kalerkantho

তোমাদের গল্প

আবিরের জন্য

ফাহিম মুনতাসির

৩১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আবিরের জন্য

ছাদে বসে আকাশ দেখছিলেন বিজ্ঞানী মেহেদী। ২০৬৯ সালের আকাশ। পঞ্চাশ বছর আগের আকাশটাও কি এমন ছিল? ‘স্যার, চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’ যান্ত্রিক কণ্ঠ শুনে ভাবনায় ইতি টানলেন।

ক্রিটিন চতুর্থ প্রজন্মের রোবট। চায়ের দিকে তাকিয়ে তার বোঝার কথা নয় ওটা কতটা ঠাণ্ডা হবে বা গরম হবে। উত্তর এলো সঙ্গে সঙ্গে।

‘আপগ্রেড হয়েছি, স্যার। চায়ের ধোঁয়া ওঠার গতি ও হিট সিগনেচার দেখে...।’

‘হয়েছে, থামো। আমার সব রেডি তো?’

‘জি, স্যার। যখন খুশি যেতে পারবেন।’

আজ একটু তাড়াতাড়িই চা শেষ করলেন মেহেদী। জিব খানিকটা পুড়েও গেল বোধ হয়। কাপ সরিয়ে নিজের কাজের জন্য তৈরি হয়ে নিল ক্রিটিন। 

গবেষণাগারে ঢুকতেই অন্য রকম উত্তেজনা বোধ করলেন মেহেদী। এমনিতে তিনি মুখচোরা টাইপের। বিজ্ঞান সম্মেলনে অংশ নেন না মঞ্চে উঠতে হবে বলে। সচরাচর কারো সঙ্গে দেখাও করেন না। কিন্তু আজ যার সঙ্গে তাঁর দেখা হবে, সেটা নিয়ে মোটেও বিচলিত নন তিনি। বরং একটা খুশির আমেজ ছেঁকে ধরে আছে।

প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রভর্তি ব্যাগটা এগিয়ে দিল ক্রিটিন। ভ্রুক্ষেপ নেই মেহেদীর। অর্ডার দিয়ে বানানো পঞ্চাশ বছর আগের স্টাইলের শার্ট-প্যান্ট পরে এগিয়ে গেলেন নীল-সাদা কাচঘেরা গোল চাকতিটার দিকে। একজন মাত্র মানুষের বসার জায়গা আছে তাতে। যন্ত্রটার নকশা নিয়ে ভাবেননি। কাজ করছে ঠিকঠাক, এটাই বড় কথা। মেহেদী আরেকটু পরই চালু করতে যাচ্ছেন তাঁর আবিষ্কৃত টাইম মেশিনটা, প্রথমবারের মতো!

পঞ্চাশ বছর আগ থেকে এ মেশিন বানানোর স্বপ্ন দেখে আসছেন বৃদ্ধ মেহেদী। আজ সে স্বপ্ন সত্য হয়েছে। যেকোনো সময়ের অতীতে যেতে পারবেন বিজ্ঞানী মেহেদী। তবে সে অতীত তাঁর ফেলে আসা অতীত হবে না। হবে অন্য একটা টাইমলাইনের অতীত, অন্য কোনো জগতের।

কোল্ড ফিউশন ব্যাটারিটা লাগাল ক্রিটিন। কোনো ঝুট-ঝামেলা হলো না। ড্যাশবোর্ডে দিনক্ষণ সব সেট করে দিলেন বিজ্ঞানী। কোটি বছর আগের ডায়নোসর কিংবা লাখো বছর আগের কোনো সভ্যতায় যাওয়ার ইচ্ছা আপাতত নেই। তিনি যাবেন ২০১৯ সালের ঢাকায়।

সিটবেল্ট বেঁধে নিলেন। বিপ বিপ শব্দ করে ঘুরতে শুরু করল গোলকটা। সেই সঙ্গে ঘুরছে শক্তিশালী ইলেকট্রোম্যাগনেটিক কয়েল। জ্ঞান হারালেন মেহেদী।

জ্ঞান ফিরতেই দেখলেন সব নীরব নিথর। সবে ভোরের আলো ফুটেছে। গোল চাকতিটা এসে পড়েছে ঢাকার একটি পার্কের এক পাশে। তাকে ঘিরে রয়েছে গুটিকয়েক উত্সুক জনতা।

চেতনা ফিরে পেতেই মেহেদী চোখ বোলালেন স্ক্রিনে। মার্চের সেই দিন। ভোর ৬টা। আর মাত্র দেড় ঘণ্টা সময় হাতে। দ্রুত বের হলেন টাইম মেশিন থেকে। টাইম মেশিন দিয়ে সময় ভ্রমণ করা যায়। কিন্তু ফার্মগেট থেকে প্রগতি সরণি যাবেন কী করে? সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে বের করে নিলেন পুরনো একটা ফোন। বহু দিন আগলে রেখেছিলেন। একটা অ্যাপ ডাউনলোড করে নিলেন সহজেই। খানিক পরেই তাকে রিসিভ করতে এলো রাইড শেয়ারিংয়ের একটি মোটরসাইকেল। হেলমেট পরে উঠে বসলেন পেছনে। তাগাদা দিলেন না। হাতে সময় আছে ঢের। সাতটা বাজতেই পৌঁছে গেলেন জায়গামতো। একটু অপেক্ষা করতেই দেখা পেলেন কাঙ্ক্ষিত সেই মুখটার। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ভার্সিটির দিকে যাচ্ছে বিশ বছরের আবির। বিজ্ঞানী মেহেদীর বয়স এখন সত্তর ছুঁই ছুঁই করলেও তিনি জানেন, এই আবির সেই আবিরই। তার বড় ভাই আবির। ছেলেটার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালেন মেহেদী। সময় ঠিক সাড়ে সাতটা। দূরে বাসটা দেখতে পেলেন। আবির পা বাড়াতে যাবে বাসের উদ্দেশে, তার আগেই তরুণ ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলেন মেহেদী। বাসের জন্য না ছুটে পেছন ফিরে তাকাল আবির।

‘আরেকটু পরে যাও ভাই।’

মিষ্টি হেসে বললেন মেহেদী। আবির চোখ কুঁচকে সামনে তাকাল। মুহূর্তে শাঁ করে তার সামনে দিয়ে চলে গেল আরেকটা বাস। খেয়ালই করেনি। জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পার হতে গেলেও ওই বাসের তলায় পড়ত নির্ঘাত। ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য পেছন ফিরে তাকাল আবির। কেউ নেই। ততক্ষণে আবার রাইড শেয়ারিংয়ে চড়ে টাইম মেশিনের দিকে রওনা দিয়েছেন বিজ্ঞানী মেহেদী। চোখ মুছতে মুছতে ভাবলেন, অতীতে এসে ভাইকে বাঁচাতে পেরেছেন ঠিকই। তবে এটাও ঠিক, তিনি তাঁর নিজের জগতে আবিরকে পাবেন না। না থাকুক। অন্য কোনো জগতে অন্য কোনো টাইমলাইনে বেঁচে থাক তাঁর ভাই।

মন্তব্য