kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

ফোকাস

হাতখরচে লাগাম

মন এটা চায় ওটাও চায়, আর দোষ পড়ে হাতের ওপর! খরচে হিসেবি না হলে পরে আবার দেখা যাবে বেজার হয়ে আছে মনটা। তাই সময়মতো হাতখরচে টানা চাই লাগাম। উপায় জানাচ্ছেন জুবায়ের ইবনে কামাল

৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হাতখরচে লাগাম

অপশন অনেক, তবে কিনতে হবে প্রয়োজন বুঝে

হলিক্রস কলেজের শ্রাবণী পাল। ফ্রিস্টাইলে নাচতে নাচতে সে এখন মঞ্চেও নাচে। সে হিসেবে নাচ হওয়া উচিত ছিল তার খরচের রাস্তা। কিন্তু নাচ নয়, তার খরচ হয় বেশি খানাপিনা আর ঘোরাঘুরিতে। পরে দেখা গেল, নাচের জন্য দরকারি পোশাক বা গয়নাটা কেনার সময় পার্স একেবারে খালি।

হাতখরচ কোথায় যায়, তার উত্স শ্রাবণী খুঁজে না পেলেও তা জানা আছে সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী মিথিলা দের কাছে। মায়ের থেকে হাতখরচ নেয় একটু বেশি করেই। যার বেশির ভাগই শেষ হয়ে যায় বাইরে খেয়ে। বাইরে কেন এত খেতে হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে মিথিলা দলছুটকে জানায় তার দুঃখের কথা। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় নাকি ফুড ক্যাফেগুলো তাকে ডাকে। এই ডাক মিথিলা ছাড়া কেউ শুনতে পায় না। মিথিলা আবার কারো ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারে না। এ জন্যই ডাক শুনে মিথিলা মাসজুড়ে দৌড়ে বেড়ায় রাজধানীর বিভিন্ন বুক ক্যাফেতে। আর ফলাফল মাস শেষে তার ওয়ালেট ফাঁকা।

এই কথা বলতে না বলতেই শ্রাবণী জানাল, তার একটা রাস্তার কথা মনে পড়েছে, যেটা দিয়ে তার হাতখরচের বেশ কিছু অংশ খরচ হয়ে যায় নিয়মিত। আর তা হলো, সপ্তাহে এক দিন অন্তত একজন পথশিশুকে ভরপেট খাওয়ানো। ওরা তো আর সব সময় পেট ভরে খেতে পারে না। তার চেয়ে বড় কথা, ওদের খাওয়াতে তেমন খরচও হয় না। এটা শুনে আমিও ভাবলাম, শ্রাবণীর সঙ্গে যোগ দেব। তুমিও কিন্তু হাতখরচের টাকা জমিয়ে হাসি ফোটাতে পারো কোনো এক সুবিধাবঞ্চিত শিশুর মুখে।

হলিক্রস স্কুলের একজনকে পাওয়া গেল। নাম লামিশা। লামিশার হাতখরচের পুরো টাকাই খরচ হয় কোক খেতে খেতে। কোকা-কোলা থেকে গিয়ার কোলা—সবই তার গলা একবার না একবার ঠিকই ভিজিয়েছে। কিন্তু শারীরিক সমস্যার কারণে কোমল পানীয়কে না বলতে হয়েছে স্থায়ীভাবে। লামিশার এখন স্লোগান, ‘কোল্ড ড্রিংকসকে না বলুন।’

এতক্ষণ তো শুধু খাবারের কথাই শুনলাম। এবার না হয় অন্য কিছু শোনা যাক। আইডিয়াল স্কুলের উম্মুল ফাতিমা বর্ষণ রংতুলি কিনেই শেষ করে ফেলে পুরো হাতখরচের টাকা। যেখানে-সেখানে নতুন বা পুরনো রংপেনসিল দেখলেই কিনে ফেলাটা দায়িত্ব মনে করে বর্ষণ। ঠিক তার মতো একই অবস্থা ফয়জুর রহমান আইডিয়াল ইনস্টিটিউটের অতসীর। অতসী মূলত গানে ভালো হলেও ছবি আঁকায় তার আগ্রহের সীমা নেই। তাই মাসজুড়ে নতুন নতুন আঁকার সরঞ্জাম কেনায় তার পকেট বা পার্স যা-ই বলো না কেন, সব উজাড় করে এসব কিনে ফেলে বর্ষণ ও অতসী।

