kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

ধারাবাহিক উপন্যাস

বান্দরবানের জঙ্গলে

মোস্তফা কামাল

৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



বান্দরবানের জঙ্গলে

অঙ্কন : মানব

মুহিত ওর কাঁধের ওপর সান্ত্বনার হাত রাখল। কথা বলল না। রনি বলল, এখন উপায়! খুবই খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি।

এটা কী ধরনের শকুনরে ভাই! জীবনেও দেখি নাই। কেন যে এই নরকপুরীতে এলাম! রুবেল বলল।

মুহিত রুবেলের কাঁধে হাত রেখে বলল, এত নেগেটিভ চিন্তা কেন করিস? বিপদের সময় পজিটিভ ভাবনা ভাবতে হবে।

এর মধ্যেই দশ ফুট লম্বা লিকলিকে দুটি লোক গুহার দুই দিক থেকে ওদের দিকে এগিয়ে আসে। বিশাল লম্বা হাত। থালার মতো গোল চোখ দুটি আগুনের মতো জ্বলছে। রাক্ষসের মতো হাঁ করা মুখ থেকে বের হচ্ছে আগুন। অন্ধকারে সেই দৃশ্য ভয়ংকর। ওরা এ জোরে চিত্কার দিয়ে ওঠে। জ্ঞান হারায় পাঁচ বন্ধু। অনেকক্ষণ পর প্রায় একই সঙ্গে ওদের জ্ঞান ফেরে। চোখ খুলতেই দেখে হাতের টর্চ দুটি জ্বলে উঠেছে। ওরা আস্তে আস্তে বসে। উঠে দাঁড়ায়। সবাই টায়ার্ড। মনও ভীষণ খারাপ। কেউ কোনো কথা বলে না। অপু কাউকে কিছু না বলে এক পা-দুই পা করে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। অন্যরা অনুসরণ করে। কিছুদূর যাওয়ার পর রুবেল বলল, আর হাঁটতে পারছি না। ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে। রনিও রুবেলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলল, পা চলছে না। মুহিত ও রাজন ওদের দুজনের হাত ধরে বলল, আমরা এসে গেছি। একটু সামনে গেলেই পেয়ে যাব গুপ্তধন। রুবেল ক্ষোভের সঙ্গে বলল, ওসব দিয়ে কী হবে? কী কাজে লাগবে? কেন যে তোদের সঙ্গে এসেছি! তাতে সমস্যা কী হয়েছে? চোখের পানি ফেলতে ফেলতে রুবেল বলে, আমার ভালো লাগে না।

মুহিত রুবেলকে সান্ত্বনা দেয়। তারপর ওকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

হঠাৎ দূর থেকে টর্চলাইটের মতো লাল আলো এসে ওদের গায়ে পড়ে। চমকে ওঠে। ভয়ে অস্থির হয়। কানে আসে পিলে চমকানো ভয়ানক শব্দ। সামনের দিকে পা ফেলতে ভয় পাচ্ছে। রুবেল মুহিতকে আঁকড়ে ধরে আছে। রনি ধরে আছে রাজনকে। অপু ভাবছে, কী করা যায়! এর মধ্যে বিশাল এক হাতি ওদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। হাতির দুই চোখ টর্চলাইটের মতো আলো ছড়াচ্ছে। সেই আলো আগুনের মতো লাল।

অপু নিজের টর্চলাইট অফ করে দিল। রাজনও অফ করল। অপু বলে, এটা কী করে সম্ভব! হাতির চোখ এভাবে জ্বলে! সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকল কী করে?

রাজন কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, এটা হাতি নয়, অন্য কিছু।

মুহিত বলল, অন্য কিছু মানে!

হাতি বেশে অন্য কিছু এসেছে।

রুবেল হাউমাউ করে কেঁদে বলে, ও মাগো! এটা আবার কী!

