kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

গল্প

অমানিশা

ডিউক জন

৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অমানিশা

কী এমনঅপরাধচরম এই পরিণতি ডেকে আনল অমন ভালো মানুষটার? শরীরের সব রক্ত শুষে নিয়ে যেন ছোবড়া বানিয়ে ফেলা হয়েছে পৃথুল মানুষটাকে! কী বীভৎস!

 

এক

ষাট-পঁয়ষট্টি মনে হয় দেখে, আসলে পঞ্চাশের কোঠায় ডেভিড হুইটম্যানের বয়স। অতীতের একটা অপরাধবোধ দ্রুত বুড়িয়ে দিয়েছে তাঁকে। তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে পুরনো পাপের অন্তর্দাহটা।

ধূসর, পাতলা চুল ভদ্রলোকের মাথায়। ব্রহ্মতালুতে টাক পড়েছে গোল হয়ে। পাকানো, পুরু গোঁফ ঠোঁটের ওপর। জ্বলজ্বলে সবুজ চোখে নীল বেদনার ছায়া। শরীরে মেদ জমেছে হুইটম্যানের। দিনের পর দিন পরিশ্রম না করার ফল। অথচ রোদে পোড়া চামড়া সাক্ষ্য দিচ্ছে ঠিকই, ঘরের চেয়ে বাইরেই কাটিয়েছেন তিনি জীবনের বেশির ভাগ সময়।

 

কাজপাগল মানুষ ছিলেন। আলসের ধাড়িদের দেখতে পারতেন না দুই চোখে। একেবারেই ধাতে ছিল না তাঁর বসে থেকে সময় নষ্ট করা। কিছু না কিছু করতেই হবে সব সময়। এই হয়তো কাঁটাতারের বেড়া বসাচ্ছেন র্যাঞ্চের চারধারে, এই আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগিয়ে বশ করছেন বুনো, বেয়াড়া ঘোড়াকে। কাজের কি শেষ আছে কোনো? কুড়াল দিয়ে লাকড়ি ফাড়তে হবে...হাত লাগাও। মেরামত প্রয়োজন পিকেট ফেন্সের...হাত লাগাও। তারপর রয়েছে ওয়াগেনভর্তি খড় খালাস—ভারী ফর্কের সাহায্যে সেটিও করেছেন শক্ত হাতে। শীত আসছে...শীতকালের উপযোগী করে তোলা চাই গোলাটাকে—সে-ও তো কম ঝক্কির কাজ নয়। সবই দুহাতে সামলেছেন হুইটম্যান। সারা দিনের প্রচণ্ড খাটুনির পর আরাম করে বসতেন গিয়ে র্যাঞ্চ হাউসের দাওয়ায়। তারিয়ে তারিয়ে কফি খেতে খেতে উপভোগ করতেন সূর্যের ডুব, চাঁদের শুভ্র হাসি। মনে হতো, এই তো জীবন!

আর আজ? সামান্য ভারী কিছু তুলতেই হাঁফ ধরে যায়।

কর্মফল! এ ছাড়া আর কী? ডক্টর জোন্স তো হালই ছেড়ে দিয়েছেন। লোকটার ধারণা, সমস্যাটা স্নায়বিক। বংশগত।

হালকা টুংটাং ভেসে আসছে বৈঠকখানা থেকে। ওঘরে পিয়ানো বাজাচ্ছে ওঁর ভাতিজি। মা-বাবা মরা এই মেয়েটাই হুইটম্যানের সমস্ত দুনিয়া। নিজে বিয়ে করেননি, সে জন্য বাইরের লোকের কাছে দূরসম্পর্কের ভাইয়ের মেয়েকেই নিজের মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন র্যাঞ্চার।

একটা ঘুঘু ডেকে উঠল কোথায় যেন।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভদ্রলোক। কিন্তু তাতেও হালকা হলো না বুকটা। তাকালেন কোলের ওপর ফেলে রাখা পিস্তলটার দিকে।

লোভ লাগছে! কিছুতেই মনস্থির করে উঠতে পারছেন না যদিও। প্রিয় বাসভূমি আর ততোধিক প্রিয় কন্যাসম ভ্রাতুষ্পুত্রীর পিছুটান সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দিচ্ছে বারবার। মেয়েটার জন্য অবশ্য দুশ্চিন্তা নেই। এক রকম ঠিক করেই রেখেছেন ওর ভবিষ্যত্টা। কিন্তু মায়া? মায়া যে বড় কঠিন জিনিস! আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে মানুষকে। কিছুতেই ছাড়তে চায় না। ছোট্ট একটা ঘাসফুল, এলোমেলো বাতাসে উড়ে যাওয়া ফুলের পাপড়ি, শিশিরকণা, স্বর্ণালি রোদ, প্রজাপতির রং, ফড়িঙের দুরন্তপনা, মেঘের অন্তহীন আসা-যাওয়া, গাছের পাতায় ঝিরিঝিরি কাঁপন, টমেটোর লাল, যবের মিষ্টি ঘ্রাণ, বাগানবিলাস ফুলের উজ্জ্বলতা, জোনাকির ঝিকিমিকি...জীবনের এত সব রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ ছেড়ে যেতে সায় দেয় না মন।

কিন্তু এই-ই তো সব নয়। এগুলোর চেয়েও বড় হচ্ছে মনের শান্তি। আর সেটাই যে বিদায় নিয়েছে তাঁর জীবন থেকে!

মেয়েটার বিয়ে দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন? ...পারছেন না! সত্যিই পারছেন না আর তিনি! অপরিসীম ক্লান্তি দেহ-মনজুড়ে।

পিস্তলটা হাতে উঠে এলো হুইটম্যানের। বাঁটটা সাদা, আইভরির। ধীরে ধীরে কপালের দিকে উঠে যাচ্ছে হাতটা। আঙুলের চাপে কপাল ভেদ করে বেরিয়ে যাবে পয়েন্ট ফোর ফাইভ ক্যালিবারের তপ্ত বুলেট। র্যাঞ্চ ইয়ার্ড ছাড়িয়ে চলে যাবে আরো অন্তত দেড় শ গজ। তারপর ক্লান্ত, অবসন্ন, রক্তাক্ত দেহে লুটিয়ে পড়বে মাটিতে।

দুই.

গোটা পপলার শহর ভেঙে পড়েছে যেন হুইটম্যানদের পারিবারিক গোরস্তানে। শেষ বিদায় জানাতে এসেছে ওরা কফিনের ভেতর শায়িত মানুষটাকে, একসময় যিনি ছিলেন ওদেরই একজন। কুশলাদি বিনিময় করেছেন দেখা হতে...সময়ে-দুঃসময়ে দাঁড়িয়ে গেছেন পাশে।

আত্মার সদ্গতির জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, গোর দেওয়ার নিয়ম, অন্ধকার ঘনানোর আগেই। চলছে তারই প্রস্তুতি।

র্যাঞ্চের পেছনেই কবরখানা। গজ পঞ্চাশেক তফাতে। জায়গাটা সুন্দর—ছায়াময়, ঘাসে ছাওয়া। পান্নার মতো সবুজ ঘাসের রং।

টিলার সারি কবরস্তানের একদিকে। জাত-বেজাতের গাছগাছালি জন্মেছে ঢালে। ভূতুড়ে শব্দ তোলে ডাল-পাতা। বুটহিলের থমথমে নির্জনতায় ঠিক যেন পার্থিব মনে হয় না এসব আওয়াজ। মনে হয়, কানাকানি করছে অতৃপ্ত আত্মারা।

গত রাতে বৃষ্টি হয়েছে। প্যাচপেচে কাদা হয়ে আছে সমাধিস্থলটার জায়গায় জায়গায়। ছপ-ছপাত আওয়াজ উঠছে বুট জুতার তলায়। তবে কারো মুখে বিরক্তির ছাপ নেই।

মাথার ওপর ভিড় করে থাকা ধূসর মেঘও যেন একাত্ম হয়েছে ডেভিড হুইটম্যানের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে।

সৌম্যকান্তি বৃদ্ধ যাজক প্রার্থনা আওড়াচ্ছেন খ্রিস্টানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে। বুড়ো মানুষটির ভরাট গলায় শোক নেই—যদিও বিমর্ষ দেখাচ্ছে মুখখানা—রয়েছে ঘুম ঘুম আমেজ।

একটা রবিন পাখি আপন মনে গান গাইছে ফুলে ভরা আপেলগাছের ডালে। পাখিটার এই কূজন ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে না বিশপের প্রার্থনায়, বরং ভিন্ন এক দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে যেন।

ধনী-গরিব সবাই জড়ো হয়েছে সত্কার অনুষ্ঠানে। জাতিভেদও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। স্প্যানিশ, মেক্সিকান, ফ্রেঞ্চ আর ডাচ্ পড়শিরা তো এসেছেই, চীনা আর আদিবাসীরাও শ্রদ্ধা জানাতে শামিল। পাথুরে গাম্ভীর্য সবার মুখে। মৃতের প্রার্থনায় কান যেমন রয়েছে, তেমনি আবার নিজস্ব রীতিতে মাগফেরাত কামনা করছে রুহের। দু-চারজনের অবশ্য মন নেই এসবে। বিভোর ওরা আপন ভাবনায়। জগতের অমোঘ সত্যটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিহ্বল হয়ে পড়েছে। এই তো, জীবিত ছিলেন মানুষটা, এখন আর নেই। মৃত্যু নিয়ে গেছে তাঁকে। সবাইকেই যেতে হবে এভাবে। বিদায়ের ঘণ্টা বাজবে, একবুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে চিরতরে পাড়ি দিতে হবে অজানা গন্তব্যে। কিন্তু মিস্টার হুইটম্যানের অপমৃত্যু হলো বলেই যেন বেশি করে বুকে লাগছে কষ্টটা। কী এমন ‘অপরাধ’ চরম এই পরিণতি ডেকে আনল অমন ভালো মানুষটার? শরীরের সব রক্ত শুষে নিয়ে যেন ছোবড়া বানিয়ে ফেলা হয়েছে পৃথুল মানুষটাকে!

কী বীভত্স!

করল কে এমন জঘন্য এই পৈশাচিক কাজটা? মানুষই তো? নাকি...

উপস্থিত প্রত্যেকের মগজে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশ্নগুলো।

বিষবাষ্পের কালিমা লেগে গেছে সাদাসিধা ক্যাটল-টাউনটার রেকর্ডবুকে। ফেনিয়ে ওঠা অশান্তির আগাম আভাস বাতাসে। এ কোন অশনিসংকেত শান্তিপ্রিয় নগরবাসীর জীবনে?

আয়তাকার একটি বেদির মতো বানানো হয়েছে কাঠ দিয়ে। দামি কাঠের কালো শববাক্সটা রাখা হয়েছে মঞ্চের ওপর, ডালাটা নামানো।

প্রয়াত হুইটম্যানকে শেষ দেখা দেখার সৌভাগ্য হয়নি বেশির ভাগেরই। এমনকি সিলভিয়া হুইটম্যানও মরা মুখটা দেখতে পায়নি চাচার। সইতে পারবে না ভেবে নিরস্ত করেছে ওকে পাড়া-পড়শিরা।

কফিনের মাপে কবর খোঁড়া হয়ে গেছে হুইটম্যানের জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই নামানো হবে লাশটা।

শোকার্ত নারীদের দলটার দিকে ঘাড় ঘোরালেন পাদ্রি।

বিশাল বপু মাদাম দেফার্জের কাঁধে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিলভিয়া। শোকের কালো পোশাক পরনে। অর্ধস্বচ্ছ নেকাবে আড়াল করা মুখটা। থেকে থেকেই পিঠটা কেঁপে উঠছে ওর। এখনো হয়তো চোখের পানি ফেলছে নীরবে।

চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বুড়ো। বিশাল এই পৃথিবীতে পুরোপুরি একা হয়ে গেল মেয়েটা। আংকল ডেভিডই ছিলেন ওর সমস্ত পরিবার, দূরের হলেও একমাত্র আত্মীয়।

