kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

হরর ক্লাব

আগুনে ভূত!

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার জোরপুকুরিয়া গ্রামে ছিল প্রায় ৬০-৬৫ বছরের একটি তুলাগাছ। যার তলা দিয়ে হেঁটে গেলে একসময় গা ছমছম করত গ্রামবাসীর। অনেকে ভাবত—এ গাছে বাস করে এক ভূত। যার শরীরে জ্বলত আগুন। আগুনে ভূতের গল্প শোনাচ্ছেন গাজী খায়রুল আলম

৩১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আগুনে ভূত!

এ পথেই ছিল সেই তুলাগাছ, এখানেই দেখা মিলত আগুনে ভূতের

সন্ধ্যার পর ওই পথ মাড়াত না কেউ। পথচারীদের অনেকেও হয়েছে ওই ভূতের মুখোমুখি। প্রত্যক্ষদর্শী হাবিবুল্লাহ জানান, ‘একদিন রাত ১টার দিকে টয়লেটে যাওয়ার জন্য বের হই। একাই ছিলাম। হাতে ছিল টর্চলাইট। ঘুটঘুটে অন্ধকার। পুরনো তুলাগাছটি সবে কাটা হয়েছে। মানুষ নানা কথা বলছে।

ভাবলাম, এ আর এমন কী। গাছ যেহেতু কাটা হয়েছে, কথিত আগুন ভূত হয়তো অন্য কোথাও চলে গেছে। আস্তে আস্তে টয়লেটের দিকে এগিয়ে গেলাম। টর্চলাইট হঠাত্ বন্ধ হয়ে গেল। হাতের ওপর বাড়ি দিলাম। জ্বলছে না। অনেক চেষ্টার পরে আবার জ্বলে উঠল। টর্চের আলো টয়লেটের সামনে পড়তেই ভয় পেয়ে গেলাম। দেখি, কেউ একজন টয়লেটের সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো শরীরে পোড়া দাগ। রক্তও ঝরছে। ভয়ে চিত্কার দিয়ে উঠলাম কে! কে! বলে। আচমকা দেখি অবয়বটার শরীরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। মুহূর্তে আগুন ধরে গেল টয়লেটেও। চিত্কার করতে গিয়েও পারছি না। টর্চলাইট ছুড়ে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। সেখানেই অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফেরার পর দেখি, আমাকে ঘিরে অনেকে দাঁড়িয়ে। সবাই ঘটনা জানতে চায়। ঘটনা বললাম। আশ্চর্যের বিষয়, টয়লেটটি যেমন ছিল তেমনই আছে। আমি যে দেখলাম পুড়ে যাচ্ছে, সে হিসাব মেলাতে পারছি না।’

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী নূরজাহান বেগম। তিনি বলেন, ‘ভোররাতে আজানের প্রায় আধা ঘণ্টা আগে অজু করতে বের হই। তুলাগাছটি এমন জায়গায় ছিল, যেটি আমাদের টয়লেট ও টিউবওয়েলের কাছে। গাছটি কাটার পর আমার ছেলে সেখানে কিছু একটা দেখে। আমার বিশ্বাস হতো না। কারণ এমন ঘটনা অনেক শুনেছি; কিন্তু চোখে দেখিনি। অজু করার জন্য একটি বালতি নিয়ে যাই। টিউবওয়েলের কাছে গিয়ে অজু শুরু করি। মেসওয়াক করতে গিয়ে যখন মাথা তুলে সামনে তাকাই, আমার গা কাঁপা শুরু হয়ে যায়। পাঁচ-ছয় হাত দূরে দাঁড়িয়ে একটি লোক গায়ে পানি ঢালছে। কিন্তু তার সারা শরীরে আগুন। ছেলের কথা মনে পড়ে গেল। ভয় পেয়ে গেলাম। ধীরে ধীরে ঘরের দিকে মুখ ফেরাতে লাগলাম। দেখি, জ্বলন্ত লোকটা একটু একটু করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি এক দৌড়ে ঘরের দরজায় গিয়ে চিত্কার দিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ি। আমার পড়ার শব্দ পেয়ে ছেলে ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে আসে। তাকে ঘটনা বললাম। পরে সেখানে গিয়ে দেখি কিছুই নেই। কয়েক দিন পরে একজন কবিরাজ এনে বাড়িটি ‘বন্ধ’ করাই। এখন আর তেমন কিছু দেখা যায় না।

এ রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন চলাফেরা করেন বেলায়েত হোসেন। তিনি বলেন, রাতের বেলায় দোকান থেকে ফিরছিলাম। জায়গাটি নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি। অনেককে তর্কও করেছি। রাতে দোকান থেকে একাই ফিরতাম। ঘটনার দিন চাঁদের আলো ছিল। আমি গুনগুনিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। গাছটির নিচে গিয়ে একটু জোরেই গানের টান দিলাম। হঠাত্ মনে হলো, আমার সঙ্গে আরো একজন গাইছে। গান থামিয়ে দিলাম। কান খাড়া। নাহ, কেউ গাইছে না। আবার শুরু করলাম। আবার দেখি, কেউ একজন আমার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে। গা শিরশির করে উঠল। গানের আওয়াজটা আসছিল পেছন থেকে। ফিরে তাকাতেই বুকটা ছ্যাঁত্ করে উঠল। সামনে একি! এত বিকৃত চেহারার কিছু আগে দেখিনি। মুখ দিয়ে লালা পড়ছে, পুরো শরীর ছেঁড়াফাটা। লোকটা আবার হাসছেও। মুহূর্তে পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে গেল। মনে মনে সাহস জোগালাম। পায়ের জুতা খুলে এক দৌড়ে বাড়ি চলে আসি। এ ঘটনার কয়েক বছর পর গাছটি কেটে ফেলা হয়।

এলাকার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক আব্দুল মজিদ বলেন, আমার বাড়ি এই গ্রামেই। অনেক আগে থেকে শুনে আসছি, এখানে অনেকেই অনেক কিছু দেখে ভয় পায়। বিশেষ করে জ্বলন্ত মানুষ দেখেছে অনেকে। তবে আমি রাত-বিরাতে এদিক দিয়ে অনেক আসা-যাওয়া করলেও কখনো কিছুই দেখিনি। গ্রামের বেশির ভাগ লোকই বিশ্বাস করত এই তুলাগাছটিতে কিছু একটা থাকত, এখন আর কিছু ঘটে না। অনেকে বলে, কোনো এক কবিরাজ নাকি এটিকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সত্য-মিথ্যা জানি না। আমি নিজে দেখিনি। তবে সব কিছু দেখেই বিশ্বাস করতে হবে, এমনটাও মনে করি না। হয়তো বা তারা কিছু দেখেছেও। আবার মনের ভুলও হতে পারে।’

মন্তব্য