হাতি আরো কাছাকাছি এসে যায়। শুঁড়টি চারদিকে এমনভাবে ঘোরাতে থাকে যে গায়ে লাগলে বাঁচার উপায় নেই।

অপুর মাথায় বুদ্ধি আসে। সবাইকে বলে, ওই যে একটা ভীমের মতো দেখছিস! ওটার পাশে দেয়ালের সঙ্গে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। হাতির শুঁড় ওই পর্যন্ত যাবে না।

কেউ আর দেরি করল না। তাড়াতাড়ি ভীমের পাশে দেয়াল ঘেঁষে পাঁচজন গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়ালো। হাতির ডাকে ওদের কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার অবস্থা। কান ধরে রাখে সবাই। ভয়ে দুই চোখও বন্ধ।

হাতি একটার পর একটা পা ফেলছে আর ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠছে। হঠাৎ ওদের মনে হলো, যেন টর্নেডো শুরু হয়েছে। বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে চোখ-কান বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। সবার মুখ থেকে বের হলো—হে পরম করুণাময়, আমাদের বাঁচাও!

 

দশ.

ফটকুমামার বান্দরবানে এসে পৌঁছতে দুপুর হয়ে যায়। রাস্তায় অনেক ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়েছে। বান্দরবানে একটি গেস্ট হাউসে ওঠেন। ফ্রেশ হয়ে গেস্ট হাউসের রেস্তোরাঁয়ই দুপুরের খাবার সারেন। তারপর ডিসি সাহেবের কাছে যান। ডিসি সাহেব ফটকুমামাকে দেখে বলেন, আপনি ফটকুমামা! আপনি তো অনেক বড় মাপের গোয়েন্দা! আপনি বান্দরবানে! ভুল দেখছি না তো!

জি না। ঠিকই দেখছেন।

কী করতে পারি বলেন তো!

এসেছি পত্রিকার একটি খবর দেখে। পাঁচ কিশোর নিখোঁজ।

ডিসি সাহেব হঠাৎ যেন নিভে যান। নরম গলায় বলেন, জি। ঠিক শুনেছেন।

আমি ওই পাঁচ কিশোরকে খুঁজে বের করব।

পারবেন?

অবশ্যই। তবে আপনার সহযোগিতা লাগবে।

যা সহযোগিতা চান করা হবে।

আমার গোয়েন্দা অভিজ্ঞতা কখনো রাষ্ট্রের কাজে লাগে। কখনো ব্যক্তিবিশেষের। এ জন্য কোনো টাকা-পয়সা নিই না।

ডিসি সাহেব আবারও বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, কী বলেন! অবশ্য আপনার কথা শুনে ভালো লাগল। ওই পাঁচ কিশোরের মধ্যে আমার ছেলেও আছে।

বলেন কী! আর আপনি চুপচাপ বসে আছেন!

আসলে চুপচাপ বসে নেই। চেষ্টা করছি। সেই চেষ্টার একপর্যায়ে তো আপনাকে পেয়ে গেলাম! এখন টেনশন নব্বই ভাগ কমে গেছে।

এক শ ভাগ টেনশন ঝেড়ে ফেলেন। আপনি শুধু আমাকে সাপোর্ট দেন।

বললাম তো, যা যা লাগে...।

ওরা কোথায় কিভাবে নিখোঁজ হলো? আপনাদের কাছে কী তথ্য আছে?

নিশ্চিত কিছু নেই। তবে আমার ধারণা, ওরা পাহাড়ে কোথাও আছে। সাধারণত ওরা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের পাহাড়টাতে ঘুরতে যায়। আমি একবার আমার ছেলে অপুর কাছে গুপ্তধনের গল্প বলেছিলাম। এখানে একসময় এক রাজা ছিল। সেই রাজার অর্থ-সম্পদ ছিল; সবাই তাঁকে মান্য করত। তাই তিনি নিরাপত্তার প্রয়োজনও মনে করতেন না। একবার রাজদরবারে ডাকাতি হলো। তারপর তিনি তাঁর স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা পাহাড়ের কোনো এক জায়গায় রেখে যান। রাজার ছেলে-মেয়েরা বিদেশে চলে যায়। সেই সম্পদ পড়ে থাকে পাহাড়েই। সেই গুপ্তধনের খোঁজে অপু দু-একবার গেছে বলে মনে হয়।

পাহাড়টা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে?

জি।

একটা ক্লু পাওয়া গেল। পাহাড়েই ওদের খুঁজব। আপনি একটা কাজ করেন, দুজন সাহসী লোক দেন।

ডিসি সাহেব বললেন, ঠিক আছে, দিচ্ছি। আর কী লাগবে?

আর কিছু না। আমি নিজেই প্রয়োজনীয় সব নিয়ে এসেছি।

তার পরও বলতে পারেন। যা-ই লাগুক, সাপোর্ট দেব।

ঠিক আছে। প্রয়োজন হলে বলব। ধন্যবাদ। আমি এখন আসি। কাল সকাল থেকে অভিযানে নামব। লোক দুজনকে গেস্ট হাউসে সকাল ৭টায় আসতে বলবেন।

আমার কলিগদের সঙ্গে দেখা করবেন না?

তাঁরা কোথায় আছেন?

ওরা বাইরে আছে। আপনি আসছেন জানতে পারলে খুব খুশি হবে।

বুঝতে পারছি। কিন্তু সময় নেই।

ঠিক আছে। আপনি যান। আপনাকে আটকে রাখব না।

ফটকুমামা ডিসি সাহেবের দপ্তর থেকে সোজা গ্রিন গেস্ট হাউসে চলে এলেন। নিজের রুমে কাগজ-কলম নিয়ে বসলেন। অভিযানের ছক আঁকলেন। যেকোনো বিপদ আসতে পারে। তা থেকে বাঁচতে কী করবেন তা-ও লিখে রাখলেন।

অভিযান নিয়ে টেনশন করতে করতে ফটকুমামা ঘুমাতে পারলেন না। ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলেন। সময়মতো বিছানা ছাড়লেন। গোসল করে তৈরি হয়ে নাশতা করতে গেলেন।

৭টার মধ্যেই দুজন লোক গেস্ট হাউসে পৌঁছে ফটকুমামাকে খবর দিল।

ফটকুমামা তাদের ডেকে পাঠালেন। পালোয়ান টাইপের লোক। একজনের নাম রঞ্জন, আরেকজন সঞ্জয়। ফটকুমামা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, আপনারা কি পাহাড়ি?

জি স্যার। সঞ্জয় জবাব দিল।

কী করেন?

দুজনই হাসে। মুখে বলতে লজ্জা পাচ্ছে। এতে ফটকুমামার আগ্রহ আরো বাড়ে। তিনি প্রশ্ন করতেই থাকেন। একপর্যায়ে রঞ্জন বলল, আমরা স্যার বলি খেলি।

ও তাই নাকি! বলেন কী!

জি, স্যার।

আপনাদের দুজনের মধ্যে কার শক্তি বেশি।

সঞ্জয় বলল, স্যার দুজনেরই সমান। কখনো রঞ্জন আমাকে হারায়। আবার কখনো আমি রঞ্জনকে।

বাহ!

স্যার, আপনি শুধু নির্দেশ দেবেন। আমরা দুজন বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ব।

সাবধান! ঝাঁপ দিতে গিয়ে আবার উটকো বিপদ ডেকে আনবেন না। তা নাশতা করেছেন?

জি, স্যার। সঙ্গেও নিয়ে নিয়েছি।

ঠিক আছে। তাহলে আমরা বের হতে পারি?

জি, স্যার।

ফটকুমামা দুই পালোয়ানের মতো লোককে নিয়ে বান্দরবানের জঙ্গলের দিকে রওনা হলেন।

 

এগারো.

প্রথমে অপুর ঘুম ভাঙল। টর্চ অন করল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল, ঝড়ের পর যে অবস্থা হয়, ওদেরও তা-ই হলো। সারা গা ধুলাবালিতে একাকার। শরীরে একফোঁটা শক্তিও নেই। খিদেয় প্রাণ যায়! না আছে পানি, না আছে চিঁড়া-মুড়ি। অপু কোনোমতে উঠে রাজনকে ডাকে। রাজন, রাজন!

রাজন চোখ খোলে আবার বন্ধ করে। এরপর মুহিতকে ডাকে। মুহিত, শুনছিস?

মুহিত চোখ খোলে। ধুলাবালিতে মাখামাখি সবাই। একি অবস্থা! ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েছিলাম নাকি!

অপু বলল, অনেকটা সে রকমই।

খাবার, পানি কিছুই নেই! তাই না? মুহিত জানতে চাইল।

রাজন ঘুম থেকে উঠেই বলল, ও মাগো, যা ক্ষুধা লেগেছে!

রাজনও উঠে দাঁড়ালো। অপু বলল, ঘূর্ণিঝড় না হাতি?

হাতিও করতে পারে। শুঁড় দিয়ে যা করল! মুহিত বলল।

অপু রাজনকে বলল, রনি ও রুবেলকে ডাক। তাড়াতাড়ি যেতে হবে তো!

রাজন ডাকল বাকিদের। রনি, রনি! রুবেল, রুবেল!

দুজনই লাফিয়ে উঠল। পেটে দানাপানি কিছু না পড়লে হাঁটাই মুশকিল। অপু করুণভাবে বলল, শরীরে এক রত্তি বল নেই।

চল, ফিরে যাই! রুবেল বলল।

এখান থেকে ফিরে যাব? মানে পুরো অভিযান মাটি!

রনি বলল, মিছামিছি গুপ্তধনের খোঁজে যাচ্ছি। মনে হয় না কিছু পাওয়া যাবে।

রাজন আপত্তি জানিয়ে বলল, কিছু পাওয়া না যাক। এসেছি যখন, দেখি না শেষ পর্যন্ত কী হয়!

রুবেল বিরক্তির সঙ্গে বলল, রাজন তুই চুপ কর তো!

মুহিত রুবেলকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, রাগ করিস না। আমাদের অবস্থাও তোর মতো খারাপ। তার পরও অপু যখন বলছে চল না; আরেকটু সামনে আগাই!

অপু নরম গলায় বলল, আমরা খুব কাছাকাছি এসে গেছি। আর দশ মিনিট হাঁটলেই গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে যাব।

হ, বলেছে তোরে! তুই কী করে জানিস? রুবেল বলল।

আয় আমার সঙ্গে।

অপু রুবেলের কাঁধে হাত রাখল। ওর দেখাদেখি রাজন, মুহিত ও রনি হাত ধরাধরি করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। দুটি টর্চলাইটই জ্বলছে।

রুবেল একেবারেই কাবু। আর পা আগাচ্ছে না। ওর কান্না পাচ্ছে। চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলল, আর পারছি না। আমাকে ধর!

রুবেলের কান্নাকাটি রনিও সহ্য করতে পারল না। সে-ও কাঁদতে শুরু করল। রনি বলল—অপু, তুই কোথায় নিয়ে এলি! এরপর হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আর পারছি না।

অপু দুজনকেই জড়িয়ে ধরে কয়েকবার বলে—স্যরি, আমি সত্যিই স্যরি। আমি বুঝতে পারিনি, অভিযান এতটা কঠিন হবে।

রাজন সান্ত্বনা দিয়ে বলল, চল আর পাঁচ মিনিট হাঁটি। তার পরও যদি না পাই, তাহলে ফিরে যাব। কথা দিচ্ছি।

তোর কথাও বিশ্বাস করি না। তুই আর অপু এক রকম কথা বলিস। রুবেল বলল।

মুহিত বলল, আচ্ছা আমি কথা দিচ্ছি। গুনে গুনে আর বিশ কদম। না পেলে ফিরে যাব।

ফিরে যাব কিভাবে? এখান থেকে তো হেঁটেই বের হতে হবে নাকি?

মুহিত কোনো কথা বলল না। আসলে ওর এই প্রশ্নের জবাব ওর জানা নেই। ওর নিজেরও তো একই অবস্থা।

রনি বলল, কিছু না খেতে পারলে আমি বাঁচবই না!

অপু কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। টেনশনে ওর মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল। ও মনে মনে ভাবে, কোথাও পানি পেলেও হতো। সুড়ঙের চারদিকে ভালো করে তাকায়। না, কোথাও নেই। অপু রাজনের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর বলে, চল না আরেকটু চেষ্টা করি।

একজন আরেকজনকে ধরাধরি করে সামনের দিকে আগায়। কিছুটা পথ যাওয়ার পর হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। সুড়ঙের প্রায় প্রান্তে পৌঁছে যায়। সার্চলাইটের আলোর ঝলকানি ওদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। কিছুই দেখতে পায় না। পা-ও আর সামনে চলে না। পাঁচ বন্ধু আবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। 

 

          (চলবে)

মন্তব্য