মিস হুইটম্যানের জন্য কিছু করতে ইচ্ছা করছে পাদ্রির। কিন্তু কী-ই বা করবেন তিনি? মেয়েটির মুখে হাসি ফোটানোর একটাই মাত্র উপায়—কার্নিভালের ম্যাজিশিয়ানের মতো মরা মানুষকে জ্যান্ত করে দেওয়া। সেটি তো সম্ভব নয়।

কালো স্যুট। কালো টাই। সিলভিয়া মেয়েটির কাছাকাছিই দাঁড়িয়েছে ক্লার্ক হুইটফিল্ড। দুই হাত এক করে ধরা সামনের দিকে। সাদা একটা ফেডোরা হ্যাট চেপে ধরে রেখেছে শরীরের সঙ্গে। মাথাটা নত। বিয়ের কথাবার্তা চলছিল ওর মেয়েটির সঙ্গে।

ঘাড় ফিরিয়ে আরেক দিকে চাইলেন পাদ্রি। দেখতে পেলেন মার্শাল ফিল কোহেনকে। কিছুটা দূরে দাঁড়ানো জটলা থেকে।

সরকারি ইউনিফর্মের ওপর কালো জ্যাকেট চাপিয়েছে মার্শাল। মুখটা বেদির দিকে ফেরানো। চোখে কাচের মতো স্বচ্ছ দৃষ্টি। মনে হচ্ছে, বাস্তবে নেই সে। হারিয়ে গেছে অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে।

পবিত্র শ্লোক আওড়ানো শুরু হলো শবমঞ্চ সামনে রেখে। অনেকক্ষণ ধরে চলে এই আবৃত্তি। শেষই আর হতে চায় না যেন।

একপর্যায়ে বৃষ্টি শুরু হলো গুঁড়ি গুঁড়ি। চেরোকি পাহাড়ের কোল ছুঁয়ে এলো কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস। বহুদূর থেকে বয়ে নিয়ে আসছে গির্জার গুরুগম্ভীর ঘণ্টাধ্বনি—ঢং! ঢং!!

মৃদু হ্রেষা করে উঠল কয়েকটি ঘোড়া।

তাগিদ অনুভব করলেন পাদ্রি। শেষ কয়েকটা লাইন উচ্চারণ করছেন এখন বাইবেল থেকে। যুগ যুগ ধরে অসংখ্য মৃতের শান্তি কামনায় উচ্চারিত হয়েছে কথাগুলো।

একসময় শেষ হলো আনুষ্ঠানিকতা। কবরে নামানো হলো কফিন। চাপাও পড়ল মাটির নিচে। লোকজন ক্রস আঁকতে লাগল যার যার বুকে।

শেষবারের মতো গ্রেভস্টোনটা দেখে নিয়ে ফিরে যেতে শুরু করেছে সমবেতরা। কেউ কেউ ফুল রেখে যাচ্ছে কবরে। দীর্ঘশ্বাস চাপছে এপিটাফের লেখাগুলো পড়ে।

পাদ্রি পথ ধরলেন নিজের। গেল হপ্তায় চার্চে গিয়ে ওঁর কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন হুইটম্যান। নিরীহ এক লোককে খুন করেছিলেন নাকি যুবক বয়সে। ওই খুনের দায় মাথায় নিয়ে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছে নিরপরাধ আরেকজনকে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা বিবেকের দংশন অসহ্য হয়ে ওঠায় আত্মহননের পথ বেছে নিতে চেয়েছিলেন সিলভিয়ার চাচা। সাহসে কুলায়নি শেষ পর্যন্ত।

সব শুনেটুনে হুইটম্যানের রক্তে নিজের তৃষ্ণা মেটানোর ব্যাপারে দুবার ভাবতে হয়নি বিশপের। না, ক্রুশ বা বাইবেল কোনো প্রভাবই ফেলতে পারে না পাদ্রির ছদ্মবেশে থাকা মিরিয়েলের ওপর। কারণ তিনি যে সময় ভ্যাম্পায়ার হয়েছিলেন, তারও প্রায় এক হাজার বছর পর জন্মগ্রহণ করেন যিশুখ্রিস্ট!

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা