kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

তিন গোয়েন্দা

আকাশদস্যু

কাহিনি রচনাঃ কাজী শাহনূর হোসেন, তিন গোয়েন্দায় রূপান্তরঃ শামসুদ্দীন নওয়াব

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



আকাশদস্যু

আঁকা : মানব

[গত সংখ্যার পর]

 

 

‘না, ধন্যবাদ!’ কোরাসে বলল তিন বন্ধু।

মহিলা অবশ্য ওদের আপত্তি কানে তুললেন না, সবার জন্য আরেক কাপ করে চা ঢাললেন।

‘কে এই জাদুকর ওয়াল্টার?’ মুসা জবাব চাইল।

‘ওহ, সে! এই উপত্যকা শাসন করে ওই জাদুকর। বহু বছর আগে আসে এখানে, এক রকম আকাশ থেকে পড়ে বলতে পারো। প্রথমেই বিজ্ঞানচর্চা নিষিদ্ধ করে সে। তারপর এমন জাদু করে যেন মেঘেরা কখনোই সরে না যায়। মেঘের দল খুদে লামা, অর্থাৎ আমাদের আধ্যাত্মিক নেতাকে রক্ষা করে, তিনি যাতে কখনোই বুড়ো না হন।’

‘জাদু?’ প্রশ্ন করল কিশোর। ‘আমরা জাদুটোনা বিশ্বাস করি না।’

‘জাদুকর ওয়াল্টার আসার আগে আমিও করতাম না। তার ম্যাজিকে অবশ্য কাজ হয়। গর্জনশীল হিমবাহ থেকে আসা মেঘপুঞ্জ গত ৫০ বছর ধরে শারমা-লা উপত্যকাকে ঢেকে রেখেছে এবং খুদে লামা এই ৬৫ বছর বয়সেও ছেলেমানুষ রয়ে গেছেন! কেউ এই উপত্যকা ছেড়ে যায় না, কারণ বেরোনোর একমাত্র পথ ওই ভয়ংকর হিমবাহ। আর কে-ই বা চায় মহান ইয়েতির রোষানলে পড়তে?’

‘ওটা হিমবাহে থাকে?’

‘হ্যাঁ, ওটা মাদি ইয়েতি। সে-ই গর্জায় আর নাক দিয়ে মেঘ ছড়ায়, এটা আমার ধারণা। আরো চা চলবে?’

‘আর না!’ একসঙ্গে মাথা নাড়ল ওরা, কিন্তু ওল্ড রোজ তোয়াক্কা না করে আরো চা ঢাললেন তিনজনের জন্যই।

‘খাইছে, তার মানে বাইরের জগতের কথা এখানকার কেউ জানে না?’ মুসা জিজ্ঞেস করল।

‘না, জাদুকর ভ্রমণ নিষিদ্ধ করার পর থেকে।’ জানালেন ওল্ড রোজ। ‘আমি নিজের জন্য ভাবি না। আমি দুনিয়া দেখেছি কিংবা ইংল্যান্ড অথবা নিদেনপক্ষে অক্সফোর্ড। আমি এমনকি কখনোই বিয়েও করতে চাইনি, কারণ লর্ড বায়রনকে আমার মতো ভালোবাসে এমন লোকের দেখা আজও পাইনি। কিন্তু বাচ্চাদের জন্য খারাপ লাগে।’

কবিতার বইটা তুলে নিলেন তিনি। প্রচ্ছদটায় পরম মমতায় আঙুল বোলানোর সময় তাঁর বয়স্ক মুখে অদ্ভুত সুন্দর এক স্মিত হাসি খেলা করতে লাগল।

‘জাদুকর ওয়াল্টারের রাজ্যে কবিতা পড়াও বারণ, কারণ কবিতা মানুষের কল্পনার দুয়ার খুলে দেয়, হৃদয়কে প্রসারিত করে। জাদুকরের পুলিশরা এ বই খুঁজে পেলে নির্ঘাত পুড়িয়ে ফেলবে। কিন্তু কে পরোয়া করে? আমার তো পুরো বইটাই মুখস্থ। এখন তোমাদের কথা বলো—’

‘এ তো দেখি হীরক রাজার দেশে এসে পড়লাম।’ বলল কিশোর মনে মনে।

তিন গোয়েন্দা পরস্পর চোখাচোখি করে ওদের পাশে মাটির মেঝেতে বসে থাকা বৃদ্ধার দিকে তাকাল এবং একটি সুযোগ নিতে চাইল। ওদের সাহায্য চাই; সে জন্য কারো কাছে সব কথা খুলে বলা দরকার। এবং ওল্ড রোজের মধ্যে এমন একটা কিছু আছে—সম্ভবত তাঁর সরলতা—যে জন্য তাঁকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করল ওদের।