 

আরেক খাবারপাগলের কথা না বললেই নয়। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ কলেজের তানভীর ধ্রুবর হাতখরচের অর্ধেক টাকা চলে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার হাকিম চত্বরের খিচুড়ি ও টিএসসির চা খেতে খেতে। তানভীর ধ্রুব আরো দাবি করে যে বাকি অর্ধেক টাকা দিয়ে কী কী করা যায় তার জন্য পরামর্শ করতে গেলে ধ্রুবর বান্ধবী ভিকারুননিসায় পড়ুয়া মায়িশা ঐশীই নাকি বাকি টাকা খেয়ে ফেলে। পরামর্শের নামে এভাবে হাতখরচ আত্মসাতের ব্যাপারে বেশ দুঃখ প্রকাশ করে তানভীর ধ্রুব।

এত এত খরচে লাগাম দেওয়া যাচ্ছে না কেন? হাতখরচের নামে এভাবে দেদার খরচ থেকে বিরত থাকলে ক্ষতিটা কোথায়! এ সম্পর্কে জানতে আমরা হাজির হয়েছিলাম এক বড় ভাইয়ের কাছে। ‘আসলে বাইরে খেয়ে টাকা নষ্ট করার কোনো মানে হয় না, আমাদের ঘরের খাবার...’ এটুকু বলেই তিনি কামড় বসিয়ে দেন বাইরে থেকে কেনা একটি বিফ বার্গারে। পরবর্তী কামড়ের আগেই চলে আসি সেখান থেকে।

যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত আমাদের এ বিষয়ে একটি সমাধান দিয়েছে গুগল ও কয়েকটি নামকরা ওয়েবসাইট।

প্রথমত, জমানো টাকা দিয়ে যা ইচ্ছা তাই করা যায়। কিন্তু ধরো তুমি ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করো। বেশ ভালোও খেলো। কিন্তু তোমার নেই কোনো ভালো ব্যাট। অন্যের ব্যাট ধার করে আর কত দিন! স্কুলে থাকা অবস্থায় মা-বাবার কাছ থেকে হাতখরচের জন্য নেওয়া টাকা থেকেই ব্যাট কিনে প্র্যাকটিস করতেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। তা ছাড়া পেশাদার হিসেবে খেলতে গেলে শুধু ব্যাট কিংবা বল নয়; বরং একজন ব্যাটসম্যানের দরকার হয় লেগ প্যাড, গ্লাভস কিংবা মাথা বাঁচানোর হেলমেট।

এ ছাড়া শুধু হাতখরচ বাঁচিয়েই বন্ধুদের সঙ্গে মিলে কিন্তু করে ফেলতে পারো ছোটখাটো পিকনিক। আজীবন মনে রাখার মতো একটি অভিজ্ঞতা পেয়ে যাবে এতে। এ ছাড়া নিজের যেকোনো প্রয়োজন পূরণের জন্য হাতখরচ থেকে বেঁচে যাওয়া টাকাই হতে পারে তোমার সম্বল।

 

পয়সা বাঁচানোর যত বুদ্ধি

♦ এখনই খুলে ফেলতে পারো একটি ব্যাংক বা পোস্ট অফিসে সঞ্চয়ী হিসাব। এখন প্রায় প্রতিটি ব্যাংকেই স্টুডেন্টদের জন্য বিশেষ অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা থাকে। যেগুলোয় কিছু সুবিধাও পাওয়া যায়। সেখানে টাকা জমাতে পারো নিয়মিত। তা ছাড়া একটি অ্যাকাউন্ট থাকলে তোমার নিজেরও টাকা জমাতে ইচ্ছা করবে। ব্যাংকে তোমার জন্য খোলা অ্যাকাউন্টটা নিশ্চয়ই তুমি খালি রাখতে চাও না!

 

♦ বাসায় খাওয়ার অভ্যাস করো বেশি করে। বাইরে বের হলে সঙ্গে টিফিনবক্স রাখার প্র্যাকটিস করো। বাইরে খাওয়ার খরচটা দেখবে দুম করে অর্ধেকে নেমে এসেছে। আমাদের অনেকেরই ধ্রুব বা মিথিলার মতো বাইরে খাওয়ার অভ্যাস বেশি। এটা ছাড়তে পারলেই অনেক টাকা বাঁচে। আবার বাইরের খাবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেও বেঁচে গেলে। সঙ্গে সব সময় পানির বোতল রাখলে দেখবে, ১৫ টাকা দিয়ে আর আধালিটার পানি কিনতে হচ্ছে না। মাস শেষে এই পনেরো টাকাই দেখবে অনেক বড় অঙ্কের সঞ্চয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

♦ নিজেই অভ্যাস করো নিজের কফি বানানোর। খেয়াল করলে দেখবে, আমরা প্রায় সবাই দিনে কয়েক দফা চা বা কফি খাই। এটা ভালো পানীয় হলেও বেশি বেশি কিছুই ভালো নয়। তাই যদি নিজের চা নিজেই বানিয়ে খাও, মাস শেষে দেখবে অনেকটাই বেঁচে গেছে হাতখরচ।

 

♦ চালাও সাইকেল। বেঁচে যাবে রিকশাভাড়া। সঙ্গে ঠিক থাকবে শরীর ও মনটা। সাইকেল চালানোর সময় হেলমেট পরতে ভুলবে না আবার। সাইকেল কেনার টাকা কোথায় পাবে! ওই যে পানি বা বাইরে খাওয়ার জন্য যে বাজেটটা ছিল, ওটা দিয়েই কিনে ফেলো কম দামি ছোটখাটো একটা সাইকেল।

 

♦ অধিক খরুচে বন্ধুদের এড়িয়ে চলো। ধনী বন্ধুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেদার টাকা না উড়ালে প্রেস্টিজ থাকবে না—এমনটা আজকাল বোকারাও ভাবে না। তা ছাড়া তুমি ধনী হলেই বা কেন বেশি খরচ করবে? অপ্রয়োজনীয় খরচের ফল সুখকর নয়। ভবিষ্যতে এটিও তোমার একটা ধ্বংসাত্মক কু-অভ্যাস হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

♦ শপিং করতে যারা মাত্রাতিরিক্ত পছন্দ করো, তারা মার্কেটে যাওয়ার আগেই একটা খসড়া তালিকা তৈরি করে নাও। এরপর ওই তালিকার জন্য প্রয়োজনীয় টাকাটাই সঙ্গে রাখবে। এর বেশি নয়। তখন কিছু দেখে লোভ লাগলেও কিনতে পারবে না। কিছু কেনার ক্ষেত্রে আরো দুটি জিনিস খেয়াল রাখলে তোমার খরচে লাগাম পড়বে। ট্রেন্ডি হওয়ার জন্য দামি ব্র্যান্ডের পেছনে ছুটতে যেয়ো না। তার চেয়ে ভালো জিনিস চিনতে শেখো। টি-শার্টের ক্ষেত্রে কাপড়ের মান (জিএসএম, ফ্যাব্রিকস)—এসব বুঝে নাও। আর জেনে নাও এসবের সত্যিকারের উত্পাদন খরচ কত। এটা সত্য যে ঝলমলে দোকানে যে টি-শার্টটার দাম হাজার টাকা লেখা, সেটির উত্পাদন খরচ হতে পারে বড়জোর ১০০ কি ১৫০ টাকা। সুতরাং দামি মানেই খুব ভালো কিছু নয়। আর হ্যাঁ! ডিসকাউন্টের দিকেও নজর রেখো। আজকাল সব কিছুতেই ডিসকাউন্টের ছড়াছড়ি। তবে সেই ডিসকাউন্ট ব্যবহার করবে শুধু কাজের জিনিসের বেলায়ই। ডিসকাউন্ট আছে বলেই কিনে ফেলতে হবে এমন নয়। হোক সেটি দামি কোনো শার্ট বা ইন্টারনেটের প্যাকেজ। ডিসকাউন্ট মানেও কিন্তু একটা ফাঁদ!

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা