োস্ট্যাট তৈরি করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সিস্টেমটা ডিজাইন করতে, বুঝতে ও টেস্ট করতে আমাদের ১০ বছর লেগে গেছে।’ এখানেই শেষ নয়! নাসা আরো কম তাপমাত্রা অর্জন করতে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে তাদের যন্ত্রপাতি পাঠাচ্ছে। কোল্ড অ্যাটম ল্যাবরেটরি নামের ওই যন্ত্রপাতির লোডটি অত্যন্ত ঠাণ্ডা পরমাণুর কোয়ান্টাম আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে সহায়তা করবে।

 

গরম গরম নরম নরম

সৌরজগতে সূর্য মামাই সবচেয়ে রাগী। এর কেন্দ্রের তাপ এক কোটি ৫০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু এর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ভেতরের তাপের চেয়ে ঢের কম। স্পেসডটকম থেকে জানা যায়, সূর্যের পৃষ্ঠের তাপ ৫৫০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জেনে অবাক হবে, আমাদের পৃথিবীর কেন্দ্রের তাপমাত্রা আবার সূর্যের পৃষ্ঠের প্রায় সমান। পৃথিবীর কেন্দ্রের তাপ প্রায় ৬০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সৌরজগতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপ পাওয়া যাবে বৃহস্পতি গ্রহের কেন্দ্রে। এর তাপমাত্রা প্রায় ২৪ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। গরম গরম ব্যাপারগুলো তো গেল। এখন একটু শীতল হওয়া চাই। সৌরজগতের সবচেয়ে ঠাণ্ডা জায়গা কোনটি জানো? রাতের আকাশেই একে দেখা যায়। সেটি হলো আমাদের চাঁদ মামা। ২০০৯ সালে নাসার লুনার রেকনেঁসা অরবিটার জানতে পারে চাঁদের কিছু গর্তে সূর্যরশ্মি ঢুকতে পারে না। ওখানে বেশ ঠাণ্ডা। কিছু গর্তের তাপমাত্রা মাইনাস ১৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসও দেখা গেছে।

 

পরম শূন্য তাপের বিপরীতে?

ঠাণ্ডার বিপরীত গরম। পরম শূন্য তাপমাত্রার বিপরীতে হলো পরম গরম। মানে সবচেয়ে গরম কত ডিগ্রি হওয়া সম্ভব? এ প্রশ্নটাও বিজ্ঞানীদের খুব ভাবিয়েছে। তাঁরা সম্ভাব্য সর্বোচ্চ তাপমাত্রাকে প্ল্যাংক তাপমাত্রা নামে আখ্যায়িত করেছেন। জেডএমই সায়েন্স ডটকমের তথ্য মতে, প্ল্যাংক তাপমাত্রা স্কেলে ০ হলো পরম শূন্য আর ১ হলো সর্বোচ্চ তথা প্ল্যাংক তাপমাত্রা। আর সব তাপমাত্রা ০ ও ১-এর মাঝের ভগ্নাংশ। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, ১.৪১৭ী১০থ৩২ কেলভিন হলো সর্বোচ্চ সম্ভাব্য তাপমাত্রা। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী এর চেয়ে তাপ তৈরি হওয়া অসম্ভব। জিডবিটস.কম থেকে জানা যায়, এই তাপমাত্রা প্রায় ১০০ মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াসের সমান! আমাদের সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রা মাত্র ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাহলে চিন্তা করো, প্ল্যাংক তাপমাত্রা কত বড়!

 

মন্তব্য