মুসা বৃদ্ধাকে জানাল, নিখোঁজ বৈমানিকদের সন্ধান করতে এসে কিভাবে আকাশদস্যুদের পাল্লায় পড়েছে ওরা। রবিন বলল, কিভাবে বব আর্থার আর বাঘা আকাশদস্যুদের সঙ্গে লড়তে গিয়ে বিমান থেকে পড়ে গেছে এবং সব শেষে কিশোর জানাল, হীরু চাচা আর চায়না বিলকে কিভাবে অপহরণ করা হয়েছে।

‘আকাশদস্যু, তাই না?’ সব শুনে বললেন ওল্ড রোজ। ‘ওরা নিশ্চয়ই জাদুকরের টহলদার, গর্জনশীল হিমবাহে একমাত্র ওদেরই সহ্য করে মহান ইয়েতি। আমি ওদের এক ধরনের কমলারঙা ডানা পরে ভেসে বেড়াতে দেখেছি।’

‘ওরা মনে হয় না আমাদের খুঁজছে,’ বলল কিশোর। ‘ওরা হয়তো ছোটদের পাত্তাই দেয় না।’

‘অনেকেই দেয় না।’ বললেন রোজ। ‘সেটা বরং তোমাদের জন্য বাড়তি সুবিধা হতে পারে। সমস্যা হচ্ছে, তোমার চাচা আর এই চায়না বিল ভদ্রলোক যদি ধরা পড়ে থাকেন, তাহলে এখন শহরে আছেন।’

‘উপত্যকার গভীরে?’ মুসার প্রশ্ন।

মাথা ঝাঁকালেন বৃদ্ধা।

‘বিশাল দুর্গে। সন্দেহজনক আগন্তুকদের ওখানে নিয়ে যাওয়া হয়। তোমাদেরও দেখতে পেলে গ্রেপ্তার করবে ওরা। তবে তোমাদের শহরে পাঠানোর একটা প্ল্যান আছে আমার।’

‘কী সেটা?’ রবিন জিজ্ঞেস করল।

‘ধীরে, বৎস, ধীরে।’ বললেন ওল্ড রোজ। ‘প্রথমে আমাদের খানিকটা ঘুমিয়ে নেওয়া দরকার।’

‘ধন্যবাদ।’ বলল কিশোর। ‘কিন্তু আমরা ক্লান্ত নই।’

ছেলেদের ইয়াকের পশমে তৈরি আঙরাখা দিলেন ওল্ড রোজ এবং ওরা জিনিসগুলো গায়ে জড়িয়ে মাটিতে শুয়ে চোখ বুজল, স্রেফ ভদ্রমহিলার কথা রাখার জন্য এবং দুই মিনিটের মধ্যেই ঘুমে তলিয়ে গেল তিনজন।

 

পরদিন সকালে ইয়াকের টুংটাং ঘণ্টাধ্বনির শব্দে ঘুম ভাঙল কিশোরের। উঠে বসে চারপাশে চোখ বুলিয়ে কাঠের গুঁড়ির দেয়ালগুলো দেখে নিল ও, পাথরের সঙ্গে কাদা মিশিয়ে তৈরি ওগুলো। বেশ কিছুক্ষণ লেগে গেল ওর কোথায় রয়েছে টের পেতে। মুসা আর রবিন এখনো ঘুমোচ্ছে। এক কোণে খাটিয়ায় শুয়ে নাক ডাকছেন ওল্ড রোজ। ভারী দরজাটা সামান্য ফাঁক করে বাইরে চাইল কিশোর। পরমুহূর্তে, লাফিয়ে পিছিয়ে এলো। কোঁচকানো, রুক্ষ এক মুখ চেয়ে রয়েছে ভেতর দিকে। ওটা একটি ইয়াক। গোটা কুটির ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশালদেহী জানোয়ারগুলো, মাথা নাড়লেই মৃদু শব্দে বেজে উঠছে ওদের গলার চারকোনা ঘণ্টি। সব মিলিয়ে গোটা বিশেক হবে।

‘ইয়াকের পালটা আমার অ্যালার্ম ঘড়ি।’ বলে উঠে বসলেন ওল্ড রোজ। এখনো ইয়াকের আঙরাখামুড়ি দিয়ে আছেন। ‘ওরা জানে, আজকে হাটবার এবং ওরা শহরে যেতে ভালোবাসে।’

‘খাইছে, তাই?’ মুসা জেগে গেছে, চোখ ডলছে।

‘হ্যাঁ, কারণ ওরা জানে আমি ওদের বেচব না।’ বললেন ওল্ড রোজ।

পুরু করে ইয়াকের মাখন মাখানো রুটি আর ইয়াকের দুধের গরমাগরম চা খেয়ে, খাড়া, সংকীর্ণ পথটি ধরে শহরের উদ্দেশে নেমে চলল ওরা। ওল্ড রোজ নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং তাঁর ইয়াকগুলো এক সারে অনুসরণ করছে।

ফ্লাইট কভারলের ওপর পশমের আঙরাখা পরেছে তিন গোয়েন্দা, ওদের দেখে যাতে ইয়াকপালক মনে হয়।

‘তোমাদের সহজেই শহরে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে।’ বললেন ওল্ড রোজ। ‘জাদুকরের টহলদাররা যদি কোনো প্রশ্ন করে, স্রেফ বোবা-কালার ভান কোরো, কেমন?’

‘কী বলছেন?’ বলল রবিন, হাসছে।

‘ঠাট্টা নয়।’ বললেন ওল্ড রোজ। ‘বিদেশিদের জন্য এখানে কঠিন শাস্তির বিধান আছে।’

‘কী সেটা?’ মুসার প্রশ্ন।

‘না ঝুলিয়ে মৃত্যু।’

ভ্রু কুঁচকাল কিশোর।

‘না ঝুলিয়ে?’

‘নিজের চোখেই দেখবে।’

কথোপকথনে ছেদ টানল ওরা। গভীর চিন্তামগ্ন ছোট দলটি হেঁটে চলল, যতক্ষণ পর্যন্ত না ট্রেইলটা গাছপালার ভেতর থেকে বেরিয়ে এক উঁচু, খাড়া পারে মিশল।

ওল্ড রোজ থেমে পড়ে তর্জনী তাক করলেন।

‘ওই যে, নিচে শারমা শহর, শারমা-লা উপত্যকার রাজধানী।’ বললেন।

নিচের উপত্যকাটা গাঢ় সবুজ দেখাল, এমনকি স্থায়ী মেঘের কারণে সৃষ্ট ছায়াময় অনুজ্জ্বলতা সত্ত্বেও। উপত্যকার মাঝখানে এক উঁচু পাথুরে মিনার নিয়ে বিশাল এক দুর্গ দাঁড়িয়ে। দুর্গের পায়ের কাছে এক সরোবর এবং ওটা ঘিরে বেশ কিছু জরাজীর্ণ কুঁড়ে আর ভাঙাচোরা, আঁকাবাঁকা রাস্তা নিয়ে ছোট্ট এক শহর।

‘বড় দালানটা বিশাল দুর্গ, ওখানেই জাদুকর ওয়াল্টার আর খুদে লামা থাকেন।’ জানালেন ওল্ড রোজ।

‘ওহ।’ বলল রবিন, খুঁটিয়ে নিরিখ করল শহরটা। ‘কোনো ফোন কিংবা ইলেকট্রিকের লাইন তো দেখছি না।’

‘তাতে কী?’ প্রশ্ন মুসার।

বেল্টের লোকেটটায় মৃদু চাপড় দিল রবিন। খুদে লাল বাতিটা টিপটিপ করছে।

‘আমার একটা পে ফোন দরকার, বিশেষ এক স্যাটেলাইট সুইচবোর্ডে কল করতে হবে, যেখান থেকে একটা মেসেজ পেতে পারি আমি; কিংবা অন্ততপক্ষে বব আংকলকে লোকেট করার কো-অর্ডিনেট।’

‘এই ছোট শহরে কাজটা খুব কঠিন।’ বলল কিশোর।

‘শারমাতে কোনো ফোন নেই।’ সাফ জানিয়ে দিলেন ওল্ড রোজ। ‘বেশির ভাগ মানুষ এমনকি ফোনের নামও শোনেনি। জাদুকরের পাহারাদাররা শুধু ওয়াকি-টকি ব্যবহার করে, অন্য কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অনুমতি নেই এখানে। আর নিশ্চিত থাকতে পারো, ওরা তোমাদের কল করতে দেবে না।’

পথটা ক্রমেই আরো চওড়া আর সমতল হয়ে উঠল, আগের মতো খাড়া নেমে যাচ্ছে না এখন, পাহাড়ি উতরাই বেয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে নেমেছে।

