রাজধানীর রমনা থানা এলাকার মৌচাক-আনারকলি মার্কেটসংলগ্ন ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও এলাকার একক আধিপত্যের পুরনো রেষারেষির জেরে খুন হয়েছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার। স্থানীয় সূত্র ও নিহতের পরিবারের এমনটাই দাবি।
ঘটনার পর রাতেই অভিযুক্ত যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম বাবুকে দল থেকে বহিষ্কার এবং রমনা থানা যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এ দিকে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে জোর তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
সোমবার (৮ জুন) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে রমনা থানা এলাকার সিদ্ধেশ্বরী বয়েজ স্কুলের পাশে আনারকলি সুপার মার্কেটের পার্কিং স্থানে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নিহত বিল্লাল হোসেন তালুকদার রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক ছিলেন। পেশায় সিমেন্ট-বালু ব্যবসায়ী বিল্লাল মগবাজারের পৃথক দুটি এলাকায় দুই পরিবার ও ৬ সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন।
নিহতের ভাগনে ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মোবারক হোসেন আকাশ অভিযোগ করে বলেন, ‘সোমবার রাতে আমরা কয়েকজন আনারকলি মার্কেটের পার্কিং স্পটে অবস্থান করছিলাম। এ সময় আনারকলি সুপার মার্কেট কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও রমনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবু তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের নিয়ে সেখানে আসেন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি শুরু হয়।’
আকাশ আরো জানান, কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে দিদারুল ইসলাম বাবু নিজে কোমর থেকে ছোরা বের করে বিল্লালকে আঘাত করার চেষ্টা করেন। তখন ধাক্কাধাক্কিতে ছোরাটি মাটিতে পড়ে যায়। সঙ্গেই দিদারুলের ‘ডান হাত’ হিসেবে পরিচিত সিরাজুল মাটিতে পড়া ছোরাটি তুলে বিল্লালের বুকে সজোরে বসিয়ে দেয়। এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আজ মঙ্গলবার সকালে ঢামেক মর্গে নিহতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও নিহতের পরিবারের দাবি, শুধু তাৎক্ষণিক কোনো মারধরের কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব।
নিহতের ভাগনে আকাশের ভাষ্যমতে, বিল্লাল হোসেন তালুকদার সিনিয়র রাজনীতিবিদ হওয়ায় মৌচাক-আনারকলি মার্কেটের আশপাশে ফুটপাতের দোকানদারদের নিজেদের মধ্যকার যেকোনো ঝগড়া বা সমস্যা হলে তারা বিল্লালের শরণাপন্ন হতেন। বিল্লালও এসব সমস্যার সালিশ-মীমাংসা করতেন। ফুটপাতে চাঁদাবাজির একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম বাবু এই সালিশি প্রথা পছন্দ করতেন না। আর সে কারণেই বিল্লালের ওপর তার চরম ক্ষোভ ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মালিবাগে সোহাগ পরিবহনের কার্যালয় ও মালিকের বাসায় ভাঙচুরের একটি মামলায় দিদারুল ইসলামের ষড়যন্ত্রে বিল্লালকে আসামি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই মামলায় বিল্লাল তিনমাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হন এবং পরে সোহাগ পরিবহন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি মীমাংসা করে নেন। ঘটনার পর তার সাংগঠনিক বহিষ্কারাদেশও প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
এদিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পরপরই রাতেই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে যুবদল। রমনা থানা যুবদলের একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন যে, বিল্লাল হোসেন তালুকদারকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে রমনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবুকে পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে রমনা থানা যুবদলের বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সংগঠন।
এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, নিহত ব্যক্তি স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা এবং যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনিও যুবদলের নেতা। ফলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত উভয়পক্ষই রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তি। প্রাথমিক তদন্তে দলীয় কোনো বিরোধ বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের তথ্য পাওয়া যায়নি। নিহতের ভাগনের বক্তব্য অনুযায়ী, মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
পুলিশের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, মৌচাক-আনারকলি এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পূর্বশত্রুতার বিষয়টিই তাদের প্রাথমিক সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও পেছনের কুশীলবদের খুঁজতে পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এ ঘটনায় রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।