ইয়াকপালকের ছদ্মবেশধারী তিন বন্ধুকে পেছনে নিয়ে, বার্লি খেত পেরিয়ে, শহরের নিচু ফটকগুলো দিয়ে ঢুকে পড়লেন ওল্ড রোজ। কোলের ওপর ওয়াকি-টকি রেখে এক টহল পুলিশ ঝিমাচ্ছিল, এক চোখ খুলে ওদের পাশকাটাতে দেখল। ইয়াকপালকদের চেয়ে ইয়াকগুলোর প্রতিই তার আগ্রহ বেশি দেখা গেল।  তার চেয়েও বেশি আগ্রহ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার ব্যাপারে।

‘আমাদের এই উপত্যকায় ইয়াকদের পবিত্র মনে করা হয়।’ বললেন ওল্ড রোজ। ‘ওদের হত্যা কিংবা জখম করা নিষিদ্ধ।’

শারমা শহরটা প্রায় ফাঁকাই বলা চলে। রাস্তায় অল্প যে কয়জন মানুষ রয়েছে, তাদের বন্ধুভাবাপন্ন অথচ বিমর্ষ দেখাল, ওল্ড রোজের উদ্দেশে যখন তারা হাত নাড়ল। তাদের বেশির ভাগই বয়স্ক। মুখের চেহারা যেন এখানকার জমাট বাঁধা আকাশের মেঘ, সর্বক্ষণ গোমড়া।

‘বাচ্চাকাচ্চারা কোথায়?’ প্রশ্ন করল রবিন।

শ্রাগ করলেন ওল্ড রোজ।

‘ব্যাপারটা আজব, তবে যখনই শহরে আসি, দেখি আগের চেয়ে বাচ্চাদের সংখ্যা কম। ওরা হয়তো ঘরের ভেতরে থাকে। সার্বক্ষণিক বিষণ্নতা বোধ হয় ওদেরও পেয়ে বসছে।’

‘বুঝি না।’ ফিসফিস করে বলল রবিন। ‘যেখানে কখনোই আকাশ দেখা যায় না, সেখানে মানুষ থাকে কিভাবে?’

আঁকাবাঁকা রাস্তাগুলো ছোট ছোট কুঁড়েঘর আর নড়বড়ে পুরনো কাঠের বাড়িঘরের ভেতর দিয়ে চলে গেছে। সব কিছুই এখানে আদিম। রাস্তায় না আছে কোনো নিয়ন সাইন, না বৈদ্যুতিক তার এবং ফোনের তো বালাই-ই নেই!

‘আজ হাটবার।’ বললেন ওল্ড রোজ। ‘লোকজন আরো বেশি থাকার কথা।’ এক বৃদ্ধের মলিন আঙরাখার হাতা চেপে ধরলেন তিনি। ‘সবাই গেছে কোথায়?’

‘জাদুকর ওয়াল্টার একটি ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন।’ বললেন বৃদ্ধ। ‘শহরের সবাই জড়ো হয়েছে বিশাল দুর্গের নিচে, প্রতিফলন পুকুরের কাছে।’

‘মস্ত ঘটনা।’ বললেন ওল্ড রোজ। ‘আমি শহরে এসেছি আমার ইয়াকগুলোকে বাজারে নিয়ে যেতে।’

‘হুম। কত চান ওগুলোর জন্য?’ শুধালেন বৃদ্ধ। ‘আমি হয়তো কয়টা কিনতে পারি।’

‘কিনবেন?’ ওল্ড রোজকে রীতিমতো আতঙ্কিত দেখাল। ‘আমি কখনোই ওদের বেচব না।’

‘খাইছে, তাহলে বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন কেন?’ মুসার প্রশ্ন।

‘ওরা যাতে সামাজিকতা শেখে। ওরাও আর সবার মতো শহরে আসতে ভালোবাসে কিনা।’ আঙুলগুলো ফুটিয়ে তর্জনী নির্দেশ করলেন তিনি এবং জানোয়ারগুলো হেলেদুলে চলে গেল।

‘ওরা খানিকক্ষণের জন্য নিজেদের দেখেশুনে রাখতে পারবে।’ তিন গোয়েন্দার উদ্দেশে বললেন বৃদ্ধা। ‘এসো, আমরা প্রতিফলন পুকুরে যাব।’

‘চলুন।’ বলল কিশোর। ‘এই জাদুকর ওয়াল্টারকে একনজর দেখে জীবন সার্থক করি।’     

     (চলবে)

মন্তব্য